ইতিমধ্যে জানা গুনাহের আলোচনা কি গীবতের অন্তর্ভুক্ত?
Family Life · Hanafi
Question
অনেক সময় দেখা যায় কোন এক ব্যাক্তির গুনাহ সম্পর্কে আমরা অনেকেই জেনে যাই। যেমন কেউ গোপনে যিনা ব্যাভিচার করল এটা কয়েকজন জানলো।
যদি এমন হয় যে একজন ব্যাক্তির গুনাহ অনেকেই জানে এরপর যারা জানে তারা নিজেরা আলোচনার মধ্যে কথায় কথায় সেই প্রসংগ আনে। এক্ষেত্রে তো সেই ব্যাক্তির কোন দোষ নতুন ভাবে উন্মোচিত হচ্ছেনা। এরূপ ক্ষেত্রে কি গীবতের গুনাহ হয়?
পারিবারিক জয়েন ফ্যামিলিতে এমন প্রায়ই হয়ে যায়।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
গীবতের সংজ্ঞা ও বিধান সম্পর্কে কুরআন, হাদীস ও ফিকহে হানাফীর মূলনীতি নিম্নরূপ:
১. গীবতের সংজ্ঞা: আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ "তোমাদের কেউ যেন অপরের গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দই করবে।" (সূরা হুজুরাত: ১২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ গীবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেন:
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ "তোমরা কি জানো গীবত কী? সাহাবারা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৯)
২. মূল প্রশ্নের জবাব — ইতিমধ্যে জানা গুনাহের আলোচনা: গীবতের গুনাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য শর্ত হলো—যে বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে, তা গোপন/অপ্রকাশ্য হওয়া এবং শ্রোতার কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হওয়া। কিন্তু যদি গুনাহটি ইতিমধ্যে বহু লোক জানে এবং আলোচনা করতে গিয়ে নতুন কোনো দোষ প্রকাশ না পায়, তবে হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী সেটি সাধারণ গীবতের আওতায় পড়ে না — তবে এতে অন্য গুরুতর দোষ থাকতে পারে।
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
وَالْغِيبَةُ ذِكْرُ الْإِنْسَانِ بِمَا يَكْرَهُهُ فِي غَيْبَتِهِ، وَالْمُرَادُ بِمَا يَكْرَهُهُ مَا يَكُونُ عَيْبًا فِيهِ، وَالْعِلْمُ بِهِ شَرْطٌ لِكَوْنِهِ غِيبَةً "গীবত হলো কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন বিষয় উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে; আর 'অপছন্দের বিষয়' মানে তার মধ্যে বিদ্যমান দোষ। আর গীবত হওয়ার জন্য শ্রোতার জানা থাকা শর্ত।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৬, দারুল ফিকর)
ইমাম নববী (রহ.) «রিয়াদুস সালিহীন»-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
لَا تَكُونُ غِيبَةً إِذَا كَانَ الْمَذْكُورُ بِهِ مَعْلُومًا لِلسَّامِعِ، لِأَنَّ الْغِيبَةَ هِيَ ذِكْرُ الْعَيْبِ بِمَا يَكْرَهُهُ، وَإِذَا كَانَ مَعْلُومًا لَهُ فَلَا يَكْرَهُهُ "যদি উল্লেখিত দোষ শ্রোতার কাছে পূর্ব থেকেই জানা থাকে, তবে তা গীবত হবে না; কারণ গীবত হলো এমন দোষ উল্লেখ করা যা শ্রোতা অপছন্দ করে, আর যদি সে আগেই জানে তবে অপছন্দ করবে না।" (শরহু সহীহ মুসলিম: ১৮/১১৩)
৩. তবে সতর্কতা — এতে অন্য গুনাহ থাকতে পারে: যদিও এটি প্রযুক্তিগতভাবে গীবতের সংজ্ঞায় পড়ে না, তবে নিম্নোক্ত কারণে তা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কারণ হতে পারে:
-
গুনাহের প্রচার ও আলোচনা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحُ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ فَيَقُولُ: يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا "আমার সমস্ত উম্মতকে ক্ষমা করা হবে, মুজাহিরীন (প্রকাশ্যে গুনাহকারী) ছাড়া। আর মুজাহিরা হলো সেই ব্যক্তি যে রাতে গুনাহ করে, আল্লাহ তা ঢেকে দেন, সকালে সে বলে: হে অমুক! গতরাতে আমি এই এই কাজ করেছি।" (সহীহ বুখারী: ৬০৬৯)
সুতরাং কারও গোপন গুনাহ জানা থাকলেও তা মজলিসে আলোচনার বিষয় বানানো ইসলামে নিন্দনীয়। এটি গুনাহের প্রচার ও অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়।
-
শ্রোতার জন্য গুনাহের কথা শোনা: যদি শ্রোতা আগে না জানে, তবে তার কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হলে তার জন্য গীবতের গুনাহ হবে। আর যে ব্যক্তি গুনাহের কথা ছড়ায়, সে গুনাহের প্রচারে সহযোগী হয়।
-
মুসলিমের সম্মান রক্ষা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ "প্রত্যেক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান হারাম।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪)
৪. পারিবারিক পরিবেশে করণীয়:
- গুনাহের কথা আলোচনা থেকে বিরত থাকা।
- যদি কেউ আলোচনা শুরু করে, তবে ভালোভাবে থামানো বা বিষয় পরিবর্তন করা।
- গুনাহকারীর জন্য দোয়া করা ও তার গোপনীয়তা রক্ষা করা।
- পরিবারের সদস্যদের হাসান যিকির ও দ্বীনি আলোচনায় অভ্যস্ত করা।
৫. সারসংক্ষেপ:
- যদি গুনাহটি ইতিমধ্যে বহু লোক জানে এবং আলোচনায় নতুন কোনো দোষ প্রকাশ না পায়, তবে প্রকৃত গীবতের গুনাহ হবে না।
- তবে গুনাহের আলোচনা ও প্রচার নিজেই নিষিদ্ধ; এটি গুনাহে সহযোগিতা ও মুসলিমের সম্মান হরণের কারণ হতে পারে।
- যদি শ্রোতা আগে না জানে, তবে তার কাছে উল্লেখ করা গীবত হবে।
- সর্বোত্তম পথ: গুনাহের আলোচনা সম্পূর্ণ পরিহার করা এবং গুনাহকারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে জিহ্বার গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।