পড়াশোনার পাশাপাশি বাসায় কাজ করতে গিয়ে আমার যে মনে কষ্ট আসে কাজ গুলো করতে গেলে বা অনেক সময় করতে ইচ্ছা করে না তারপরও জোর করে করি এটাতে কি আমার সওয়াব কম হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উস্তাজ আমি আমার ঘরের ছোট মেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ আই ও এম এর তৃতীয় সেমিতে পড়ছি। আমার বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে এবং বাচ্চা আছে। ঘরের কাজ আলহামদুলিল্লাহ আমার করা হয়। তো উস্তাজ ওদের অসুস্থতার সময় বা অন্যান্য সময়ে ওরা যখন বাসায় আসে বেড়াতে তখন ঘরের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি আমি চেষ্টা করি ওদের খেদমত করার। যার কারণে আমার পড়াশুনা কম হয় এবং পরীক্ষার সময় আমার উপর চাপ পড়ে। আর আলহামদুলিল্লাহ আমাদের বাসায় সবসময় মেহমানদারি হয় আলহামদুলিল্লাহ। যার কারণে মাঝে মধ্যে অনেক কাজই করতে গেলে আমার মনে কষ্ট চলে আসে। তারপরেও স্বাভাবিক থেকে করতে চেষ্টা করি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু মাঝে মধ্যে হয়তোবা সেটা প্রকাশ পেয়ে যায়। এখন উস্তাজ আমার যে মনে কষ্ট আসে কাজ গুলো করতে গেলে বা অনেক সময় করতে ইচ্ছা করে না তারপরও জোর করে করি এটাতে কি আমার সওয়াব কম হবে? বা গুনাহ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় ছাত্রী, আপনার প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি একজন ছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা এবং ঘরের কাজ ও পরিবারের সেবা করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনার মনে যে কষ্ট বা দ্বিধা আসে, তা স্বাভাবিক, তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর উত্তম সমাধান রয়েছে।
উত্তরের সারসংক্ষেপ:
আপনার কাজের সওয়াব কম হবে না, বরং আপনি যদি নিয়ত ঠিক রাখেন এবং ধৈর্যের সাথে কাজ করেন, তাহলে আপনি দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। এতে কোনো গুনাহ হবে না, কারণ আপনি জোর করে হলেও কাজ করছেন এবং পরিবারের সেবা করছেন, যা একটি ইবাদত। তবে নিজের পড়াশোনার সময় বের করার জন্য পরিবারের সাথে কথা বলতে পারেন এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
বিস্তারিত উত্তর:
১. সওয়াব ও নিয়তের গুরুত্ব:
ইসলামে কাজের সওয়াব নির্ভর করে নিয়তের (ইখলাস) উপর। মহান আল্লাহ বলেন:
"তাদের জন্য তাদের নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল রয়েছে।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৫)
আপনি যখন পরিবারের সেবা করেন এবং ঘরের কাজ করেন, বিশেষ করে অসুস্থ বা অতিথিদের সময়, তখন এটি একটি ইবাদত। যদি আপনার নিয়ত থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরিবারের কল্যাণ, তাহলে আপনি সওয়াব পাবেন। ইচ্ছা না থাকলেও জোর করে কাজ করলে সওয়াব কম হবে না, বরং ধৈর্যের কারণে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যেতে পারে। হাদিসে এসেছে:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা ও ধন-সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।" (মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
২. মনে কষ্ট হওয়া কি গুনাহ?
আপনার মনে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, কারণ আপনি পড়াশোনা ও কাজের চাপে আছেন। এটি গুনাহ নয়, যতক্ষণ না আপনি কষ্টের কারণে কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন বা অহংকার করছেন। বরং আপনি যদি ধৈর্য ধরে কাজ করেন, তাহলে এটি আপনার জন্য সওয়াবের কারণ হবে। কুরআনে বলা হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)
৩. গুনাহ হবে কিনা?
আপনি যদি জোর করে হলেও কাজ করেন এবং পরিবারের সেবা করেন, তাহলে এতে কোনো গুনাহ নেই। বরং এটি একটি নেক কাজ। গুনাহ হবে তখনই, যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে অলসতা বা অসম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু আপনি তো কাজ করছেন এবং স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। তাই গুনাহের কোনো আশঙ্কা নেই।
৪. পরিবারের সেবা ও পড়াশোনার ভারসাম্য:
ইসলামে পড়াশোনার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে পরিবারের সেবাও ফরজ-ওয়াজিব নয়, তবে এটি একটি মহৎ কাজ। আপনি চাইলে পরিবারের সাথে কথা বলতে পারেন যে, আপনার পড়াশোনার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। হাদিসে এসেছে:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।" (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
তবে পরিবারের সেবা মানে নিজের পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। আপনি সময় বণ্টন করে উভয় কাজ করতে পারেন। যদি মনে হয়, কাজের চাপ বেশি, তাহলে বড় বোন বা পরিবারের অন্যদের সাহায্য চাইতে পারেন।
৫. ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য হানাফি আলিমদের মতামত:
হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, পরিবারের সেবা করা স্ত্রী-মেয়েদের জন্য একটি পুণ্যের কাজ, তবে এটি ফরজ নয়। যদি কেউ ইখলাসের সাথে করে, তাহলে সওয়াব পাবে। ইবনে আবেদিন শামী (রহ.) বলেন:
"পরিবারের সেবা করা একটি নেক কাজ, তবে তা ফরজ নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ২:৪৫)
৬. ব্যবহারিক সমাধান:
- নিয়ত ঠিক রাখুন: প্রতিবার কাজ করার সময় মনে রাখবেন, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি।
- সময় বণ্টন করুন: পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন এবং পরিবারকে জানান।
- ধৈর্য ধারণ করুন: কষ্ট এলেও মনে রাখবেন, এটি একটি ইবাদত এবং আল্লাহর কাছে ধৈর্যের বিনিময় অনেক বেশি।
- দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে সহায়তা চান এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করুন।
উপসংহার:
আপনার কাজের সওয়াব কম হবে না, বরং ধৈর্যের কারণে বাড়বে। এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে পড়াশোনার জন্য সময় বের করার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে পরিবারের সাথে আলোচনা করুন। আল্লাহ আপনার নিয়ত কবুল করুন এবং আপনার চেষ্টাকে সফল করুন।
আল্লাহু আলিম। আশা করি উত্তরটি আপনার জন্য উপকারী হবে। যদি আরও কিছু জানার থাকে, জানাতে পারেন।