গর্ভবতী মায়ের খারাপ স্বপ্ন দেখলে কী করবেন?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7128
Questioner: Samiha Afsara
Question Asked: 20 Oct 2026, 05:54 AM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 06:25 AM
Views: 28
Tokens: 5,658
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি ৭ মাসের গর্ভবতী, বয়স ১৯। আজকে সপ্নে দেখলাম আমি হসপিটালের বেডে সুয়ে, অসুস্থ। নার্স এসে ক্যানুলা করে ব্লাড দিচ্ছে কিন্তু সে দেখে প্যাকেটে ব্লাড গুলো জমাট বেধে আছে অর্থাৎ নষ্ট পরে সে চেইঞ্জ করে আনতে যায়। এদিকে আমার আম্মুসহ অন্যরা চলে আসে আমি দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকায় তারা খাওয়ানোর জন্য শুধু ডাল নিয়ে আসে ঘন করে রান্না করা, সেখানে আমার বড় খালা যার সাথে আমাদের সম্পর্ক তেমন ভালো না তিনিও ছিলেন এবং হেসে হেসে কথা বলছিলেন আমার আম্মুর সাথে।তিনি এবং আম্মু আমার ডাল খাওয়া দেখছিলেন, আমার আম্মু ডাল এনে ছিলেন সাথে আরেকজন আমি দুজনেরটা একসাথে মিক্স করে খাচ্ছিলাম তবে একজানের ডালটা পুরোপুরি রান্না হয়নি আরো রান্না হওয়া লাগতো। তবু কিছু না বলে মিক্স করে খাচ্ছি। এমনটার অর্থ কি?

Answer

স্বপ্নের তা'বির (ব্যাখ্যা) সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

মূল কথা: স্বপ্নের তা'বির নিশ্চিতভাবে বলা যায় না

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—স্বপ্নের ব্যাখ্যা কোনো নিশ্চিত (কাটা) বিষয় নয়। স্বপ্ন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুসংবাদ, শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, অথবা মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالرُّؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ» — সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩

অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (ভয়াবহ) স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: رُؤْيَا مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৫

অর্থাৎ স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে, এবং নিজের মনের কল্পনা।

সুতরাং কোনো স্বপ্নকে ভিত্তি করে ভয় পাওয়া, দুশ্চিন্তা করা বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। বিশেষত গর্ভবতী অবস্থায় নার্ভাসনেস এড়ানো অত্যন্ত জরুরি।


আপনার স্বপ্নের প্রতীকগুলোর সম্ভাব্য ইশারা (ইজতেহাদি)

স্বপ্নের তা'বিরের কিতাবসমূহে (যেমন ইবনে সিরিনের তা'বির, ইমাম নাবুলসির তা'বিরুল আনাম) কিছু প্রতীকের ইশারা পাওয়া যায়। তবে এগুলো অনুমানভিত্তিক (যন্নি), নিশ্চিত নয়। আপনার স্বপ্নের উপাদানগুলো আলাদাভাবে দেখলে:

| প্রতীক | সম্ভাব্য ইশারা | |---|---| | অসুস্থতা ও হাসপাতাল | দৈহিক ক্লান্তি, বিশ্রামের প্রয়োজন, অথবা গর্ভকালীন স্বাভাবিক দুশ্চিন্তার প্রতিফলন | | নষ্ট/জমাট বাঁধা রক্ত | কোনো কাজে বিলম্ব, অথবা এমন কিছু যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন | | দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা | অভাববোধ, মনোযোগের অভাব, অথবা সন্তান ও নিজের যত্নের প্রতি সচেতনতার ইশারা | | ডাল (খাদ্য) | রিজিক, সহজলভ্যতা; ডাল সাধারণত রিজিক ও স্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয় | | অর্ধসিদ্ধ ডাল মিশিয়ে খাওয়া | কোনো বিষয়ে তাড়াহুড়া, অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে নেওয়া | | বড় খালা (সম্পর্ক ভালো নয়) হেসে কথা বলা | পারিবারিক সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অথবা মনের গোপন দুশ্চিন্তার প্রকাশ |

তবে সতর্কতা: এ ধরনের প্রতীক-ব্যাখ্যা কুরআন-হাদিসের কাটা দলিল নয়; বরং তা'বিরের কিতাবের ইজতেহাদ। এগুলোকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যাবে না।


ইসলামি নির্দেশনা: যা করণীয়

১. ভালো স্বপ্ন দেখলে

আলহামদুলিল্লাহ বলা, আল্লাহর শোকর করা, এবং খুশি হওয়া। রাসূল ﷺ বলেছেন:

«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يُحِبُّهَا فَإِنَّهَا مِنَ اللَّهِ، فَلْيَحْمَدِ اللَّهَ عَلَيْهَا، وَلْيُحَدِّثْ بِهَا» — সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৯৮৫

২. অপ্রিয়/ভয়াবহ স্বপ্ন দেখলে (আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)

  • আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা (আউযুবিল্লাহ বলা)
  • বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (হালকাভাবে)
  • শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া
  • কারও কাছে বর্ণনা না করা
  • পাশ পরিবর্তন করে শোয়া

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন:

«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا، وَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৬২

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«لَا تُخْبِرْ بِهَا أَحَدًا، فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّكَ» — সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩

অর্থাৎ যে স্বপ্ন অপছন্দ হয়, তা কারও কাছে বর্ণনা করো না; তাহলে তা তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।


হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. স্বপ্নকে ভিত্তি করে ভয় পাওয়া বা দুশ্চিন্তা করা জায়েজ নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো হুকুম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত নয়; কারণ স্বপ্ন দলিল নয় (لا حكم للرؤيا)। [রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৭০-এর কাছাকাছি আলোচনা]

২. গর্ভবতী মায়ের জন্য দুশ্চিন্তা ও ভয় পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা ইউসুফের স্বপ্ন-আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন যে, স্বপ্নের তা'বির আল্লাহর হাতে; বান্দার কাজ হলো তাওয়াক্কুল ও দুআ করা, অকারণ ভয় না পাওয়া। [মা'আরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফের তাফসির]

৩. আশরাফ আলী থানভী রাহিমাহুল্লাহ বেহেশতী জেওর-এ উল্লেখ করেছেন যে, অপ্রিয় স্বপ্ন দেখলে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে হবে এবং তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা যাবে না। [বেহেশতী জেওর, স্বপ্ন-সংক্রান্ত আলোচনা]

৪. আপনার স্বাস্থ্য ও সন্তানের যত্ন নিন। নিয়মিত খাবার গ্রহণ করুন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। স্বপ্নের কারণে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেওয়া বা দুশ্চিন্তায় থাকা সম্পূর্ণ অনুচিত।


সারসংক্ষেপ

  • আপনার স্বপ্নটি শয়তানি বা মনের দুশ্চিন্তার প্রতিফলন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি; কারণ আপনি গর্ভবতী এবং স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য ও সন্তান নিয়ে চিন্তিত থাকেন।
  • এটি কোনো নিশ্চিত বিপদের পূর্বাভাস নয়। স্বপ্নের তা'বির কাটা-নিশ্চিত বিষয় নয়।
  • আউযুবিল্লাহ পড়ুন, বাম দিকে হালকা থুথু ফেলুন, পাশ বদলান, এবং কারও কাছে বর্ণনা করবেন না।
  • আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, দুআ করুন, এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যান।
  • নিয়মিত খাবার ও বিশ্রাম নিন—এটি আপনার ও সন্তানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আপনার গর্ভকালীন সময়কে সহজ করুন, সুস্থ সন্তান দান করুন, এবং সব অকল্যাণ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.