ইমান রক্ষা ও ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার ফ্যামিলি কখনো কোনো আলেমের পরামর্শ নিয়ে কিছু করে না। আলেমের কাছে যেতে বললেও যায় না, এমনকি মাসয়ালা জানলেও সেটা মানে না। প্রায়ই ইসলাম বিরোধী কাজ করে, অনেক ইসলাম বিরোধী কাজ করে। এখন কথা হচ্ছে যে, আমি বাসায়ও থাকতে চাই না। আমি মাদরাসায় থাকলে হয়তো আমার ইমানটা বাঁচবে। আমি আসলে আমার ইমান বাঁচাতে চাই আর আমি অনেক বেশি ইসলামের মধ্যে ঢুকতে চাই, যেমনটা সাহাবারা ছিলেন। পরে সব ক্যালকুলেট করে বুঝলাম যে মাদরাসায় গিয়ে পড়া আর ওখানে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় আমি দেখছি না। এখন কথা হচ্ছে, আমি আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করেছি এবং আল্লাহ স্বপ্নে এমন কিছু দেখিয়েছেন যেটা ইশারা করে যে আমি মাদরাসায় গিয়ে ইলম অর্জন করি। তো আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার প্ল্যান করছি। আমি জানতে চাচ্ছি যে আমি যা প্ল্যান করছি, তা ঠিক হচ্ছে তো? ফ্যামিলির কোনো পরামর্শ শুনলে অথবা আমি উনাদের সাথে থাকলে ইমানটা থাকবে না, যদিও আমি চাচ্ছিলাম বাসায় উনাদের সাথে থেকে আম্মু আর আব্বুকে ইসলাহ করব। কিন্তু আম্মু অনলাইন মাদরাসায় পড়লেও উনি ইসলাম পুরোপুরি বিধান মেনে চলেন না; যেটা উনার মনে ভালো লাগে, শুধু ওইটাই করেন। আমি কী করব?"
Answer
ইমান রক্ষা ও ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে হিজরতের বিধান
উত্তর
আপনার পরিকল্পনা — হালাল উপার্জিত সম্পদ নিয়ে দ্বীন শেখার জন্য মাদরাসায় গমন, সেখানে অবস্থান এবং খিদমত — মূলত শরীয়তসম্মত ও প্রশংসনীয়, বিশেষত যখন আপনি নিজের ইমান ও চরিত্র রক্ষার জন্য ভয় পান এবং পারিবারিক পরিবেশে দ্বীন পালনে বাধা রয়েছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও সতর্কতা রয়েছে, যা নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বর্ণনা করা হলো।
১. দ্বীন রক্ষার জন্য হিজরত ও স্থান পরিবর্তনের বৈধতা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে... তারা আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান।" (সূরা আত-তাওবাহ ৯:২০)
আরও ইরশাদ করেন:
"যারা ঈমান এনেছে এবং হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে — তারাই প্রকৃত মুমিন।" (সূরা আল-আনফাল ৮:৭৪)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, দ্বীন ও ঈমান রক্ষার জন্য নিজের ভূমি ত্যাগ করা শরীয়তসম্মত; বরং কখনো ওয়াজিব হয়ে যায় যদি ব্যক্তি ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা করে। (দেখুন: আহকাম আহল আয-যিম্মাহ, এবং যাদ আল-মা'আদ)
শাইখ ইবন বায (রহ.) ফতোয়ায় বলেন: "যদি কোনো মুসলিমের জন্য নিজ দেশে দ্বীন পালনে বাধা থাকে বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য দ্বীন রক্ষার উদ্দেশ্যে হিজরত করা জায়েয; বরং কখনো ওয়াজিব।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবন বায)
সুতরাং আপনার ক্ষেত্রে: পারিবারিক পরিবেশে দ্বীন পালনে বাধা, ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ এবং নিজের ঈমান হারানোর ভয় — এসব কারণে দ্বীন শেখার জন্য মাদরাসায় গমন ও অবস্থান শরীয়তসম্মত।
২. পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ও ইহসান
তবে মনে রাখতে হবে — পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
"তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি তার পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী ৫৯৮৪, সহীহ মুসলিম ২৫৫৬)
অতএব: আপনি দূরে গেলেও পিতামাতার সাথে যোগাযোগ, দোয়া, দাওয়াহ ও সদ্ব্যবহার বজায় রাখবেন। দূরত্ব শারীরিক হতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন নয়। শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: "সন্তানের জন্য পিতামাতার কাছে থেকে দূরে সরে গিয়ে দ্বীন শেখা জায়েয, যদি সেখানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে; তবে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও যোগাযোগ বন্ধ করা যাবে না।" (ফাতাওয়া নূরুন আলা আদ-দারব)
৩. ইস্তিখারা ও স্বপ্নের বিধান
ইস্তিখারা একটি সুন্নাহসম্মত আমল (সহীহ বুখারী ১১৬৬)। তবে স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় — কারণ স্বপ্ন হুজ্জত নয়। শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন: "স্বপ্ন দ্বারা শরীয়তের বিধান প্রমাণিত হয় না; বরং স্বপ্নকে কেবল তখনই গ্রহণ করা যায় যখন তা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।" (মাজমু' ফাতাওয়া)
সুতরাং: আপনার স্বপ্নটি কেবল একটি সমর্থন হিসেবে দেখুন, মূল ভিত্তি হবে — শরীয়ত, ইস্তিশারা (বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ) এবং ইস্তিখারার পর অন্তরের প্রশান্তি।
৪. জাদু ও শয়তানের আছরের বিষয়ে
জাদু ও শয়তানের আছর সত্য। আল্লাহ বলেন:
"তারা শয়তানের শিক্ষা অনুসরণ করে... সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানরা যা পাঠ করত..." (সূরা আল-বাকারাহ ২:১০২)
রুকইয়াহ শরীয়তসম্মত চিকিৎসা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি জাদু করেছে সে শিরক করেছে।" (মুসনাদ আহমাদ, সহীহ)
পরামর্শ:
- রুকইয়াহ চালিয়ে যান, তবে বিশ্বস্ত ও সুন্নাহভিত্তিক রাকী (যিনি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী রুকইয়াহ করেন, তাবিজ-কবজ বা শিরকি পদ্ধতি ব্যবহার করেন না) খুঁজুন।
- শাইখ ইবন বায ও শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.)-এর পরামর্শ: নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারাহ পাঠ, সকাল-সন্ধ্যার যিকর, এবং তাওহীদে দৃঢ় থাকা।
- গুরুত্বপূর্ণ: জাদু বা শয়তানের আছর থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন; তবে মনে রাখবেন — আপনার অতীতের পাপের কারণে আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করছেন, এবং তাওবাহ ও ইস্তিগফারই মুক্তির পথ।
৫. অতীতের পাপ ও তাওবাহ
আল্লাহ বলেন:
"বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন।" (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"ইসলামের পূর্বের সমস্ত পাপ মাফ হয়ে যায়।" (সহীহ মুসলিম ১২১)
সুতরাং: আপনার অতীতের পাপ নিয়ে হতাশ হবেন না। তাওবাহ করুন, ইস্তিগফার করুন এবং ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ় সংকল্প করুন। আল্লাহ তাওবাকারীর তাওবাহ কবুল করেন।
৬. বর্তমান বাস্তবতা ও করণীয়
(ক) মাদরাসায় গমন — হ্যাঁ, তবে শর্তসহ:
- মহিলাদের জন্য নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করুন — যেখানে পর্দা, মাহরামের ব্যবস্থা এবং দ্বীনদার শিক্ষিকার তত্ত্বাবধান রয়েছে।
- বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন — যিনি সালাফি/আহলে হাদীস মানহাজ অনুযায়ী ফতোয়া দেন। (যেমন: শাইখ ইবন বায, ইবন উসাইমীন, আলবানী, ফাওযান — তাঁদের ফতোয়া ও তাদের ছাত্রদের পরামর্শ)।
- পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখুন — নিয়মিত ফোন, দোয়া, এবং সম্ভব হলে তাদের দ্বীনের দাওয়াহ দিন।
(খ) পিতামাতার ইসলাহ:
আপনি চেয়েছিলেন তাদের ইসলাহ করতে — এটি মহৎ উদ্দেশ্য। কিন্তু যদি তাদের সাথে থাকলে আপনার নিজের ঈমান বিপন্ন হয়, তবে দূরে থেকে দাওয়াহ দেওয়া অধিক নিরাপদ। আল্লাহ বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা কর।" (সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: "যদি পরিবারের সাথে থাকলে দ্বীন পালনে বাধা হয় এবং দূরে থাকলে নিরাপত্তা থাকে, তবে দূরে থাকা জায়েয; তবে দাওয়াহ ও সদ্ব্যবহার চালিয়ে যেতে হবে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলা আদ-দারব)
(গ) চাকরি ছাড়া:
হালাল উপার্জন ও সঞ্চয় আপনি দ্বীন শেখার জন্য ব্যবহার করবেন — এটি প্রশংসনীয়। তবে আর্থিক পরিকল্পনা সঠিকভাবে করুন — মাদরাসার খরচ, থাকা-খাওয়া, এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে পার্ট-টাইম হালাল কাজের কথা ভাবুন।
(ঘ) বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত:
বর্তমানে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে ভবিষ্যতে যদি বিয়ে করতে চান, তবে দ্বীনদার ও আল্লাহভীরু স্বামী নির্বাচন করুন — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "দ্বীনদারকে বেছে নাও, নইলে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" (সহীহ বুখারী ৫০৯০)
৭. চূড়ান্ত পরামর্শ
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | ইস্তিখারা | চালিয়ে যান, তবে স্বপ্নের উপর নির্ভর করবেন না; আলেমের পরামর্শ নিন | | মাদরাসা | নিরাপদ, শরীয়তসম্মত ও বিশ্বস্ত মাদরাসা বেছে নিন | | পিতামাতা | সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না; দূর থেকে দোয়া ও দাওয়াহ দিন | | রুকইয়াহ | সুন্নাহভিত্তিক রাকীর কাছে চালিয়ে যান; তাওবাহ ও যিকর বাড়ান | | আর্থিক | হালাল সঞ্চয় দ্বীন শেখার জন্য ব্যবহার করুন; পরিকল্পনা সঠিক রাখুন | | বিয়ে | এখন না চাইলে ঠিক আছে; ভবিষ্যতে দ্বীনদার পাত্র দেখে সিদ্ধান্ত নিন |
সারকথা: আপনার পরিকল্পনা — আল্লাহর উপর ভরসা করে, হালাল সম্পদ নিয়ে, দ্বীন শেখার জন্য মাদরাসায় গমন এবং সেখানে অবস্থান — শরীয়তসম্মত ও প্রশংসনীয়, যদি আপনি পিতামাতার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন, বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেন এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেন। আল্লাহ আপনার ইমান রক্ষা করুন এবং আপনার ইলমকে বরকতময় করুন। আমীন।