আরাফার দিনের আমল সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আরাফার দিনের দুআ: বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য সময় ও পদ্ধতি
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আরাফার দিন (৯ জিলহজ) সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত বরকতময়। এই দিনের দুআ কবুল হওয়া সম্পর্কে হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য দুআ করার সর্বোত্তম সময় হলো ৯ জিলহজ তারিখের দিনটি নিজেদের স্থানীয় সময় অনুসারে পালন করা
১. আরাফার দিনের দুআ: গুরুত্ব ও সময়
-
হাদিসের বর্ণনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আরাফার দিনের চেয়ে বেশি সংখ্যায় আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মানুষকে মুক্তি দেন না।” (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮) অন্য হাদিসে আছে, “সবচেয়ে উত্তম দুআ হলো আরাফার দিনের দুআ।” (মুয়াত্তা মালিক: ৫০০; তিরমিজি: ৩৫৮৫)
-
হজযাত্রীদের জন্য: আরাফার ময়দানে অবস্থানকারীদের জন্য যাওয়াল (মধ্যাহ্ন) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় দুআ কবুলের বিশেষ মুহূর্ত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, আরাফার দিন ইমাম যোহর ও আসর একত্রে পড়ান এবং এরপর দুআতে মশগুল হন। (আল-হিদায়া: ১/১৬৬)
-
অ-হজযাত্রীদের জন্য: আরাফার দিনের ফজিলত শুধু হজযাত্রীদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যারা হজে নেই, তাদের জন্যও এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোজা রাখা সুন্নত এবং সারাদিন দুআ করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি অধিক ফজিলতপূর্ণ। (রদ্দুল মুহতার: ২/৩৭৮; ফাতাওয়ায়ে উসমানি: ২/২৮০)
২. বাংলাদেশের মানুষের জন্য দুআ করার সময় নির্ধারণ
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সময়ের পার্থক্য প্রায় ৩ ঘণ্টা (বাংলাদেশ আগে)। আরাফার দিন ৯ জিলহজ সৌদি আরবে যে তারিখে উদযাপিত হয়, বাংলাদেশ সাধারণত সেই একই তারিখে (কখনও একদিন পরেও হতে পারে) পালন করে। তাই দুআর সময় নির্ধারণে দুটি দিক বিবেচ্য:
ক. স্থানীয় সময় অনুসারে ৯ জিলহজ উদযাপন:
- সঠিক পদ্ধতি: বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের স্থানীয় চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ৯ জিলহজ নির্ধারণ করবেন। এই দিনটি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুআ, ইবাদত ও তওবার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, আরাফার দিনের ফজিলত হজযাত্রী ও অ-হজযাত্রী উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। (শরহু মাআনিল আসার: ২/১০৩)
খ. সৌদি আরবের আরাফাতের সময়ানুযায়ী দুআ:
- অনেক আলেম মনে করেন, আরাফাতের মাঠে যখন ইমাম দুআ করেন, তখন বিশ্বের অন্যান্য মুসলমানরাও সেই সময় দুআ করলে অধিক ফজিলত লাভ হয়। এটি একটি মুস্তাহাব আমল।
- বাংলাদেশ সময় হিসাব: সৌদি আরবে আরাফার দিন যাওয়াল (প্রায় ১২:১৫ PM) থেকে সূর্যাস্ত (প্রায় ৬:৩০ PM) পর্যন্ত দুআর সময়। বাংলাদেশ সময়ে এটি দুপুর ৩:১৫ PM থেকে রাত ৯:৩০ PM পর্যন্ত (গ্রীষ্মকালে কিছু পরিবর্তন হতে পারে)।
- মনে রাখতে হবে: এই সময়টি বাংলাদেশের ৯ জিলহজের দিনই পড়ে (যদি তারিখ এক হয়)। তবে সৌদি ও বাংলাদেশের তারিখ ভিন্ন হলে (যেমন একদিন পার্থক্য), তখন সৌদির আরাফার দিন বাংলাদেশে হয় ৮ বা ৯ জিলহজ পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে উভয় দিনই দুআ করা উচিত। (ফাতাওয়ায়ে উসমানি: ২/২৮১; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/১০৫)
গ. ফিকহি নির্দেশনা:
- হানাফি ফিকহের বড় আলেমগণ (যেমন হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি রহ., মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ., মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.) তাদের ফাতাওয়ায় বলেছেন, আরাফার দিনের দুআ স্থানীয় সময় অনুসারে করা উত্তম, তবে যারা সময়মতো সৌদি আরবের সময় জানেন, তারা সেই সময়ও দুআ করতে পারেন। কোনো অবস্থাতেই দুআর সময় নষ্ট করা উচিত নয়। (বেহিশতি জেওর: ৪/২৫; মাআরিফুল কুরআন: ২/৫১২)
৩. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- তারিখ নির্ধারণে মতভেদ: বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে কখনও ১ দিনের পার্থক্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে উভয় দিনই ইবাদত, দুআ ও রোজা রাখা উত্তম। তবে অধিকাংশ হানাফি আলেম স্থানীয় তারিখ অনুসরণের পক্ষে। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১৯২)