নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে স্ত্রীর টাকা থাকলেও স্বামী যাকাতের হকদার হতে পারে?

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 7028
Questioner: .00com
Question Asked: 17 Oct 2026, 03:04 PM
Reviewed & Published: 17 Oct 2026, 06:14 PM
Views: 32
Tokens: 8,256
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ উস্তায।

একজন নিজে ইনকাম করেছে, টাকা পয়সা তার বাবা, পরিবার পরিজনদের দিয়েছে। স্ত্রীর কাছে দিয়েছে। সে বিদেশ থেকে দেশে আসার পর কারো কাছ থেকেই কিছু পায় নি। জায়গাও বেচার সুযোগ নেই। স্ত্রীর কাছে লাখ খানেক টাকা আছে সেগুলো সে দেয়নি, দিবে না। সেগুলো তার সন্তানের কাজে লাগবে। মূল কথা স্ত্রীর কাছে টাকা আছে। কিন্তু স্বামীর কাছে নেই। সে একটা দোকান দিয়েছে সেখানেও মালামাল তেমন নেই। দিনে ১০ টাকাও বিক্রি হয় এমন। আবার মাঝে মধ্যে ১০০০ টাকা। সে তার স্ত্রীর কাছেও ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা যা তার স্ত্রীর কাছে ছিল সেখান থেকে কিছু টাকা চেয়েছিল যাতে দোকানে মাল উঠাতে পারে। কিন্তু স্ত্রী দেয় নি, সন্তানদের কথা চিন্তা করে।

এখন সেই লোককে কি যাকাতের টাকা দেয়া যাবে? ওনার ইনকামের টাকা, যারা জীবন বিদেশ থাকলেও ওনি তো এখন খালি। কারো কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছে না। তার দোকানেও মাল নেই।

এখন নিসাব পরিমান কত? ২ লাখ টাকার মত বছর শেষে তার নিজের কাছে থাকে না যতটুকু জানি। তার সংসারে অনেক অশান্তি যেহেতু সে নিজে ইনকাম করতে পারছেনা। বাজার হাট ইত্যাদি নিয়ে নিয়মিত ঝামেলা। কিন্তু তার সন্তানেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। দামীজামাকাপড় কিনে ইত্যাদি।

কিন্তু এই লোকের হাত খালি। সে নিজেও এসব অশান্তির কারনে বাসা থেকে চলে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় ওনাকে সহযোগিতা করার জন্য কি যাকাতের টাকা দেয়া যাবে যাতে ওনি দোকানে মাল উঠাতে পারে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

** উত্তর:**
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তিকে যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে, যদি তিনি প্রকৃতপক্ষে নিসাবের মালিক না হন এবং তাঁর কাছে নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি মাল (যাকাতযোগ্য সম্পদ) না থাকে।

প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যাক্তির মালিকানাধীন জায়গা জমি যদি নেসাব পরিমান টাকায় পৌঁছে, তাহলে সেক্ষেত্রে তাকে যাকাত দেয়া যাবেনা।

অন্যথায় তাকে যাকাত দেয়া যাবে।

যাকাতের হকদার কারা?

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা হয়, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
(সূরা তাওবা: ৬০)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَرْضَ بِحُكْمِ نَبِيٍّ وَلَا غَيْرِهِ فِي الصَّدَقَاتِ حَتَّى حَكَمَ هُوَ فَجَزَّأَهَا ثَمَانِيَةَ أَجْزَاءٍ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকাতের ব্যাপারে নবী বা অন্য কারো ফয়সালায় সন্তুষ্ট হননি; বরং তিনি নিজেই তা আট ভাগে ভাগ করেছেন।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৩০; মুসনাদে আহমাদ)

ফকির-মিসকিনের সংজ্ঞায় হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে: যার কাছে নিসাব পরিমাণ মাল নেই, সে-ই ফকির বা মিসকিন; তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।

আল-হিদায়া-তে আছে:

والفقير من له أدنى شيء والمسكين من لا شيء له

“ফকির সে, যার সামান্য কিছু আছে; আর মিসকিন সে, যার কিছুই নেই।”
(আল-হিদায়া, কিতাবুয যাকাত)

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন শামি রহ. বলেন:

والفقير والمسكين من لا يملك نصابا

“ফকির ও মিসকিন সে, যে নিসাবের মালিক নয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৩/৩৩৯)


নিসাব পরিমাণ কত?

হানাফি মাজহাবে যাকাতের নিসাব নির্ধারিত হয় নিম্নোক্তভাবে:

  • স্বর্ণের নিসাব: ৭.৫ তোলা (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম)
  • রূপার নিসাব: ৫২.৫ তোলা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম)
  • টাকা-পয়সা, ব্যবসায়িক মাল: রূপার নিসাবের মূল্যের সমান বা তার বেশি হলে নিসাব পূর্ণ হবে।
  • প্রয়োজনীয় বাসস্থান, ব্যবহৃত আসবাবপত্র, যানবাহন ইত্যাদি: এগুলো নিসাবে গণনা হয় না।
  • ঋণ: যদি কারো কাছে ঋণ থাকে এবং তা বাদ দেওয়ার পর নিসাব পরিমাণ মাল থাকে না, তবে সে যাকাতের হকদার হতে পারে।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

نصاب الزكاة في الذهب عشرون مثقالا وفي الفضة مائتا درهم

“স্বর্ণের নিসাব বিশ মিসকাল এবং রূপার নিসাব দুইশত দিরহাম।”
(ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুয যাকাত)

বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী রূপার ৬১২.৩৬ গ্রামের মূল্য হিসাব করে যদি কারো কাছে নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসায়িক মাল ইত্যাদির মোট মূল্য সেই পরিমাণ বা তার বেশি হয়, তবে সে নিসাবের মালিক। আর যদি তার চেয়ে কম হয়, তবে সে যাকাতের হকদার।

মুফতি তাকি উসমানি সাহেব তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:

যাকাতের নিসাব হলো রূপার ৫২.৫ তোলা বা তার সমমূল্য। কারো কাছে এর কম থাকলে সে যাকাত গ্রহণের হকদার।

(ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৪৫ প্রসঙ্গ)


স্ত্রীর সম্পদ স্বামীর নিসাবে গণনা হবে না

ইসলামি শরীয়তে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদ পৃথক। স্ত্রীর টাকা স্বামীর মালিকানায় নয়; সুতরাং স্ত্রীর কাছে লাখ টাকা থাকলেও স্বামী নিসাবের মালিক বলে গণ্য হবেন না, যদি স্বামীর নিজের কাছে নিসাব পরিমাণ মাল না থাকে।

রাদ্দুল মুহতার-এ আছে:

لكل واحد منهما مالكة ماله

“তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ সম্পদের মালিক।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০ প্রসঙ্গ)

তাই প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির স্ত্রীর কাছে টাকা আছে বলে তিনি যাকাতের হকদার হওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না; বরং তাঁর নিজের মালিকানায় নিসাব পরিমাণ মাল আছে কি না—তা দেখতে হবে।


প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত

প্রশ্নে বলা হয়েছে:

  • তিনি নিজে ইনকাম করতেন, কিন্তু টাকা-পয়সা বাবা-পরিবার ও স্ত্রীকে দিয়ে দিয়েছেন।
  • বিদেশ থেকে দেশে আসার পর কারো কাছ থেকে কিছু পাননি।
  • জায়গা বেচার সুযোগ নেই।
  • স্ত্রীর কাছে প্রায় লাখ টাকা আছে, কিন্তু স্ত্রী তা দিতে রাজি নন; সন্তানদের কাজে লাগাবেন বলে।
  • তাঁর দোকানে মালামাল নেই; দিনে ১০ টাকা, মাঝে মধ্যে ১০০০ টাকা বিক্রি হয়।
  • বছর শেষে তাঁর নিজের কাছে ২ লাখ টাকার মতোও থাকে না।
  • সংসারে অশান্তি, বাজার-হাট নিয়ে ঝামেলা; সন্তানেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে।
  • তিনি নিজেও অশান্তির কারণে বাসা থেকে চলে গিয়েছিলেন।
  • এখন তাঁর হাত খালি; দোকানে মাল উঠানোর জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন।

এই অবস্থায় যদি তিনি নিজের মালিকানায় নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী না হন—অর্থাৎ তাঁর কাছে নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসায়িক মাল, স্বর্ণ-রূপা ইত্যাদির মোট মূল্য রূপার ৬১২.৩৬ গ্রামের মূল্যের কম হয়—তাহলে তিনি ফকির/মিসকিন হিসেবে যাকাতের হকদার। তাঁকে যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে; এমনকি দোকানে মাল উঠানোর জন্য ব্যবসায়িক পুঁজি হিসেবে দিলেও যাকাত আদায় হবে, ইনশাআল্লাহ।

তবে মনে রাখতে হবে:

  1. স্ত্রীর সম্পদ তাঁর নিসাবে গণনা হবে না।
  2. সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন যাকাতের হকদার হওয়া বা না হওয়ার মানদণ্ড নয়; মানদণ্ড হলো নিজের নিসাবের মালিকানা।
  3. ঋণ থাকলে তা বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে। যদি ঋণ বাদ দেওয়ার পরও নিসাব পরিমাণ মাল থাকে, তবে তিনি যাকাতের হকদার নন।
  4. প্রয়োজনীয় বাসস্থান, ব্যবহৃত আসবাবপত্র, দোকানের প্রয়োজনীয় মালামাল—এগুলো নিসাবে গণনা হয় না; তবে ব্যবসায়িক মাল (বিক্রয়ের জন্য রাখা পণ্য) নিসাবে গণনা হয়।
  5. যাকাতের টাকা দিয়ে দোকানে মাল উঠানো জায়েয; কারণ যাকাতের হকদারকে টাকা দিলে সে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারে। তবে যাকাত দাতা হিসেবে সরাসরি দোকানের মাল কিনে দেওয়ার চেয়ে হকদারকে টাকা দেওয়াই উত্তম, যাতে সে নিজে মালিক হয়ে ব্যবহার করতে পারে।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.