বিবাহিত মহিলার দাওয়াতি কাজ ও তালিম-তাবলিগের হুকুম জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
প্রশ্নের সারমর্ম এই যে, বিবাহিত মহিলার দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি কী, তালিম-তাবলিগের হুকুম কী, এবং ঘর-সংসার ও সন্তান-সন্ততির দায়িত্বের কারণে বাইরে গিয়ে তাবলিগ ও ঘরে তালিম না করতে পারলে গুনাহ হবে কি না।
১. দাওয়াতি কাজ ও তালিম-তাবলিগের হুকুম
দাওয়াতি কাজ তথা দ্বীনের দাওয়াত, তালিম ও তাবলিগ মূলত ফরজে কিফায়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৯; মুসনাদে আহমাদ)
তবে এই ফরজে কিফায়া প্রত্যেক ব্যক্তির উপর বাধ্যতামূলক নয়; বরং যারা এই কাজের যোগ্য ও সুযোগ আছে, তাদের উপর। আর প্রত্যেক মুসলিমের উপর ন্যূনতম কর্তব্য হলো নিজের ঘর-পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে দ্বীনের তালিম দেওয়া, নামাজ-রোজা-হালাল-হারাম শেখানো। এটাই প্রথম ও প্রধান দাওয়াতি দায়িত্ব।
২. বিবাহিত মহিলার দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো, মহিলাদের জন্য ঘরই তাদের প্রধান জায়গা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১১৭৩)
অর্থাৎ নারী পর্দার বস্তু; সে বের হলে শয়তান তার দিকে দৃষ্টি দেয়। এজন্য মহিলাদের জন্য শরিয়তসম্মত পদ্ধতি হলো:
- ঘরে থেকেই তালিম: নিজের ঘরে মেয়েদের ও মহিলাদের জন্য কুরআন-হাদিস ও মাসআলা-মাসায়েলের তালিমের মজলিস করা। এতে পর্দারও পূর্ণ হিফাজত হয় এবং সন্তানদের দেখাশোনাও হয়।
- মহরমদের মাধ্যমে দাওয়াত: স্বামী, ভাই, পিতা বা অন্য মহরমের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো।
- নিজের পরিবার থেকে শুরু: প্রথমে নিজের সন্তান, স্বামী, আত্মীয়-স্বজনকে দ্বীনের তালিম দেওয়া। এটাই সবচেয়ে বড় দাওয়াতি কাজ।
- মহিলাদের মাঝে সীমিত পরিসরে: প্রয়োজনে পূর্ণ পর্দা ও শরিয়তের সীমা রক্ষা করে মহিলাদের মজলিসে তালিম করা যেতে পারে, তবে সন্তানদের অবহেলা করে দূরে সফর করা শরিয়তে সমর্থিত নয়।
৩. সন্তানদের ফেলে দূরে গিয়ে তাবলিগ না করা — গুনাহ হবে কি?
না, ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না। কারণ:
- সন্তানদের লালন-পালন, তাদের দ্বীনি তালিম ও হিফাজত করা মায়ের উপর ওয়াজিব দায়িত্ব। এই ওয়াজিব দায়িত্ব পালনের কারণে নফল বা ফরজে কিফায়া ধরনের দাওয়াতি সফর ছেড়ে দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েয, বরং কর্তব্যপালনই।
- ফরজে কিফায়া তখনই ব্যক্তির উপর নির্দিষ্টভাবে বাধ্যতামূলক হয়, যখন অন্য কেউ তা পালন না করে এবং তার সামর্থ্য ও সুযোগ থাকে। কিন্তু পরিবারের ওয়াজিব হক তার উপর অগ্রাধিকার পায়।
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, নারীর জন্য ঘরে অবস্থান ও পর্দা রক্ষা করা অগ্রগণ্য; বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৬০০-এর কাছাকাছি; কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
- হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ মহিলাদের কর্তব্য হিসেবে ঘরের দায়িত্ব, সন্তানদের তালিম ও পর্দা রক্ষার উপর জোর দিয়েছেন।
তবে হ্যাঁ, নিজের সন্তানদের দ্বীনি তালিম থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা গুনাহের কারণ হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯)
অতএব, ঘরে বসে যতটুকু সম্ভব সন্তানদের নামাজ, কুরআন, দুআ ও আদব-আখলাক শেখানো, এবং ঘরে মহিলাদের জন্য সপ্তাহে একদিন হলেও ছোট তালিমের মজলিস করা — এগুলোই আপনার জন্য যথেষ্ট ও বরকতময় পথ। ব্যস্ততার কারণে কখনো ছুটে গেলে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না, তবে নিয়মিত চেষ্টা জারি রাখা কর্তব্য।
সংক্ষেপে:
- দাওয়াতি কাজ ফরজে কিফায়া; ব্যক্তি বিশেষের উপর বাধ্যতামূলক নয়।
- বিবাহিত মহিলার প্রধান দাওয়াতি কাজ ঘরে থেকে সন্তান-পরিবারকে দ্বীন শেখানো ও ঘরে মহিলাদের তালিমের ব্যবস্থা করা।
- সন্তানদের অবহেলা করে দূরে সফরে তাবলিগে না যাওয়া গুনাহ নয়; বরং ওয়াজিব দায়িত্ব পালন।
- তবে সন্তানদের দ্বীনি তালিমে সম্পূর্ণ অবহেলা করা যাবে না।
وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ