কুলখানী জায়েজ আছে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে শিরনী/শিন্নী করে খাওয়ার হুকুম
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রচলিত কুলখানী হলে তাহা খাওয়া যাবে না। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে প্রচলিত পন্থায় শিরনী/শিন্নী করা শরীয়তসম্মত নয়; বরং এটি বিদআত ও অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।
মৃতের জন্য খাবার আয়োজনের ভিত্তি নেই
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে খাবার তৈরি করে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া—এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনদের যুগে ছিল না। ইবাদত হিসেবে যা প্রমাণিত নয়, তা দ্বীনের মধ্যে সংযোজন (বিদআত)। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ» "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭১৮
হানাফি ফিকহের স্পষ্ট ফতোয়া
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ মৃতের জন্য খাবার প্রস্তুত ও বিতরণের প্রথাকে বিদআত বলে উল্লেখ করেছেন এবং এতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ বলেছেন। তিনি লিখেন, মৃতের বাড়ির লোকদের জন্য খাবার পাঠানো সুন্নত (যেমন জাফর (রাযি.)-এর পরিবারের জন্য রাসূল ﷺ খাবার পাঠিয়েছিলেন—সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩১৩২; সুনানে তিরমিজি, হাদীস ৯৯৮), কিন্তু মৃতের পক্ষ থেকে লোকদের দাওয়াত দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নিন্দনীয় প্রথা।
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ স্পষ্ট লিখেছেন: মৃতের জন্য খানা পাকিয়ে খাওয়ানো বা শিরনী করা বিদআত; এতে সওয়াব হয় না, বরং গুনাহ হয়। (দেখুন: বেহেশতী জেওর, অংশ ১, "মৃতদের জন্য খানা পাকানো ও শিরনী" অধ্যায়)
ফতোয়ায়ে আলমগিরী ও ফতোয়ায়ে উসমানী-তেও মৃতের নামে বিশেষ খাবার আয়োজনের প্রথা নিষিদ্ধ/মাকরূহ হিসেবে উল্লেখ হয়েছে।
কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
«كُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ» "খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" — সূরা আল-আরাফ, আয়াত ৩১
«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ» "তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৮
মৃতের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক/প্রথাগত শিরনী আয়োজনে সম্পদের অপচয় ও লোক-দেখানো উদ্দেশ্য থাকে, যা শরীয়ত নিষিদ্ধ করে।
খাওয়ার বিধান
মাইয়্যিতের ঈসালে ছওয়াব এর লক্ষ্যে দাওয়াতের ইহতিমামের এই পদ্ধতি শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে প্রমানিত নয়।
এবং মাইয়্যিতের ছওয়াব পৌছানোর নিয়তে যেই খাবার তৈরী করা হয়েছে,তাতে শুধু ফকিরদের হক রয়েছে। ধনীরা তার মধ্যে শরীক হবেনা। (কিতাবুন নাওয়াজেল ১/৩৯১)
তবে যেই খাবার মেহমানদারীর জন্য পাকানো হয়েছে,সেটা ধনীরা খেতে পারবে। (ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়্যাহ ১৫২, কিতাবুন নাওয়াজেল ১/৩৭২)
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ﴿۶۰﴾
সাদাকাহ হচ্ছে শুধুমাত্র গরীবদের এবং অভাবগ্রস্তদের, আর এই সাদাকাহর (আদায়ের) জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং (দীনের ব্যাপারে) যাদের মন রক্ষা করতে (অভিপ্রায়) হয় (তাদের), আর গোলামদের আযাদ করার কাজে এবং কর্জদারদের কর্জে (কর্জ পরিশোধে), আর জিহাদে (অর্থাৎ যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য) আর মুসাফিরদের সাহায্যার্থে। এই হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়। (সুরা তওবা ৬০)
হাদীস শরীফে এসেছেঃ-
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٍّ»
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সদকার মাল ধনীদের জন্য হালাল নয়, সুস্থ সবলদের (খেটে খেতে সক্ষম) জন্যও নয়। (আবূ দাঊদ ১৬৩৪, আত্ তিরমিযী ৬৫২, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক্ব ৭১৫৫, ইবনু আবী শায়বাহ্ ১০৬৬৩, আহমাদ ৬৫৩০, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১৪৭৮, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৭২৫১।)
وإن اتخذ طعاماً للفقراء کان حسناً، وأطال ذلک في المعراج۔ (شامی زکریا ۳؍ ۱۴۸، طحطاوي علی مراقي الفلاح، الجنائز / فصل حملہا ودفنہا ۵۱۰ مصر، کفایت المفتی ۴؍۱۱۶، فتاوی شیخ الاسلام ۱۵۱) সারমর্মঃ- যদি শুধু ফকিরদের জন্য খানা তৈরী করে,তাহলে তাহা উত্তম।
★সু-প্রিয় প্রশ্নকারী, কুলখানীর উদ্দেশ্যে দাওয়াত দেয়া হলে সেই দাওয়াতে অংশ গ্রহন বিদ'আত।
তবে বিদ'আতী ভাবে নয়,বৈধ ভাবে (৩/৭/৩০ দিন মৃত্যুবার্ষিকী নয়, মিলাদ নয়) ঈসালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে দাওয়াত দেয়া হলে সেক্ষেত্রে হাদীয়া গ্রহন জায়েজ হবে।
এক্ষেত্রে মাইয়্যিতের ঈসালে ছওয়াবের জন্য রান্নাকৃত উক্ত খাবার যারা ধনী (নেসাবের মালিক), তারা খেতে পারবেনা।
যারা যারা গরিব,নেসাব পরিমান সম্পদ মালিক নয়,,সেক্ষেত্রে তারা খাবার খেতে পারবেন।
আর সেই খাবার মেহমানদারীর জন্যেও পাকানো হলে ধনীরাও সেই খাবার খেতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে ধনীর খাওয়ার দ্বারা ঈসালে ছওয়াব হবেনা।