স্বামী বলছে "তোক বাদ দিয়ে আরেকটা বিয়ে করব" এবং "তুই তোর বাবার বাড়ি চলে যা" — এতে কি তালাক হয়?

Family Life · Hanafi

Question No: 7000
Questioner: Khadijatun Nur
Question Asked: 16 Oct 2026, 10:32 PM
Reviewed & Published: 16 Oct 2026, 11:27 PM
Views: 9
Tokens: 4,391
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী বলছে, “তোক বাদ দিয়ে আরেকটা বিয়ে করলে কী হয়েছে?করব আরেকটা”
স্ত্রী বলছে, “বাদ দিয়ে মানে?”
স্বামী আবার বলছে, “তোক রেখে আর কী!”
অর্থাৎ, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছিল। এরপর স্বামী বলছে, “চলে যা, তুই তোর বাবার বাড়ি।সংসার করব না তোর সাথে।”
বাবার বাড়ি চলে যেতে বলার উদ্দেশ্য ছিল, প্রথম স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকবে, কিন্তু তার সমস্ত দায়িত্ব স্বামী পালন করবে।
এতে কি কোনো তালাক হয়?

Answer

প্রশ্ন: এতে কি কোনো তালাক হয়?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, শুধু "তুই তোর বাবার বাড়ি চলে যা" বললে তালাক হয় না। তবে প্রশ্নে বর্ণিত কথোপকথনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গে "তোক বাদ দিয়ে" বা "তোক রেখে" — এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছে, যা কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) তালাকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাকের প্রকারভেদ

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক দুই প্রকার:

  1. সরীহ (স্পষ্ট) তালাক — যেমন: "তালাক", "তুই তালাক", "আমি তোকে তালাক দিলাম" ইত্যাদি। এতে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শব্দ শুনলেই এক তালাকে বায়েন (অপূরণীয়) তালাক পতিত হয়।

  2. কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) তালাক — যেমন: "তুই বাবার বাড়ি চলে যা", "আমি তোকে চাই না", "তুই আমার জন্য হারাম" ইত্যাদি। এতে নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ (দলালতুল হাল) ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

রেফারেন্স: আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক।


২. "তুই তোর বাবার বাড়ি চলে যা" — এতে তালাক হয় কি?

উত্তর: না, এতে তালাক হয় না।

কারণ:

  • এটি কিনায়া শব্দ।
  • কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয়, নিয়ত না থাকলে হয় না।
  • প্রশ্নে স্পষ্ট বলা হয়েছে: "বাবার বাড়ি চলে যেতে বলার উদ্দেশ্য ছিল, প্রথম স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকবে, কিন্তু তার সমস্ত দায়িত্ব স্বামী পালন করবে।" অর্থাৎ, স্বামীর উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল না; বরং স্ত্রীকে বাবার বাড়িতে রেখে ভরণপোষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল।

যেহেতু নিয়ত তালাকের ছিল না, বরং ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল — সুতরাং তালাক পতিত হবে না।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৯৮-৩০০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাক, বাবুল কিনায়াত।


৩. "তোক বাদ দিয়ে আরেকটা বিয়ে করব" — এতে তালাক হয় কি?

এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

দিক ১: "তোক বাদ দিয়ে" — শব্দটি কিনায়া। যদি স্বামী এই কথার দ্বারা প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার নিয়ত করে থাকে, তাহলে এক তালাকে বায়েন পতিত হবে। আর যদি নিয়ত না থাকে, শুধু দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্যে বলে থাকে, তাহলে তালাক হবে না।

দিক ২: প্রশ্নে স্ত্রী নিজেই জিজ্ঞেস করেছে: "বাদ দিয়ে মানে?" — স্বামী উত্তরে বলেছে: "তোক রেখে আর কী!" — অর্থাৎ, স্বামী স্পষ্ট করেছে যে সে স্ত্রীকে রেখেই দ্বিতীয় বিয়ে করবে, বাদ দেবে না। এতে বোঝা যায়, স্বামীর "বাদ দিয়ে" বলার দ্বারা তালাকের নিয়ত ছিল না; বরং দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলার সময় অসতর্কভাবে শব্দ ব্যবহার করেছে।

সুতরাং, এই কথোপকথনেও তালাক পতিত হয়নি।

তবে সতর্কতা: যদি স্বামী "তোক বাদ দিয়ে" বলার সময় মনে মনে তালাকের নিয়ত করে থাকে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। নিয়তের বিষয়টি স্বামী নিজেই জানবে; সে যদি বলে "আমি তালাকের নিয়ত করিনি", তাহলে তালাক হবে না।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩০২; বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুত তালাক।


৪. গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: কিনায়া শব্দে তালাকের শর্ত

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য দুটি শর্তের যেকোনো একটি থাকতে হবে:

  1. তালাকের নিয়ত — স্বামী মনে মনে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করবে।
  2. দলালতুল হাল (পরিস্থিতির প্রমাণ) — যেমন: ঝগড়া-বিবাদের সময়, রাগের মুহূর্তে, বা এমন পরিস্থিতি যা তালাকের দিকে ইঙ্গিত করে।

প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায়:

  • স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছিল — এটি তালাকের পরিস্থিতি নয়।
  • "বাবার বাড়ি চলে যা" বলার উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রীকে বাবার বাড়িতে রাখা, তালাক দেওয়া নয়।
  • স্ত্রী নিজেই "বাদ দিয়ে মানে?" জিজ্ঞেস করলে স্বামী স্পষ্ট করে "তোক রেখে" বলেছে — অর্থাৎ তালাকের কোনো ইঙ্গিত নেই।

সুতরাং, এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি।

রেফারেন্স: আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক, ফাসলুন ফিল কিনায়াত; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক; ইমদাদুল ফাতাওয়া, কিতাবুত তালাক।


৫. স্বামী-স্ত্রীর করণীয়

  1. স্বামী যদি সত্যিই তালাকের নিয়ত না করে থাকে, তাহলে তালাক হয়নি। তবে ভবিষ্যতে তালাকের মতো শব্দ (যেমন: "বাদ দিয়ে", "চলে যা", "তুই আমার না") ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তালাক হলো সেই বিষয়, যা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি অপছন্দনীয়।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৭৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২০১৮।

  1. স্ত্রী যদি তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা করে, তাহলে স্বামীর সাথে কথা বলে নিয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত। স্বামী যদি বলে "আমি তালাকের নিয়ত করিনি", তাহলে তালাক হয়নি; বিবাহ বহাল আছে।

  2. সন্দেহ থাকলে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি মাসআলা জিজ্ঞেস করা উচিত, কারণ নিয়তের বিষয়টি স্বামী ছাড়া অন্য কেউ জানে না।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | "তুই তোর বাবার বাড়ি চলে যা" | কিনায়া শব্দ; নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না | | "তোক বাদ দিয়ে আরেকটা বিয়ে করব" | কিনায়া শব্দ; তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক, নাহলে না | | "তোক রেখে আর কী!" | স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তালাকের নিয়ত নেই | | সামগ্রিকভাবে | তালাক পতিত হয়নি |

উপসংহার: প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি, কারণ স্বামীর উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল না; বরং স্ত্রীকে বাবার বাড়িতে রেখে ভরণপোষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল। তবে ভবিষ্যতে এমন সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.