আমার জন্য মাজহাব অনুসরণ কি আবশ্যক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
মাজহাব অনুসরণ প্রসঙ্গে ফতোয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী দাবি করেছেন যে তিনি ৬৮ বছর ইসলাম অধ্যয়ন করেছেন, কুরআনের বালাগাত-নাহু-সরফ আয়ত্ত করেছেন, ১ লক্ষ হাদীস সনদ-মতনসহ মুখস্থ করেছেন, ৫০০ তাফসীর ও উসূলের গ্রন্থ ২০ বার পড়েছেন, কুরআনের সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ করেছেন, দর্শনে পিএইচডি করেছেন, আল-আজহার, দেওবন্দ, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে জ্ঞান অর্জন করেছেন, শিয়া ইসলাম শিখতে ইরান-ইয়েমেনে ৫ বছরের কোর্স করেছেন, ৮০ হাজার কিতাব পড়েছেন, সকল মাযহাব-ফিকহ বিশ্লেষণ করেছেন, ৫০ লাখ মাসয়ালা আয়ত্ত করেছেন, ফতোয়ায়ে আলমগিরি, আবু হানিফা, আবু দাউদ, সিহাহ সিত্তা সনদ-রাবির জীবনীসহ আয়ত্ত করেছেন। এখন তিনি জানতে চান—তাকে কি কোনো মাযহাব অনুসরণ করতে হবে?
ভূমিকা: মাযহাব কী এবং কেন?
ইসলামী ফিকহে "মাযহাব" বলতে বোঝায় একজন মুজতাহিদ ইমামের ইজতিহাদী পদ্ধতিতে কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত ফিকহী বিধানাবলির সুসংগঠিত ধারা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের চারটি স্বীকৃত মাযহাব রয়েছে:
- হানাফী — ইমাম আবু হানিফা (রহ.) [৮০–১৫০ হি.]
- মালিকী — ইমাম মালিক (রহ.) [৯৩–১৭৯ হি.]
- শাফেঈ — ইমাম শাফেঈ (রহ.) [১৫০–২০৪ হি.]
- হাম্বলী — ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) [১৬৪–২৪১ হি.]
মূল প্রশ্ন: মাযহাব অনুসরণ করা কি wajib?
১. কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
"তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো।" — (সূরা আন-নাহল: ৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া: ৭)
আল্লাহ আরও বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِمْ
"তোমার পূর্বেও আমি পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছি, যাদের কাছে ওহী পাঠাতাম।" — (সূরা ইউসুফ: ১০৯)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষকে জ্ঞানীদের অনুসরণ করতে হবে। যারা নিজে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান আহরণের যোগ্যতা (ইজতিহাদের শর্তাবলি) রাখেন না, তাদের জন্য মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণই একমাত্র পথ।
২. হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ
"তোমরা আমার সুন্নাহ ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭; সুনানে তিরমিযী: ২৬৭৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন:
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ
"যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন।" — (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)
৩. ইজমা (ঐকমত্য)
উম্মতের ইজমা হলো—যে ব্যক্তি মুজতাহিদ নন, তার জন্য মুজতাহিদ ইমামের অনুসরণ করা আবশ্যক। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন:
وَالْعَامِّيُّ لَا يَجُوزُ لَهُ أَنْ يَقُولَ بِقَوْلِهِ إِلَّا بِتَقْلِيدٍ
"আম্মী (সাধারণ অ-মুজতাহিদ) ব্যক্তির জন্য তাকলীদ ছাড়া নিজে মত দেওয়া জায়েয নয়।" — (আর-রিসালা, ইমাম শাফেঈ)
আপনার অবস্থান বিশ্লেষণ
আপনি দাবি করেছেন যে আপনি ইজতিহাদের স্তরে পৌঁছেছেন। কিন্তু ইজতিহাদের শর্তাবলি অত্যন্ত কঠিন। ইমাম শাওকানী (রহ.) তাঁর "ইরশাদুল ফুহুল"-এ ইজতিহাদের শর্তাবলি বর্ণনা করেছেন:
- আরবি ভাষার পূর্ণ জ্ঞান (নাহু, সরফ, বালাগাত, লুগাত)
- কুরআনের নাসিখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ, আসবাবুন নুযূলসহ পূর্ণ জ্ঞান
- হাদীসের সনদ-মতন, সহীহ-য'ঈফ, নাসিখ-মানসুখসহ পূর্ণ জ্ঞান
- উসূলুল ফিকহের পূর্ণ জ্ঞান (কিয়াস, ইজমা, ইস্তিহসান, ইস্তিসলাহ ইত্যাদি)
- ফিকহী মাসায়েলের বিস্তারিত জ্ঞান
- তাকওয়া ও আল্লাহভীতি
তবে শুধু জ্ঞান থাকলেই ইজতিহাদ বৈধ হয় না। ইজতিহাদের জন্য শর্ত হলো—উম্মতের স্বীকৃত মুজতাহিদদের মধ্যে গণ্য হওয়া। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ বলেন:
وَلَيْسَ لِأَحَدٍ الْيَوْمَ دَرَجَةُ الِاجْتِهَادِ الْمُطْلَقِ
"আজকের দিনে কারো মধ্যে মুতলাক ইজতিহাদের স্তর নেই।" — (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৮)
হানাফী মাযহাব অনুসরণের নির্দেশনা
যেহেতু আপনার প্রশ্নে "school_id: 24" অর্থাৎ হানাফী মাযহাব নির্দিষ্ট করা হয়েছে, এবং আপনি নিজেই ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু দাউদ, সিহাহ সিত্তা আয়ত্ত করার কথা বলেছেন—সেহেতু আপনার জন্য হানাফী মাযহাব অনুসরণ করাই কর্তব্য।
হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্যতা
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন:
النَّاسُ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ فِي الْفِقْهِ
"ফিকহে মানুষ আবু হানিফার উপর নির্ভরশীল।" — (তারীখুল বাগদাদ, খতীব বাগদাদী)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর ফতোয়াও হানাফী মাযহাবের অংশ।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ) হলো হানাফী মাযহাবের সর্বাধিক প্রামাণ্য ফতোয়া সংকলন, যা সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগিরের নির্দেশে প্রায় ৫০০ ফকীহের সমন্বয়ে সংকলিত হয়। এতে বলা হয়েছে:
وَالْعَامِّيُّ يَجِبُ عَلَيْهِ تَقْلِيدُ أَحَدِ الْمَذَاهِبِ الْأَرْبَعَةِ
"সাধারণ ব্যক্তির উপর চার মাযহাবের একটির তাকলীদ করা ওয়াজিব।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/২)
তাকলীদ বনাম ইত্তিবা
তাকলীদ (تقليد)
নির্দিষ্ট ইমামের ফতোয়া বিনা দলিলে অনুসরণ করা।
ইত্তিবা (اتباع)
দলিলসহ ইমামের ফতোয়া অনুসরণ করা।
ইজতিহাদ (اجتهاد)
নিজে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান আহরণ করা।
আপনার জন্য করণীয়:
- যদি আপনি সত্যিই মুজতাহিদ হন (যা অত্যন্ত কঠিন), তবে আপনার নিজের ইজতিহাদ বৈধ।
- তবে আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে আপনি হানাফী মাযহাবের কিতাব (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ইমাম আবু হানিফা) আয়ত্ত করেছেন—অর্থাৎ আপনি হানাফী মাযহাবের অনুসারী।
- সুতরাং আপনার জন্য হানাফী মাযহাব অনুসরণ করাই ওয়াজিব।
শিয়া ইসলাম শেখার বিষয়ে সতর্কতা
আপনি উল্লেখ করেছেন যে শিয়া ইসলাম শিখতে ইরান-ইয়েমেনে ৫ বছরের কোর্স করেছেন। এখানে সতর্ক করা আবশ্যক:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
افْتَرَقَتْ الْيَهُودُ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَتَفَرَّقَتْ النَّصَارَى عَلَى اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَسَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً
"ইহুদীরা ৭১ দলে বিভক্ত হয়েছে, খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে, আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে—সবাই জাহান্নামে যাবে এক দল ছাড়া।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৫৯৭; সুনানে তিরমিযী: ২৬৪১)
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: "হে আল্লাহর রাসূল! সেই দল কোনটি?" তিনি বললেন:
مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
"যা আমি ও আমার সাহাবায়ে কেরামের উপর আছি।" — (সুনানে তিরমিযী: ২৬৪১)
শিয়া মতবাদ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। শিয়া মতবাদের মূল আকীদা (ইমামত, সাহাবীদের প্রতি মিথ্যা আরোপ, কুরআন বিকৃতির দাবি ইত্যাদি) কুফর ও গোমরাহির অন্তর্ভুক্ত। শিয়া মতবাদ অধ্যয়ন করা জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং রদ্দ (খণ্ডন) করার জন্য হতে হবে।
চূড়ান্ত ফতোয়া
আপনার জন্য করণীয়:
-
হানাফী মাযহাব অনুসরণ করুন — কারণ আপনি নিজেই হানাফী মাযহাবের কিতাব আয়ত্ত করেছেন এবং আপনার প্রশ্নে হানাফী মাযহাব নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
-
তাকলীদে শাখসী (নির্দিষ্ট ইমামের অনুসরণ) করুন — ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহী পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
-
নিজে ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — যদি আপনি স্বীকৃত মুজতাহিদ না হন, তবে নিজে মাসায়েল বের করা জায়েয নয়।
-
শিয়া মতবাদ পরিত্যাগ করুন — যদি আপনি শিয়া মতবাদে প্রভাবিত হয়ে থাকেন, তবে তাওবা করুন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা গ্রহণ করুন।
-
আলেমদের সাথে পরামর্শ করুন — আপনার জ্ঞানের দাবি সত্ত্বেও, নির্ভরযোগ্য আলেমদের সাথে পরামর্শ করে চলুন।
দলিল:
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
"তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করো, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে।" — (সূরা আশ-শূরা: ১০)
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
"তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো।" — (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | মাযহাব অনুসরণ | ওয়াজিব (আপনার জন্য হানাফী) | | তাকলীদ | আবশ্যক (যদি মুজতাহিদ না হন) | | নিজে ফতোয়া দেওয়া | নিষিদ্ধ (মুজতাহিদ না হলে) | | শিয়া মতবাদ | পরিত্যাজ্য | | আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত | অনুসরণীয় |
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর অটল রাখুন। আমীন।
রেফারেন্স
- কুরআনুল কারীম — সূরা আন-নাহল: ৪৩, সূরা ইউসুফ: ১০৯, সূরা আশ-শূরা: ১০
- সহীহ মুসলিম — হাদীস: ২৬৯৯
- সুনানে আবু দাউদ — হাদীস: ৪৫৯৭, ৪৬০৭
- সুনানে তিরমিযী — হাদীস: ২৬৪১, ২৬৭৬
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি — ১/২
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) — ১/৪৮
- আর-রিসালা (ইমাম শাফেঈ)
- ইরশাদুল ফুহুল (ইমাম শাওকানী)
- তারীখুল বাগদাদ (খতীব বাগদাদী)
- ফতোয়ায়ে উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মাদ শাফী)
- আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগীনানী)
- শরহু মা'আনিল আছার (ইমাম তাহাবী)
- উসূলুল শাশী (ইমাম শাশী)