মাযহাব অনুসরণ না করে নিজের পছন্দমতো আমল করা কি বৈধ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমি কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব, দল বা ব্যক্তির অন্ধ অনুকরণ করি না। আমি নিজে আরবী ভাষা শিখছি এবং কুরআন-সুন্নাহ বিশ্লেষণ করে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
দ্বীনের ক্ষেত্রে আমি ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.), দেওবন্দী ওলামা এবং অন্যান্য বিভিন্ন ঘরানার ইসলামি চিন্তাবিদদের বইপত্র পড়ি। এদের সবার মধ্য থেকে যে বিষয়গুলো কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সবচেয়ে কাছাকাছি এবং উত্তম মনে হয়, আমি শুধু সেগুলো গ্রহণ করে আমল করার চেষ্টা করি।
মুহতারামের নিকট প্রশ্ন:
১. কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব বা দল সম্পূর্ণ অনুকরণ না করে, এভাবে নিজের সাধ্যানুযায়ী উত্তম ও সঠিক মতটি বেছে নিয়ে আমল করা কি শরীয়তে বৈধ?
২. সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পড়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শরঈ ঝুঁকি আছে কি? এই বিষয়ে আপনার নসীহত কামনা করছি।
Answer
উত্তর: মাযহাব ও ইজতিহাদের বিষয়ে শরঈ দিকনির্দেশনা
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
ভূমিকা
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। দ্বীনি জ্ঞানের প্রতি আপনার আগ্রহ ও কুরআন-সুন্নাহ বোঝার চেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে এ বিষয়ে শরীয়তের সঠিক পথনির্দেশনা জানা অপরিহার্য। নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর: নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ না করে নিজের পছন্দমতো আমল করা কি বৈধ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়। বরং একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করা অপরিহার্য।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. ইজতিহাদের যোগ্যতা (আহলিয়্যাত) ছাড়া ইজতিহাদ করা নিষিদ্ধ
ইজতিহাদ হলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরাসরি মাসআলা উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন:
- আরবি ভাষার গভীর পাণ্ডিত্য (নাহু, সরফ, বালাগাত)
- উসূলে ফিকহের পূর্ণ জ্ঞান
- কুরআনের নাসিখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ সম্পর্কে জ্ঞান
- হাদীসের রিজাল, ইলাল, তারজীহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান
- ফিকহী মাসআলাসমূহের ইজমা ও ইখতিলাফের পূর্ণ জ্ঞান
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) বলেন:
"ইজতিহাদের জন্য যে শর্তাবলী প্রয়োজন, তা অর্জন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।"
২. কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো।" (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, যারা জ্ঞানী নয় তাদের জন্য আহলে ইলমের অনুসরণ করা কর্তব্য।
৩. হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَلَا إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ كَانُوا يَتَفَرَّقُونَ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً "সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাবগণ ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, সবাই জাহান্নামে যাবে এক দল ছাড়া।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৫৯৭, তিরমিযী: ২৬৪১)
৪. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নির্দেশনা
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাঁর ছাত্রদের বলতেন:
"আমাদের মত গ্রহণ করা কারো জন্য বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে জানতে পারে আমাদের দলীল কী।"
(ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, ১/৬৮)
৫. ফিকহী কিতাবসমূহের বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
"আমাদের যুগে মুফতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা কঠিন। তাই সাধারণ মানুষের জন্য চার মাযহাবের কোনো একটির অনুসরণ করা ওয়াজিব।"
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৫০)
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে না, তার জন্য নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ১/১৩২)
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর অনুবাদ পড়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, এতে বড় শরঈ ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষত যারা আরবি ভাষা ও উসূলে ফিকহে পারদর্শী নন।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. অনুবাদের সীমাবদ্ধতা
কুরআনের অনুবাদ মূল আরবির পূর্ণ মর্ম প্রকাশ করতে পারে না। একটি আয়াতের একাধিক অর্থ হতে পারে, যা আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান ছাড়া বোঝা অসম্ভব।
উদাহরণ:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
এখানে "قُرُوءٍ" শব্দের অর্থ হায়েজ ও পবিত্রতা—উভয়ই হতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) "হায়েজ" অর্থ নিয়েছেন, ইমাম শাফেঈ (রহ.) "পবিত্রতা" অর্থ নিয়েছেন। অনুবাদ পড়ে কেউ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
২. হাদীসের সনদ ও মান যাচাইয়ের প্রয়োজন
সহীহ, হাসান, য'ঈফ, মাওযূ—এসব যাচাইয়ের জন্য মুহাদ্দিসীনের পদ্ধতি জানা আবশ্যক। সাধারণ পাঠক সহজেই য'ঈফ হাদীসকে সহীহ মনে করতে পারেন।
৩. নাসিখ-মানসুখ (রহিত ও রহিতকারী) না জানার ঝুঁকি
কুরআনে কিছু আয়াত পরবর্তীতে রহিত হয়েছে। উদাহরণ: মদ্যপান সম্পর্কে ধারাবাহিক আয়াত। যদি কেউ প্রথম আয়াত পড়ে আমল করে, তবে ভুল করবে।
৪. ইজমা ও ইখতিলাফের জ্ঞান ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুল
সাহাবা, তাবেঈন ও মুজতাহিদ ইমামগণের ইজমা ও ইখতিলাফ না জেনে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
৫. ইমাম আওযাঈ (রহ.)-এর সতর্কবাণী
"যে ব্যক্তি হাদীসের কিতাব পড়ে সরাসরি মাসআলা গ্রহণ করে, সে বিভ্রান্ত হবে।"
(আল-ইলম ওয়াল মুতাআল্লিম)
৬. ইমাম মালিক (রহ.)-এর বক্তব্য
"যে ব্যক্তি ফিকহ না জেনে হাদীস থেকে মাসআলা নেয়, সে ফিতনায় পড়ে যায়।"
(তারতীবুল মাদারিক, ১/১৪২)
সঠিক পদ্ধতি: কী করা উচিত?
১. নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করুন
হানাফী মাযহাব অনুসরণ করা আপনার জন্য সর্বোত্তম, কারণ:
- এটি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সমন্বয়ে পরিপূর্ণ
- উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য
২. জ্ঞান অর্জন চালিয়ে যান
আপনি আরবি শিখছেন—এটি প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখবেন:
- আরবি ভাষা জানা ≠ ইজতিহাদের যোগ্যতা
- উসূলে ফিকহ, হাদীসের উসূল, রিজাল শাস্ত্র—এসবও শিখতে হবে
- কমপক্ষে ১০-১৫ বছর গভীর অধ্যয়ন ছাড়া ইজতিহাদ সম্ভব নয়
৩. নির্ভরযোগ্য উলামার পরামর্শ নিন
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
৪. বিভিন্ন ঘরানার বই পড়া প্রসঙ্গে
বিভিন্ন ঘরানার বই পড়া জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য ভালো, তবে:
- আকীদা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা অনুসরণ করুন
- ফিকহ: হানাফী মাযহাব অনুসরণ করুন
- তাসাউফ: বিশুদ্ধ সুফি তরিকার অনুসরণ করুন
- বিতর্কিত বিষয়: মুফতি সাহেবের পরামর্শ নিন
৫. ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) প্রসঙ্গে
ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) একজন বড় আলিম ছিলেন, তবে তাঁর কিছু মত আহলে সুন্নাতের ইজমার বিপরীত। তাই তাঁর সব মত গ্রহণ করা ঠিক নয়। বরং হানাফী মাযহাবের অনুসরণই আপনার জন্য নিরাপদ।
উপসংহার ও নসীহত
প্রিয় ভাই, আপনার উদ্দেশ্য প্রশংসনীয়—কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা। কিন্তু পদ্ধতিটি সঠিক নয়। ইসলামে ইজতিহাদ একটি বিশেষজ্ঞ বিষয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য নয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ "মুমিনদের সবার জিহাদে বের হওয়া উচিত নয়। তবে প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে এবং নিজেদের জাতিকে সতর্ক করে, যাতে তারা সাবধান হয়।" (সূরা আত-তাওবা: ১২২)
আমার নসীহত:
- হানাফী মাযহাব অনুসরণ করুন
- আরবি শেখা চালিয়ে যান, তবে উসূলে ফিকহও শিখুন
- নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নিন
- বিতর্কিত মাসআলায় নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে উলামার কাছে জিজ্ঞাসা করুন
- ইবনে তাইমিয়াহ, দেওবন্দী ওলামা ও অন্যান্য ঘরানার বই পড়ুন—তবে ফিকহী মাসআলায় হানাফী মাযহাবের অনুসরণ করুন
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।