মা-বাবার দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে সন্তানের করণীয় কী? ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মা-বাবাকে কিভাবে বোঝাবো?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মা-বাবার ব্যক্তিগত বিষয় সমাধানে সন্তানের করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন সন্তান তার মা-বাবার মধ্যকার দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন। মা মেয়েদের কাছে ঘুমান, বাবা রাগ করেন। মা অজুহাত দেন যে বাবা ঘুমাতে দেন না, মশা ডুকিয়ে ফেলেন, ঘুমের মধ্যে গায়ে হাত লাগলে ঘুম ভেঙে যায়। মা ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের রোগী, সারাদিন নাটক দেখেন, নামাজ পড়েন, দ্বীনের জ্ঞান কম, ঘর-স্বামী বাদ দিয়ে আত্মীয়দের কাজে দৌড়ান, নিজের হাঁটু ব্যথা। বাবা স্বাধ্যমত স্ত্রীকে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। সন্তান হিসেবে কীভাবে বুঝাবেন?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও সমাধান
১. সন্তানের মর্যাদা ও দায়িত্ব
ইসলামে সন্তানের উপর পিতা-মাতার হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
তবে পিতা-মাতার দাম্পত্য বিষয়ে সন্তানের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। সন্তান হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো—নম্রভাবে, সম্মানের সাথে, কৌশলীভাবে উপদেশ দেওয়া, সরাসরি অভিযোগ না করা।
২. মাকে বোঝানোর কৌশল
ক. সরাসরি অভিযোগ নয়, ভালোবাসা দিয়ে শুরু করুন: মাকে বলুন—"আম্মু, আপনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আপনার সুখ-শান্তি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"
খ. দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝান: স্বামীর হক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا "যদি আমি কাউকে অন্য কারো জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম।" (তিরমিযী: ১১৫৯)
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا رَاضٍ عَنْهَا دَخَلَتِ الْجَنَّةَ "যে স্ত্রী এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (তিরমিযী: ১১৬১)
গ. মায়ের শারীরিক সমস্যার সমাধান:
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের কারণে মায়ের ঘুমের সমস্যা হতে পারে—ডাক্তারের পরামর্শ নিন
- মশারির সমস্যা: ভালো মানের মশারি কিনে দিন, মশা নিরোধক ব্যবস্থা করুন
- হাঁটু ব্যথার চিকিৎসা করান
ঘ. নাটক দেখা কমানো: নম্রভাবে বলুন—"আম্মু, নাটক দেখলে সময় নষ্ট হয়, নামাজ-কুরআন পড়লে শান্তি পাবেন।" সরাসরি নিষেধ না করে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন।
৩. বাবাকে বোঝানোর কৌশল
বাবা রাগ করেন—এটি স্বাভাবিক, কারণ তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে দূরত্ব অনুভব করেন। বাবাকে বলুন:
- "আব্বু, আম্মু অসুস্থ, তার একটু বিশেষ যত্ন দরকার"
- "আব্বু, আপনি আম্মুকে একটু সময় দিন, সে ভালো হয়ে যাবে"
- বাবাকে দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝান যে, স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ করা রাসূল ﷺ-এর সুন্নত:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫)
৪. সন্তান হিসেবে আপনার করণীয়
| করণীয় | বর্জনীয় | |--------|---------| | নম্রভাবে উপদেশ দেওয়া | সরাসরি অভিযোগ করা | | মা-বাবার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা | একজনের কাছে অন্যজনের নিন্দা করা | | দ্বীনি জ্ঞান বাড়ানোর ব্যবস্থা করা | জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া | | দু'আ করা | হতাশ হয়ে পড়া | | পারিবারিক পরিবেশ সুন্দর করা | পক্ষপাতিত্ব করা |
৫. বিশেষ পরামর্শ
১. মা-বাবাকে একসাথে নিয়ে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন—যেমন একসাথে কুরআন শোনা, দ্বীনি আলোচনা।
২. মায়ের আত্মীয়দের কাজে দৌড়ানো প্রসঙ্গে: নম্রভাবে বলুন—"আম্মু, আপনার হাঁটু ব্যথা, বিশ্রাম দরকার। আত্মীয়রা বুঝবে।"
৩. মায়ের ঘুমের সমস্যা: যদি সত্যিই বাবার কারণে ঘুম না হয়, তবে আলাদা ঘুমের ব্যবস্থা করা জায়েয। তবে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে।
৪. দু'আ করুন: আল্লাহর কাছে মা-বাবার মধ্যে ভালোবাসা ও বোঝাপড়া তৈরি করার দু'আ করুন।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন।" (সূরা ফুরকান: ৭৪)
৬. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- সন্তান হিসেবে পিতা-মাতার দাম্পত্য বিষয়ে বিচারক হবেন না। আপনি উভয়ের সন্তান, উভয়কেই সম্মান করুন।
- মায়ের প্রতি অবাধ্যতা বা বাবার প্রতি অবাধ্যতা কোনোভাবেই জায়েয নয়। নম্রভাবে, ভালোবাসা দিয়ে বোঝান।
- যদি সমস্যা গুরুতর হয়, তবে একজন বিশ্বস্ত দ্বীনি আলেম বা পারিবারিক পরামর্শকের সাহায্য নিন।
সারসংক্ষেপ
সন্তান হিসেবে আপনার কর্তব্য—ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য ও দু'আ। সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়, বরং কৌশলী উপদেশ। মায়ের শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা করান, দ্বীনি জ্ঞান বাড়ানোর ব্যবস্থা করুন, বাবাকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব বোঝান। আল্লাহর কাছে দু'আ করুন—তিনিই হৃদয় পরিবর্তনকারী।
রেফারেন্স
- সূরা বনী ইসরাইল: ২৩
- সূরা ফুরকান: ৭৪
- তিরমিযী: ১১৫৯, ১১৬১, ৩৮৯৫
- রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২
- বেহেশতী জেওর, বিবাহ অধ্যায়
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা নিসা: ১৯