প্রিয়জন হারানোর পর আল্লাহর সিদ্ধান্ত।
Family Life · Hanafi
Question
আমার এক ননদ আছে। ননদের সাথে এক ছেলের সম্পর্ক ছিল। কিন্ত কিছুদিন আগে ছেলেটি মারা যায়। দুইজনের ই বয়স অনেক কম। ছেলেটির সাথে মেয়েটির বিয়ে হবার কথা ছিল, কিন্তু ছেলেটি হঠাৎ মারা যাওয়াতে আমার ননদের মাথায় নানা প্রশ্ন আসছে। যেগুলো সবগুলোর উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখানে করছি।
১। আল্লাহ তো জানত ছেলেটি মারা যাবে, তাহলে কেন ওদের মধ্যে সম্পর্ক হল?
২। ছেলেটা মারা যাবার পর কি দুনিয়াতে মেয়েটা কি হালতে আছে সেটা জানতে পারবে?
৩। মেয়েটা ছেলেটার জন্য দুয়া করতে চাইলে কি দুয়া করবে?
৪। মেয়েটা কি ছেলেটার বড় ভাইকে বিয়ে করতে পারবে? ছেলেটার রুহ কি এই বিষয়ে জানবে?
৫। ছেলে মেয়ে দুইজন ই যদি জান্নাতি হয়, জান্নাতে কি ওদের দেখা হবে?
৬। মেয়েটা এরকম প্রশ্ন করাতে ওর কি গুনাহ হবে? ধৈর্য্য ধারণ করতে ওর কি কি করা উচিত?
জাযাকাল্লাহ!
Answer
উত্তর: আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট মাসআলাসমূহ
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রিয় বোন, আপনার ননদের এই কঠিন সময়ে তার মনে যে প্রশ্নগুলো জাগছে, তা স্বাভাবিক। ইসলামে এ ধরনের প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান অর্জনের জন্যই প্রশ্ন করা হয়। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে ধারাবাহিকভাবে উত্তর দেওয়া হলো।
১। আল্লাহ তো জানতেন ছেলেটি মারা যাবে, তাহলে কেন তাদের মধ্যে সম্পর্ক হলো?
এটি তাকদীর (ভাগ্য) সংক্রান্ত প্রশ্ন। ইসলামের আকীদা হলো—আল্লাহ তা'আলা সবকিছু আগেই জানেন এবং লওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বান্দাকে ইচ্ছার স্বাধীনতা (এখতিয়ার) দেওয়া হয়েছে। বান্দা নিজের ইচ্ছায় কাজ করে, আর আল্লাহর পূর্বজ্ঞান তা বাস্তবায়িত হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, আর যা তিনি না চান তা হয় না।"
(সূরা আল-কাহফ: ৩৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় লেখা আছে।"
(সূরা আর-রাদ: ৩৮)
মূল কথা: আল্লাহর জানা মানে বান্দাকে জোর করা নয়। বান্দা নিজের ইচ্ছায় সম্পর্ক গড়ে, আর আল্লাহর হুকুমে মৃত্যু এসে তা ছিন্ন করে। এতে আল্লাহর কোনো ভুল হয়নি; বরং এটি দুনিয়ার পরীক্ষা।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে, কারণ সে জানে না তার ভবিষ্যৎ কী।"
(সহীহ বুখারী: ৫৬৭১)
২। ছেলেটি মারা যাওয়ার পর মেয়েটি দুনিয়ায় কী অবস্থায় আছে, তা ছেলেটি জানতে পারবে?
মৃত ব্যক্তিরা দুনিয়ার খবর সাধারণভাবে জানতে পারে না।
তবে কিছু হাদীসে এসেছে যে, কবরবাসীর কাছে তাদের আত্মীয়দের আমল পেশ করা হয় এবং কিছু বিশেষ অবস্থায় তারা জানতে পারে।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের আমলগুলো তোমাদের মৃতদের কাছে পেশ করা হয়। যদি ভালো হয়, তারা খুশি হয়; আর যদি খারাপ হয়, তারা দুঃখিত হয়।"
(মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৮৫৩৪; ইবনে আবি শাইবা)
তবে নির্দিষ্টভাবে মেয়েটির ব্যক্তিগত অবস্থা ছেলেটি জানবে কি না—এ বিষয়ে কুরআন-হাদীসে স্পষ্ট কিছু নেই। আমরা বলব: আল্লাহই সর্বজ্ঞ। মৃত ব্যক্তির রুহ দুনিয়ার বিস্তারিত খবর রাখে না; বরং তারা বারযাখ নামক জগতে থাকে।
আল্লাহ বলেন:
"তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা) থাকবে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত।"
(সূরা আল-মুমিনুন: ১০০)
৩। মেয়েটি ছেলেটির জন্য দুআ করতে চাইলে কী দুআ করবে?
মৃত মুসলিমের জন্য দুআ করা জায়েয ও সওয়াবের কাজ। মেয়েটি নিম্নোক্ত দুআগুলো করতে পারে:
দুআ ১:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ
(আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়া'ফু আনহু)
অর্থ: "হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন এবং তাকে মাফ করুন।"
(সহীহ মুসলিম: ৯৬৩)
দুআ ২:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ قَبْرَهُ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ
অর্থ: "হে আল্লাহ! তার কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান বানিয়ে দিন।"
দুআ ৩:
اللَّهُمَّ ثَبِّتْهُ عِنْدَ السُّؤَالِ
অর্থ: "হে আল্লাহ! প্রশ্নের সময় তাকে দৃঢ় রাখুন।"
মনে রাখতে হবে: মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ, ইস্তিগফার, সদকা—সবই পৌঁছায়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
"যখন মানুষ মারা যায়, তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।"
(সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)
৪। মেয়েটি কি ছেলেটির বড় ভাইকে বিয়ে করতে পারবে? ছেলেটির রুহ কি এই বিষয়ে জানবে?
ফিকহী বিধান:
হ্যাঁ, মেয়েটি ছেলেটির বড় ভাইকে বিয়ে করতে পারবে। কারণ ছেলেটির সাথে মেয়েটির বিবাহ সম্পন্ন হয়নি; শুধু সম্পর্ক ছিল ও বিয়ের কথা হয়েছিল। যেহেতু বিবাহ হয়নি, সেহেতু কোনো শরীয়তগত আত্মীয়তা (মুসাহারাত) সৃষ্টি হয়নি। তাই ছেলেটির ভাই মেয়েটির জন্য নন-মাহরাম এবং বিবাহ বৈধ।
দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে—তোমাদের মা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, দুধমা, দুধবোন, স্ত্রীর মা, তোমাদের পালিত কন্যা যারা তোমাদের স্ত্রীদের গর্ভে জন্মেছে... এবং দুই বোনকে একত্রে বিয়ে করা।"
(সূরা আন-নিসা: ২৩)
এ আয়াতে ভাইয়ের প্রাক্তন প্রেমিকা বা বাগদত্তা হারাম হওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। সুতরাং তা হালাল।
তবে:
- যদি ছেলেটির সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে থাকত (যেমন: আকদ হয়ে গেছে), তাহলে ছেলেটির ভাই মেয়েটির জন্য চিরস্থায়ী হারাম হয়ে যেত।
- যেহেতু বিবাহ হয়নি, তাই কোনো বাধা নেই।
রুহ কি জানবে?
মৃত ব্যক্তির রুহ দুনিয়ার এ ধরনের ব্যক্তিগত বিষয় জানবে না।
৫। ছেলে-মেয়ে দুজনই যদি জান্নাতি হয়, জান্নাতে কি তাদের দেখা হবে?
হ্যাঁ, জান্নাতে তারা চাইলে দেখা হতে পারে। জান্নাত হলো চিরস্থায়ী সুখের স্থান।
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"তারা সেখানে যা চাইবে, তা-ই পাবে; আর আমার কাছে আরও বেশি আছে।"
(সূরা কাফ: ৩৫)
৬। মেয়েটি এরকম প্রশ্ন করাতে কি তার গুনাহ হবে? ধৈর্য ধারণ করতে তার কী করা উচিত?
গুনাহ হবে কি?
না, গুনাহ হবে না। ইসলামে জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশ্ন করা প্রশংসনীয়। তবে শর্ত হলো:
- প্রশ্নটি শরীয়তসম্মত হতে হবে।
- আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকতে হবে।
- ধৈর্য ও সন্তুষ্টির সাথে প্রশ্ন করা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।"
(সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
হাদীস:
রাসূল ﷺ বলেছেন:
"ধৈর্য হলো ঈমানের অর্ধেক।"
(সহীহ মুসলিম: ২২৩)
ধৈর্য ধারণ করতে করণীয়:
১. আল্লাহর উপর ভরসা রাখা — তিনি যা করেন, সবই কল্যাণের জন্য। ২. নিয়মিত দুআ করা — বিশেষ করে সালাতুল হাজাত ও ইস্তিগফার। ৩. কুরআন তিলাওয়াত করা — বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন, সূরা আর-রাহমান, সূরা আল-মুলক। ৪. মৃতের জন্য সদকা করা — এতে তার রুহ শান্তি পায়। ৫. নিজের সময়কে কাজে লাগানো — পড়াশোনা, ইবাদত, পরিবারের সেবা। ৬. অতিরিক্ত চিন্তা এড়িয়ে চলা — কারণ এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। ৭. বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া — প্রয়োজনে। ৮. বিবাহের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া — যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং শরীয়তসম্মত হয়।
সতর্কতা:
- মৃত ব্যক্তির সাথে অতিরিক্ত সম্পর্ক জারি রাখা বা তার জন্য শোককে দীর্ঘায়িত করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- ছবি, ভিডিও বা স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করে শোক করা ঠিক নয়।
- আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ হারাম।
والله أعلم بالصواب