ফিতনার যুগে নারীর পর্দা ও শিক্ষা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6928
Questioner: Khadiza Nnn
Question Asked: 15 Oct 2026, 10:56 AM
Reviewed & Published: 15 Oct 2026, 03:32 PM
Views: 6
Tokens: 5,970
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি পছন্দ করি না যে নারীরা বাজারে যাক, কারণ সেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকে। একইভাবে, আমি চাই না আমার বোন এমন কোনো স্কুলে পড়াশোনা করুক, যেখানে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। বাংলাদেশের প্রায় সব স্কুলেই ছেলে-মেয়েদের একসঙ্গে পড়াশোনা করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই এই ফিতনার যুগে আমার বোনের পর্দা ও ইসলামী মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সে বাজারে যাবে না এবং বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করবে। একজন ভাই হিসেবে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমি নিজেই বাজার থেকে এনে দেব। তবে তার পড়াশোনা বন্ধ হবে না, কারণ শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই, সে ঘরে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাক এবং যথাসম্ভব ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলুক।

Answer

ফিতনার যুগে নারীর পর্দা ও শিক্ষা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী ভাই তার বোনকে বাজার থেকে বিরত রাখতে এবং ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়াশোনা হয় এমন স্কুলে না পাঠিয়ে ঘরে থেকে পড়াশোনা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানতে চান—এই সিদ্ধান্ত ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য।


ভূমিকা: ফিতনার যুগে সতর্কতা অবলম্বন করা শরীয়তের নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ»

"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।"

— সহীহ বুখারী: ৫০৯৬, সহীহ মুসলিম: ২৭৪০

আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ، فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ»

"দুনিয়া থেকে সাবধান হও এবং নারীদের ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা বনী ইসরাইলের প্রথম ফিতনা ছিল নারীদের কারণে।"

— সহীহ মুসলিম: ২৭৪২

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

"ফিতনার সময়ে নারীরা যখন বাইরে বের হয়, তখন তা ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তাদের জন্য ঘরে থাকাই নিরাপদ।"

— মাজমূউল ফাতাওয়া: ১৫/২৯৭


প্রথম বিষয়: নারীর বাজারে যাওয়া প্রসঙ্গে

মূলনীতি

ইসলামে নারীর জন্য বাইরে বের হওয়ার মূল অনুমতি রয়েছে শর্তসাপেক্ষে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ

"তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্বকালীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রকাশ করো না।"

— সূরা আল-আহযাব: ৩৩

তবে প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«قَدْ أَذِنَ اللَّهُ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ»

"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।"

— সহীহ বুখারী: ৫২৩৭

শাইখ ইবনু উসাইমীনের ফাতওয়া

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

"নারীর জন্য বাজারে যাওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো—সে পূর্ণ পর্দা সহকারে যাবে, কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করবে না, এবং প্রয়োজন ছাড়া সেখানে অবস্থান করবে না। যদি বাজারে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে না যাওয়াই উত্তম।"

— মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ইবন উসাইমীন: ১২/৩৪৫

সিদ্ধান্ত

আপনার সিদ্ধান্ত—বোনকে বাজার থেকে বিরত রাখা এবং আপনি নিজে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দেওয়া—ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম ও প্রশংসনীয়। এটি সতর্কতা (ইহতিয়াত) ও ফিতনা এড়ানোর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষত যখন বাজারে অবাধ মেলামেশার পরিবেশ থাকে, তখন এটি আরও বেশি যুক্তিযুক্ত।


দ্বিতীয় বিষয়: ছেলে-মেয়ের একসাথে পড়াশোনা (মিক্সড এডুকেশন)

ইসলামী বিধান

ইসলামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (খালওয়া ও ইখতিলাত) হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ

"তোমরা যখন তাদের কাছে কিছু চাও, পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটাই তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।"

— সূরা আল-আহযাব: ৫৩

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ»

"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, তবে তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।"

— জামে' তিরমিযী: ২১৬৫, সহীহ

শাইখ ইবনু বাযের ফাতওয়া

শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

"ছেলে-মেয়ের একসাথে পড়াশোনা করা—বিশেষত বালেগ হওয়ার পর—অবৈধ। কারণ এটি ফিতনার দিকে নিয়ে যায়। মুসলিম অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের জন্য আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা করা।"

— মাজমূউ ফাতাওয়া ইবন বায: ২১/২৯৮

শাইখ আল-ফাওযানের ফাতওয়া

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন:

"মিক্সড এডুকেশন ইসলামে নিষিদ্ধ। এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণ। মুসলিমদের উচিত সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়া এবং ফিতনা থেকে রক্ষা করা।"

— আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান

সিদ্ধান্ত

আপনার সিদ্ধান্ত—বোনকে মিক্সড স্কুলে না পাঠিয়ে ঘরে থেকে পড়াশোনা করানো—ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক ও প্রশংসনীয়। এটি ফিতনা থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


তৃতীয় বিষয়: ঘরে থেকে পড়াশোনা করা

ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব

ইসলামে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»

"জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।"

— সুনানে ইবনু মাজাহ: ২২৪, সহীহ

তবে শিক্ষার মাধ্যম ও পরিবেশ ইসলামী বিধিবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।

ঘরে থেকে পড়াশোনার বৈধতা

শাইখ ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন:

"যদি মিক্সড শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে ঘরে থেকে পড়াশোনা করা জায়েয। বরং এটি উত্তম। নারীর জন্য ঘরই তার সর্বোত্তম শিক্ষাক্ষেত্র।"

— ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব

সিদ্ধান্ত

আপনার সিদ্ধান্ত—বোনকে ঘরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেওয়া—ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক। তবে লক্ষ রাখতে হবে:

  1. গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা — অনলাইন কোর্স, ইসলামী শিক্ষা, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শেখার ব্যবস্থা করা।
  2. ইসলামী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া — কুরআন, হাদীস, ফিকহ শেখা।
  3. সামাজিক ও মানসিক সুস্থতা — ঘরে থাকলেও যেন একাকীত্ব না হয়, পরিবারের সাথে সময় কাটানো।
  4. বৈধ সীমার মধ্যে বাইরে যাওয়ার অনুমতি — যেমন: মাহরামের সাথে আত্মীয়দের দেখতে যাওয়া, ডাক্তারের কাছে যাওয়া ইত্যাদি।

চতুর্থ বিষয়: ভাই হিসেবে আপনার দায়িত্ব

ইসলামে ভাইয়ের দায়িত্ব

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।"

— সূরা আত-তাহরীম: ৬

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»

"তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।"

— সহীহ বুখারী: ৭১৩৮

আপনার করণীয়

  1. বোনের পর্দা নিশ্চিত করা — তাকে পূর্ণ পর্দার গুরুত্ব বোঝানো।
  2. প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দেওয়া — এটি আপনার দায়িত্ব ও সদকা।
  3. শিক্ষার ব্যবস্থা করা — অনলাইন কোর্স, ইসলামী বই, শিক্ষকের ব্যবস্থা।
  4. সহানুভূতি ও ভালোবাসা — কঠোরতা নয়, বরং হিকমতের সাথে।
  5. নিজেও ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলা — কারণ আপনি তার জন্য আদর্শ।

উপসংহার

আপনার সিদ্ধান্ত ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক ও প্রশংসনীয়। ফিতনার যুগে নারীর পর্দা ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখবেন:

  • শিক্ষা বন্ধ করা যাবে না — ঘরে থেকে হলেও শিক্ষা চালিয়ে যেতে হবে।
  • হিকমত ও নম্রতা — কঠোরতার পরিবর্তে ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে।
  • ইসলামী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব — দুনিয়াবি শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষা।
  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল — আপনার এই প্রচেষ্টা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হোক।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং নারীর পর্দা ও ইজ্জত রক্ষার তাওফিক দিন। আমীন।


রেফারেন্স

  1. সহীহ বুখারী
  2. সহীহ মুসলিম
  3. সুনানে ইবনু মাজাহ
  4. জামে' তিরমিযী
  5. মাজমূউল ফাতাওয়া — ইবনু তাইমিয়্যাহ
  6. মাজমূউ ফাতাওয়া ইবন বায
  7. মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ইবন উসাইমীন
  8. আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.