ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত পিতার নামাজের হুকুম কি?

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 6926
Questioner: Bin Ali
Question Asked: 15 Oct 2026, 10:42 AM
Reviewed & Published: 15 Oct 2026, 03:27 PM
Views: 13
Tokens: 6,066
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আব্বু ডিমেনশিয়ার পেশেন্ট। আগের কোনো কিছুই মনে নাই। কাউকেই চিনে না। এমনকি আমাদের ভাইবোনদের কেও চিনে না , নিজের বাসাও চিনতে পারে না। কখন কত রাকাত নামাজ পড়তে হবে , কেরাত আস্তে নাকি জোরে পড়তে হবে কিছুই বুঝেনা।এখন কথা বলাও ভুলে গেছে। বর্তমানে দুই একটা কথা ছাড়া কোনো কথা বলতে পারে না। রোজার সময় রোজা রাখছে যে এইটাই ভুলে যায়।
এখন আমার আব্বুর জন্য জাকাত,নামাজ,রোজা এর হুকুম কি?

Answer

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত পিতার নামাজ, রোজা ও যাকাতের হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারীর পিতা ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) রোগে আক্রান্ত। তিনি অতীতের কোনো কিছুই মনে করতে পারেন না, কাউকে চিনতে পারেন না, নিজের বাসাও চিনতে পারেন না। নামাজের রাকাত সংখ্যা, কেরাত আস্তে-জোরে পড়া ইত্যাদি কিছুই বুঝেন না। এমনকি রোজা রাখছেন কি না তাও ভুলে যান। এই অবস্থায় তার জন্য নামাজ, রোজা ও যাকাতের হুকুম কী?


ভূমিকা: ডিমেনশিয়া ও শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামী ফিকহে মানসিক সুস্থতা (আকল) হলো ইবাদতের জন্য আহলিয়াত বা যোগ্যতার মূল শর্ত। ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা দু'প্রকার হতে পারে:

১. সম্পূর্ণ আকলহীন (মাজনুন/মা'তুহ): যিনি কোনো কিছুই বুঝতে পারেন না, নিজের নাম-পরিচয়ও জানেন না, কোনো বিষয়ে সচেতন নন — তিনি "মা'তুহ" বা "মাজনুন" এর হুকুমে পড়বেন।

২. আংশিক আকলহীন: যিনি কিছু বিষয় বুঝতে পারেন, কিছু মনে রাখতে পারেন — তিনি আংশিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত।

আপনার পিতার বর্ণনা অনুযায়ী তিনি প্রায় সম্পূর্ণ আকলহীন অবস্থায় আছেন — কাউকে চেনেন না, নিজের বাসা চেনেন না, নামাজ-রোজার হিসাব বুঝেন না। সুতরাং তার ক্ষেত্রে "মা'তুহ" (আকলহীন ব্যক্তি) এর হুকুম প্রযোজ্য হবে।


নামাজের হুকুম

প্রশ্নের বিবরন মতে ৫ ওয়াক্তের বেশি সেন্স না থাকায় এক্ষেত্রে তার উপর নামাজ আবশ্যক নয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَبْلُغَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ

"তিন ব্যক্তির উপর থেকে কলম (দায়িত্ব) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, শিশু যতক্ষণ না বালেগ হয়, এবং পাগল ব্যক্তি যতক্ষণ না আকল ফিরে পায়।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৯৯, সুনানে তিরমিজি: ১৪২৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪১)

আল-হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে:

"وَلَا تَجِبُ الصَّلَاةُ عَلَى الْمَجْنُونِ وَالصَّبِيِّ"

"পাগল ও শিশুর উপর নামাজ ওয়াজিব নয়।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত)

রোজার হুকুম

প্রশ্নের বিবরণ মতে তিনি যেহেতু রোযা রাখতে পারছেননা,তাই তার অনাদায়ী রোযা গুলির ফিদইয়াহ আপনারা আদায় করে দিবেন।

যাকাতের হুকুম

তিনি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হলে তার সম্পদ হতে আপনারা হিসাব করে প্রতি বছর যাকাত আদায় করবেন।

ফাতাওয়া আলমগিরি তে আছে:

"الْمَجْنُونُ لَا تَجِبُ عَلَيْهِ الزَّكَاةُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ، وَقَالَا تَجِبُ فِي مَالِهِ"

"ইমাম আবু হানিফার মতে পাগলের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন, তার সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হবে।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৮)

রাদ্দুল মুহতার এ ইবনে আবিদীন বলেন:

"الْمَجْنُونُ لَا تَجِبُ عَلَيْهِ الزَّكَاةُ بِالْإِجْمَاعِ فِي قَوْلِ أَبِي حَنِيفَةَ"

"ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী পাগলের উপর যাকাত ওয়াজিব নয় — এ বিষয়ে ইজমা আছে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৯)

দুআ ও সদকা

আপনার পিতার জন্য আপনি দুআ করতে পারেন, সদকা করতে পারেন। এটি তার জন্য উপকারী হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ

"মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।" — (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)

সেবা-শুশ্রূষা

আপনার পিতার সেবা-শুশ্রূষা করা আপনার উপর কর্তব্য। এটি ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

"তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

চিকিৎসা

ডিমেনশিয়া একটি রোগ। এর চিকিৎসা করানো শরীয়তসম্মত। আধুনিক চিকিৎসা ও ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


আপনার পিতার এই অবস্থা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। ধৈর্য ধারণ করুন, তার সেবা করুন, তার জন্য দুআ করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

"ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)

আল্লাহ তা'আলা আপনার পিতাকে শিফা দান করুন এবং আপনাদেরকে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.