সহশিক্ষা সহ বিবিধ প্রশ্ন।

Family Life · Hanafi

Question No: 6922
Questioner: Shifa Rahman
Question Asked: 15 Oct 2026, 09:08 AM
Reviewed & Published: 15 Oct 2026, 03:14 PM
Views: 5
Tokens: 7,194
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। সহশিক্ষা নিয়ে জনাতে চাচ্ছি।বাড়ি থেকে মানে আমার অভিভাবক বাবা -মামুনি সহ সবাই প্রায় চায় আমি মাস্টার্স করি।কিন্তু আমি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অনার্স শেষ করে বাসায় এসে আর মাসটার্স করবো না বলি।খুব জেদ ধরে বসি করবোই না।এতো দিন বিয়ের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু হচ্ছে না।এখন এসে আমার মায়ের মায়াকে এভাবে দেখে ভেঙে পড়েছে কষ্ট পাচ্ছে।বাড়িতে জব করবো না মাস্টার্স করবো না জন্য তারা আমাকে নিয়ে চিন্তায় এইদিকে বিয়েও হচ্ছে না।এখন আমার কি করনিয়? আমিতো গুনাহ মুক্ত থাকার জন্য সহশিক্ষা বাদ দিছি।তাদেরকে বিষয়টা ভালো ভাবে জানাইছি।এখন আমি কি মাস্টার্স করবো?


আমার মা বাবা ভাই বোন সবারই প্রায় সিহরের প্রব্লেম। আমি বাড়িতে থাকলে তাদের জন্য গোপনে রুকিয়া চালু রাখি।শয়তান কি আমাক তাড়াচ্ছে। শরিয়া কি বলে আমি কি করবো?

Answer

সহশিক্ষা, মাস্টার্স ও পারিবারিক চাপ: শরীয়তের দৃষ্টিতে সমাধান

উত্তর (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি মূলত তিনটি দিক নিয়ে গঠিত: ১. সহশিক্ষা (co-education) বর্জন করে মাস্টার্স না করার সিদ্ধান্ত কি সঠিক? ২. পরিবারের চাপ ও বিয়ের সমস্যার প্রেক্ষিতে করণীয় কী? ৩. সিহর ও রুকইয়ার বিষয়টি এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা।

প্রতিটি বিষয়ে শরীয়তের দিকনির্দেশনা নিচে পেশ করা হলো।


১. সহশিক্ষা (Co-education) সম্পর্কে ইসলামের বিধান

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا

"মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে..." (সূরা আন-নূর: ৩১)

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

"ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)

হাদীসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ

"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬, সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)

الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ

"দুই চোখও ব্যভিচার করে, আর তার ব্যভিচার হলো (হারাম) দৃষ্টি।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৫২)

হানাফী ফিকহের সিদ্ধান্ত

সহশিক্ষা (Co-education) মূলত দু'প্রকার:

(ক) পূর্ণ পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে: যদি শ্রেণিকক্ষে নারী-পুরুষের মাঝে পূর্ণ পর্দা থাকে, অবাধ মেলামেশা না থাকে, দৃষ্টি সংযত থাকে — তবে কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে (যেমন: ডাক্তারি পড়া, যেখানে মহিলা ডাক্তারের প্রয়োজন) এর অনুমতি আছে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

وَلَا بَأْسَ بِتَعَلُّمِ الْمَرْأَةِ الْعِلْمَ إِذَا كَانَ بِسَتْرٍ وَعَفَافٍ

"মহিলার জন্য ইলম শিক্ষা করা দোষণীয় নয়, যখন তা পর্দা ও সতীত্বের সাথে হয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৮)

(খ) অবাধ মেলামেশা ও বেপর্দা পরিবেশ: এটি নাজায়েজ ও হারাম। কারণ এতে ফিতনার দরজা খোলা থাকে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসূল হলো সদ্দে যারীআহ (ফিতনার পথ বন্ধ করা)।

ফতোয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"বর্তমান যুগে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে পরিবেশ বিরাজমান, তা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ। যেখানে ছেলে-মেয়েরা অবাধে মেলামেশা করে, সেখানে পড়াশোনা করা জায়েজ নয় — যদি না পূর্ণ পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষিত হয়।" (ফতোয়া উসমানী: ৩/৪৫০-৪৫৫)

আপনার সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন

আপনি গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সহশিক্ষা বর্জন করেছেন — এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় ও সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে মনে রাখবেন:

  • সহশিক্ষা বর্জন মানে শিক্ষা বর্জন নয়। ইসলাম শিক্ষা অর্জনকে উৎসাহিত করে।
  • আপনি যদি পূর্ণ পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে মাস্টার্স করতে পারেন (যেমন: অনলাইন, শুধু ছেলেদের ক্লাস, বা পর্দার ব্যবস্থা আছে এমন প্রতিষ্ঠান), তবে তা করতে পারেন।
  • যদি প্রতিষ্ঠানে অবাধ মেলামেশা ও বেপর্দা পরিবেশ থাকে, তবে সে প্রতিষ্ঠানে না পড়াই শরীয়তসম্মত।

২. পরিবারের চাপ ও বিয়ের সমস্যা

পিতামাতার আনুগত্য

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

"তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ

"প্রভুর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে, আর প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।" (সুনানে তিরমিজি: ১৮৯৯)

কিন্তু: পিতামাতার আনুগত্য শরীয়তের সীমার ভেতরে। যদি তারা হারাম কাজের আদেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ

"সৃষ্টির আনুগত্য নেই স্রষ্টার অবাধ্যতায়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪৪১)

বিয়ের বিষয়ে

বিয়ের জন্য চেষ্টা করা আপনার দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ

"তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দাও... তারা যদি অভাবী হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।" (সূরা আন-নূর: ৩২)

পরামর্শ:

  • বিয়ের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার বাড়িয়ে দিন। বিশেষ করে সূরা আল-ফুরকান: ৭৪ পড়ুন:

    رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

  • সালাতুল হাজত পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
  • পরিবারের সাথে শান্তভাবে ও সম্মানের সাথে কথা বলুন। তাদের বোঝান যে আপনি তাদের দুশ্চিন্তা বোঝেন, কিন্তু শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করা আপনার জন্য সম্ভব নয়।
  • মধ্যপন্থী সমাধান: যদি সম্ভব হয়, এমন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হোন যেখানে পর্দা ও শরীয়তের পরিবেশ আছে (যেমন: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা ক্যাম্পাস, অনলাইন ডিগ্রি, বা মহিলাদের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান)।

৩. সিহর ও রুকইয়ার বিষয়

সিহর সম্পর্কে

সিহর (জাদু) সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন:

وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ

"তারা (হারুত-মারুত) কাউকে শিক্ষা দিত না যতক্ষণ না বলত: আমরা পরীক্ষা, তুমি কুফরি করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১০২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ... الشِّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ

"সাতটি ধ্বংসকারী কাজ থেকে বেঁচে থাকো... আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং সিহর করা।" (সহীহ বুখারী: ২৭৬৬)

রুকইয়া সম্পর্কে

রুকইয়া শরইয়াহ (কুরআন ও মাসনূন দোয়া দ্বারা চিকিৎসা) জায়েজ ও সুন্নত। আয়েশা (রা.) বলেন:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَرْقِي وَيَقُولُ: اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي

"রাসূলুল্লাহ ﷺ রুকইয়া করতেন এবং বলতেন: হে মানুষের প্রভু! কষ্ট দূর করো, আরোগ্য দাও, তুমিই আরোগ্যদাতা।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৫০)

শর্ত: রুকইয়া হতে হবে — ১. কুরআন, সুন্নাহ ও আরবি ভাষায়, ২. অর্থ স্পষ্ট ও শিরকমুক্ত, ৩. বিশ্বাস রাখা যে আরোগ্য আল্লাহর হাতেই।

আপনার করণীয়

  • গোপনে রুকইয়া চালু রাখা: আপনি পরিবারের জন্য গোপনে রুকইয়া করছেন — এটি জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। তবে মনে রাখবেন, রুকইয়ার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, শুধু আয়াত পড়া নয়।

  • সিহরের চিকিৎসা: যদি সত্যিই সিহর হয়ে থাকে, তবে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত নিয়মিত পড়ুন এবং পরিবারকে পড়তে বলুন।

  • শয়তানের ওয়াসওয়াসা: শয়তান আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আল্লাহ বলেন:

    إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا "নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।" (সূরা ফাতির: ৬)

    শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস সকাল-সন্ধ্যা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।


৪. চূড়ান্ত পরামর্শ ও করণীয়

মাস্টার্স করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত

| অবস্থা | বিধান | |--------|-------| | পূর্ণ পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে মাস্টার্স | জায়েজ ও উত্তম | | অবাধ মেলামেশা ও বেপর্দা পরিবেশে মাস্টার্স | নাজায়েজ | | অনলাইন/আলাদা ক্যাম্পাস/পর্দার ব্যবস্থা থাকলে | জায়েজ |

সিদ্ধান্ত: যদি আপনি এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পান যেখানে পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষিত, তবে মাস্টার্স করুন — এতে পরিবারের দুশ্চিন্তা কমবে এবং আপনি দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই হাসিল করতে পারবেন। যদি না পান, তবে সহশিক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্তই সঠিক।

ব্যবহারিক পদক্ষেপ

১. পরিবারের সাথে শান্তভাবে বসুন: তাদের বোঝান যে আপনি তাদের ভালো চান, কিন্তু শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করতে পারবেন না। ২. বিকল্প খুঁজুন: অনলাইন মাস্টার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ, বা পর্দার ব্যবস্থা আছে এমন প্রতিষ্ঠান। ৩. বিয়ের জন্য দোয়া বাড়ান: বিশেষ করে সূরা আল-ফুরকান: ৭৪ ও সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯ পড়ুন। ৪. রুকইয়া চালু রাখুন: পরিবারের জন্য গোপনে রুকইয়া করুন, তবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ৫. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচুন: নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ুন। ৬. ইস্তিগফার বাড়ান: আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)


সারসংক্ষেপ

  • সহশিক্ষা বর্জন: শরীয়তসম্মত, যদি পরিবেশ হারাম হয়।
  • মাস্টার্স: পর্দা ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে করা জায়েজ; অন্যথায় নয়।
  • পরিবারের চাপ: সম্মানের সাথে বোঝান, তবে হারাম কাজে আনুগত্য নয়।
  • বিয়ে: দোয়া, ইস্তিগফার ও সালাতুল হাজত বাড়ান।
  • সিহর: হারাম, তবে রুকইয়া শরইয়াহ জায়েজ।
  • শয়তান: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে কুরআন ও দোয়া পড়ুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যা সহজ করে দিন, পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করুন এবং আপনাকে হালাল উপায়ে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.