স্বামীর মৃত্যুর পর স্বপ্নে ভাঙা রোজার ফিদিয়া দেওয়ার নির্দেশ পেলে করণীয় কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
গত ২১ রমযান আমার জাওজ বাইক এক্সিডেন্টে ইন্তেকাল করেছেন(আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন)।
কিছু দিন আগে আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার এক বোন আমাকে স্বপ্নে বলছে, তুমি তোমার জাওজের ভাঙা রোজার ফিদিয়া দাও। তো আমি তাকে বললাম উনার ভাঙা রোজা আর কয়টা হবে, ৮টা বা ১০ টা হবে হয়তো। পরে বললাম, আরে নাহ পুরুষ মানুষের আবার কিসের ভাঙা রোজা।মেয়েদের ভাঙা রোজা থাকে।
এর পরদিন আবার স্বপ্নে দেখলাম, আবার সেই বোন আমাকে বলছিলো, তুমি তোমার জাওজের ফাওন্ডেশনের আপ্যায়ন খাতে ৫৪০ টাকা দাও।এর কম দিবে না। (জাওজ আর উনার বন্ধুরা মিলে মানুষের সাহায্যের জন্য একটা ফাওন্ডেশন খোলে ছিলেন।বর্তমানে উনার বন্ধুরা এটা দেখাশোনা করেন।আপ্যায়ন খাতে এক বেলা বিনা মূল্যে দরিদ্রদের খাওয়ানো হয়)।
আমি পরদিনই ফাওন্ডেশনে টাকা দিয়েছি। আর শাশুড়ী আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি(জাওজ) কখনো কি রোজা ভেঙেছিলেন কি না? আম্মু বললেন কখনো না।বরং উনি(জাওজ) ফরজ রোজার পাশাপাশি প্রায়ই সাপ্তাহিক নফল রোজা, শাওয়াল মাসের নফল রোজাও রাখতেন।
তারপরও আমি স্বপ্নের ভাঙা রোজার বিষয় নিয়ে চিন্তিত। আমি উনার রোজা গুলার ফিদিয়া কিভাবে আদায় করবো?
Answer
উত্তর (ফতোয়া)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার স্বামী (মরহুম) যদি কখনো ফরজ রোজা ভেঙে থাকেন বা অসুস্থতার কারণে রাখতে না পারেন—এমন কোনো প্রমাণ না থাকে, বরং আপনার শাশুড়ি আম্মু সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি কখনো রোজা ভাঙেননি, বরং নফল রোজা বেশি রাখতেন—তাহলে তার ওপর কোনো ফিদিয়া বা কাফফারা ওয়াজিব নয়। সুতরাং স্বপ্নের ভিত্তিতে ফিদিয়া দেওয়া আবশ্যক নয়। তবে আপনি যদি এহতিয়াত (সতর্কতা) হিসেবে কিছু সদকা করতে চান, তাহলে তা নফল সদকা হিসেবে দেওয়া যাবে; কিন্তু তা ফিদিয়া হিসেবে ওয়াজিব নয়।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা
১. ফিদিয়ার হুকুম কখন ওয়াজিব হয়?
ফিদিয়া ওয়াজিব হয় কেবল তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি ফরজ রোজা রাখার শক্তি রাখা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলে এবং পরে কাজা আদায় করার সুযোগ না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে, অথবা বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে ফরজ রোজা রাখতে অক্ষম থাকে এবং কাজাও করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ
“আর যারা রোজা রাখতে সক্ষম নয়, তাদের জন্য ফিদিয়া হলো একজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
“ফিদিয়া ওয়াজিব হয় শুধু সেই ব্যক্তির জন্য যে রোজা রাখতে অক্ষম এবং কাজাও করতে পারে না।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪২৭)
২. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ফিদিয়া
যদি কোনো ব্যক্তি ফরজ রোজা ভেঙে ফেলে এবং পরে কাজা আদায় না করে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার ওয়ারিশদের জন্য ফিদিয়া দেওয়া মুস্তাহাব (কেউ কেউ বলেছেন ওয়াজিব)। কিন্তু যদি সে কখনো রোজা না ভেঙে থাকে, তাহলে ফিদিয়া ওয়াজিব নয়।
আল্লামা হাসকাফি (রহ.) বলেন:
“যদি মৃত ব্যক্তি রোজা ভেঙে থাকে এবং কাজা না করে মারা যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে ফিদিয়া দেওয়া উত্তম।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪২৮)
৩. স্বপ্নের ভিত্তিতে আমল
স্বপ্ন শরিয়তের দলিল নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ
“সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৮৪)
তবে স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো ফরজ বা ওয়াজিব আমল প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই শুধু স্বপ্ন দেখে ফিদিয়া দেওয়া আবশ্যক নয়। আপনি যদি সদকা করতে চান, তাহলে নফল সদকা হিসেবে করতে পারেন।
৪. আপনার করণীয়
১. ফিদিয়া ওয়াজিব নয়—কারণ আপনার স্বামী কখনো রোজা ভাঙেননি বলে শাশুড়ি আম্মু সাক্ষ্য দিয়েছেন।
২. আপনি যদি এহতিয়াত হিসেবে কিছু টাকা সদকা করতে চান, তাহলে তা নফল সদকা হিসেবে দিন।
৩. ফাউন্ডেশনে যে ৫৪০ টাকা দিয়েছেন, তা নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে—ইনশাআল্লাহ সওয়াব পাবেন।
৪. মৃত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা করুন।
৫. স্বপ্ন নিয়ে অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং ইস্তিখারা করুন।
৫. ফিদিয়ার পরিমাণ (প্রয়োজনে)
যদি কখনো ফিদিয়া ওয়াজিব হয়, তাহলে প্রতি রোজার ফিদিয়া হলো অর্ধ সা'(১.৬৫০কেজি) গম অথবা একজন মিসকিনকে দুবেলা পেট ভরে খাবার কিংবা তার মূল্য (বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১৫ টাকা প্রতি রোজা হিসেবে ধরা হয়)।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, ফিদিয়া হিসেবে অর্ধ সা' এর তুলনায় এক সা‘ (প্রায় ৩.৫ কেজি) গম বা তার মূল্য দেওয়া উত্তম।
(ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ২০৭)
উপসংহার:
আপনার স্বামীর ওপর ফিদিয়া ওয়াজিব নয়। স্বপ্নের ভিত্তিতে ফিদিয়া দেওয়া আবশ্যক নয়। আপনি চাইলে নফল সদকা হিসেবে দিতে পারেন। আল্লাহ আপনার স্বামীর কবরকে নূর দিয়ে ভরিয়ে দিন এবং আপনাকে সবর ও সান্ত্বনা দান করুন। আমিন।