১২/১৩ বছর বয়সে বান্ধবীর কাছ থেকে নেওয়া টাকা এখন মালিককে খুঁজে না পেলে করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার কাছে আমার এক বান্ধবি কিছু টাকা পাবেন আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখনের কথা।
এখন আমি কোন ভাবেই ঐ বান্ধুবিকে রিচ করতে পারছি না। এখন এই টাকা আমি কি করবো?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
জবাব,
১. মূল শরয়ী সিদ্ধান্ত:
১২/১৩ বছর বয়সে আপনার বান্ধবীর কাছে থাকা পাওনা টাকাটি আপনার জিম্মায় একটি বান্দার হক বা ঋণ (দাইন) হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।
উক্ত পাওনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আপনার করণীয় দুটি ধাপে বিভক্ত:
১. প্রথম ধাপ (সন্ধান করা): পাওনাদার বান্ধবী বা তার কোনো শরয়ী ওয়ারিশকে খুঁজে বের করার জন্য সাধ্যমতো সর্বাত্মক চেষ্টা করা আপনার ওপর অপরিহার্য।
২. দ্বিতীয় ধাপ (সদকা করা): অনুসন্ধান ও চেষ্টার পর যদি কোনোভাবেই তাকে বা তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হয় এবং সে ফিরে আসবে না বলে প্রবল ধারণা হয়, তবে উক্ত পাওনা টাকার সমপরিমাণ অর্থ ওই বান্ধবীর পক্ষ থেকে কোনো অভাবী, গরীব-মিসকীনকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া (কিংবা তার সওয়াবের নিয়তে) সদকা করে দিতে হবে।
২. ফিকহী প্রমান ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
-
ক) পাওনাদারকে খুঁজে বের করার বাধ্যবাধকতা:
ইসলামি শরীআতে অন্যের অধিকার বা পাওনা পরিশোধ করা ফরয। হযরত সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ নিয়েছে, তার দায়িত্ব হলো তা প্রকৃত মালিকের নিকট পৌঁছে দেওয়া।" [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৮৭; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২৪শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৩]। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে তাকে খোঁজার শেষ চেষ্টাটুকু করা আবশ্যক। -
খ) না পাওয়া গেলে সদকা করার শরয়ী মূলনীতি:
ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—যখন কোনো ব্যক্তির কাছে অন্যের পাওনা বা আমানতের টাকা থাকে এবং বহু অনুসন্ধানের পরও পাওনাদার বা তার ওয়ারিশদের কোনো হাদিস/সন্ধান পাওয়া না যায়, তখন সেই টাকা মূল মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দিয়ে দায়মুক্ত হতে হয়।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি এক ব্যক্তির কাছে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করার পর তাকে না পেয়ে উক্ত টাকা মালিকের পক্ষ থেকে গরীবদের মাঝে দান করে দিয়েছিলেন।
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেন:
«سَبِيلُ الْكَسْبِ الْخَبِيثِ وَالدُّيُونِ التَّصَدُّقُ إِذَا تَعَذَّرَ الرَّدُّ عَلَى صَاحِبِهِ»
"মালিককে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া অসম্ভব হয়ে গেলে, তা থেকে দায়মুক্ত হওয়ার শরয়ী উপায় হলো তা মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া।" [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৮৯; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৮]। -
গ) ভবিষ্যতে পাওনাদার ফিরে আসলে করণীয়:
টাকাটি সদকা করে দেওয়ার পর যদি ভবিষ্যতে কখনো ওই বান্ধবী বা তার কোনো উত্তরাধিকারী এসে আপনার কাছে নিজের পাওনা দাবি করে, তবে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হবে। সে যদি আপনার করা সদকাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায়, তবে আলহামদুলিল্লাহ, সদকার সওয়াব সে পাবে। আর সে যদি সদকা না মেনে নিজের টাকা সরাসরি ফেরত চায়, তবে আপনাকে তাকে সেই টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে পূর্বে আপনার করা সদকার সওয়াব আপনি নিজে পেয়ে যাবেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮৭, ১৮৯ & ২০৮–২০৯: (অধ্যায়: অমালিকানাধীন ও অন্যের অর্থ-সম্পদের বিধান — পাওনাদারকে না পাওয়া গেলে তার পক্ষ থেকে সদকা করা এবং রদ্দুল মুহতারের ইবারত)।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৮: (অধ্যায়: বাবুল লুকতাহ — পাওনাদারের পরিচিতি বা সন্ধান না থাকলে তার পরিমাণ টাকা খেয়ারাত/সদকা করে দেওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮২: (অধ্যায়: বাব ফিল ওদী'আহ — মালিক বা ওয়ারিশ না পাওয়া গেলে আমানত/পাওনা টাকা গরীবদের সদকা করার বিধান)।
৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:
- ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৪ & ৮৮: (অধ্যায়: কিতাবুল লুকতাহ — মালিক নিখোঁজ বা সন্ধানহীন হলে মালের মূল্য সদকা করে দেওয়ার ফিকহী মাসআলা)।
- ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৫: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত ও দেনা-পাওনা)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।