অজু ছাড়া মেসওয়াক করলে কুলি করতে হয় কি? এবং বিবিধ মাসাঈল সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. অজু করার সময় ব্যতীত যেকোনো সময় মেসওয়াক করলে কুলি করতে হবে না? মক্কার কয়েকটা ভিডিওতে দেখলাম নামাজের আগে পকেট থেকে মেসওয়াক বের করে মেসওয়াক করে আবার নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেন... আমার প্রশ্ন হচ্ছে ওনারা কুলি করেন না?
২. আমার স্বামীর ইনকাম খুবই কম... আলাদা করে ঘর করার জায়গা কিনে সামর্থ নেই। এই অবস্থায় থেকেও আমার স্বামী যদি পরিবারের জন্য খরচ করেন ভাই বোন অথবা মা বাবা অথবা আত্মীয়-স্বজন তাহলে কী ভবিষ্যতের ভয়ে মন খারাপ হলে গুনাহ হবে? অর্থাৎ মনে হয় যে ওদেরকে এত কেন দেয়। বা বিভিন্ন কলা কৌশলে স্বামীকে সংসারের জন্য খরচ করাতে না দেওয়া।
এগুলা করলে কি গুনাহ হবে?
৩. ছোট মিনি কুরআন গুলো ব্যাগে করে যে কোন জায়গায় নিয়ে যাই। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে অজু ছাড়া ধরলে কি গুনাহ হবে?
৪. আমি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিলাম দুই বছর যাবত যে ঠিক মত সবকিছু করব আলহামদুলিল্লাহ চেষ্টা করেছি সকল পাপ কাজ থেকে দূরে সরে আসতে কিন্তু ইদানিং পাঁচ মাস হয়েছে আমার বিয়ে হয়েছে বিয়ের পরে আমি অনেক ভুনা করে ফেলছি যেমন এই দুই বছরের হাতেগোনা কয়েকবার নামাজ কাজা হয়েছিল কিন্তু স্বামীর বাড়িতে গিয়ে সপ্তাহে অর্ধেক সময়ই বেশিরভাগই ফজর মিস হয়ে যায়। অনেক পেরেশানিতে আছি। যত চেষ্টা করি কয়েকদিন সবকিছু ঠিকমত হলে দুইদিন পর আবার আগের মত হয়ে যাই।
৪. অনলাইনে আমি অনেক কোর্সের মধ্যে ভর্তি হই কিন্তু কোন কোর্স আমি কমপ্লিট করি না এতে কি আমার গুনাহ হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।
১. অজু ছাড়া মেসওয়াক করলে কুলি করতে হবে কি?
উত্তর: না, অজু ছাড়া বা অজুর সময় ছাড়া সাধারণভাবে মেসওয়াক করলে কুলি করা আবশ্যক (ওয়াজিব) নয়। মেসওয়াক করা নিজেই একটি সুন্নত ও সওয়াবের কাজ।
তবে অজু করার সময় মেসওয়াক করা সুন্নত, এবং অজুর মধ্যে কুলি করা (মাযমাযমা) সুন্নত। মক্কার ভিডিওতে যারা নামাজের আগে মেসওয়াক করে রাখেন, তারা যদি অজু অবস্থায় থাকেন, তাহলে তাদের কুলি করা লাগবে না—এটি জায়েয ও সঠিক।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করার আদেশ দিতাম।" (সহিহ বুখারি: ৮৮৭, সহিহ মুসলিম: ২৫২)
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৪
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৮
- বাহিশতী জেওর, অজুর সুন্নত অধ্যায়
সারসংক্ষেপ: অজু ছাড়া মেসওয়াক করলে কুলি করা ওয়াজিব নয়। শুধু অজুর সময় কুলি করা সুন্নত।
২. স্বামী পরিবারের জন্য খরচ করলে মন খারাপ করা বা বাধা দেওয়া কি গুনাহ?
উত্তর: এ বিষয়টি দুটি দিক থেকে বিবেচনা করতে হবে:
(ক) স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:
ইসলামে স্বামীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ (নফাকা) প্রদান করা। এটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত।
কুরআন: "পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং নিজেদের সম্পদ থেকে খরচ করে।" (সূরা নিসা: ৩৪)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো... তাদের ভরণপোষণ ও পোশাকের দায়িত্ব তোমাদের উপর।" (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)
তবে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়দের জন্য খরচ করাও ইসলামে সওয়াবের কাজ, বিশেষত যদি তারা অভাবী হয়। কিন্তু স্ত্রী ও সন্তানের হক অগ্রাধিকার পাবে।
(খ) স্ত্রীর কর্তব্য:
স্ত্রীর জন্য স্বামীকে আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করা বা কৌশলে বাধা দেওয়া জায়েয নয়। এটি গুনাহের কাজ। তবে যদি স্বামী স্ত্রী ও সন্তানের নফাকা (ভরণপোষণ) প্রদানে ত্রুটি করে এবং অতিরিক্ত খরচ করে, তাহলে স্ত্রী নরমভাবে বুঝাতে পারে, কিন্তু রাগ, ঝগড়া বা সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়।
কুরআন: "তোমরা নারীদের সাথে সদাচরণ করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "সেই ব্যক্তি পাপী, যে তার ভরণপোষণে থাকা ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯২)
ফাতাওয়া:
- যদি স্বামী নফাকায় ত্রুটি না করে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়দের সাহায্য করে, তাহলে স্ত্রীর মন খারাপ করা বা বাধা দেওয়া গুনাহ।
- যদি স্বামী নফাকায় ত্রুটি করে এবং স্ত্রী-সন্তান কষ্ট পায়, তাহলে স্ত্রী নরমভাবে বুঝাতে পারে, কিন্তু কৌশল বা ষড়যন্ত্র করা জায়েয নয়।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭২-৫৭৫
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫
পরামর্শ: আপনার স্বামীকে ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে বুঝান। সরাসরি বাধা দেবেন না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ রিযিকের ব্যবস্থা করবেন।
৩. অজু ছাড়া মিনি কুরআন (ছোট কুরআন) ব্যাগে নিয়ে যাওয়া বা ধরা কি গুনাহ?
উত্তর: অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা নাজায়েয। তবে ব্যাগের ভেতরে থাকলে সরাসরি স্পর্শ না হলে সমস্যা নেই।
কুরআন: "নিশ্চয়ই এটি সম্মানিত কুরআন, যা সংরক্ষিত কিতাবে রয়েছে। পবিত্রগণ ছাড়া কেউ এটি স্পর্শ করবে না।" (সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "পবিত্র (অজু) ব্যক্তি ছাড়া কুরআন স্পর্শ করো না।" (সুনানে দারেমি: ২২৪৬, হাসান)
বিস্তারিত:
- ব্যাগের ভেতরে থাকলে: সরাসরি স্পর্শ না হলে জায়েয।
- হাতে ধরা বা খোলা অবস্থায় স্পর্শ: অজু ছাড়া নাজায়েয।
- তিলাওয়াত করা: অজু ছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। তবে মুখস্থ পড়া বা মনে মনে পড়া জায়েয।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৩
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫
সারসংক্ষেপ: ব্যাগে করে বহন করা জায়েয, কিন্তু অজু ছাড়া সরাসরি স্পর্শ করা বা খোলা কুরআন পড়া নাজায়েয।
৪. আল্লাহর সাথে ওয়াদা ভঙ্গ হওয়া, নামাজ কাজা হওয়া ও ফজর মিস হওয়া
উত্তর: প্রিয় বোন, আপনি চিন্তিত—এটি আপনার ঈমানের প্রমাণ। শয়তান আপনাকে হতাশ করতে চায়। আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।
কুরআন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর উত্তম ভুলকারী হলো সে, যে তাওবা করে।" (সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯)
(ক) আল্লাহর সাথে ওয়াদা:
আল্লাহর সাথে ওয়াদা করা আবশ্যক নয়, কিন্তু করলে তা পূরণ করা উচিত। ভঙ্গ হলে তাওবা করতে হবে এবং কাফফারা হিসেবে কিছু সদকা করা উত্তম। তবে এটি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
(খ) নামাজ কাজা:
নামাজ কাজা করা কবিরা গুনাহ। তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। কাজা নামাজ পড়ে নেওয়া ফরজ।
হাদিস: "যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে যায় বা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাফফারা হলো যখন স্মরণ হয় তখন পড়ে নেওয়া।" (সহিহ মুসলিম: ৬৮৪)
(গ) ফজর মিস হওয়া:
ফজর মিস হওয়ার কারণ হতে পারে:
- রাত জাগা — রাতে দেরি করে ঘুমানো।
- অ্যালার্ম না শোনা — অ্যালার্ম সেট করা।
- স্বামীর বাড়ির পরিবেশ — নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে।
সমাধান:
- রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমান।
- অ্যালার্ম সেট করুন (একাধিক)।
- ঘুমানোর আগে দুআ পড়ুন।
- স্বামীকে সহযোগিতা করতে বলুন।
- ফজরের জন্য নিয়ত দৃঢ় করুন।
দুআ: "আল্লাহুম্মা বারিক লি ফি নাওমি ওয়া ফি ইয়াকাযাতি" (হে আল্লাহ, আমার ঘুম ও জাগরণে বরকত দান করুন)।
(ঘ) হতাশ হবেন না:
শয়তান আপনাকে "তুমি পারবে না" বলে হতাশ করছে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
কুরআন: "আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফিরগণ ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।" (সূরা ইউসুফ: ৮৭)
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৪৫ (কাজা নামাজ)
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৯
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৪
পরামর্শ: প্রতিদিন তাওবার নামাজ পড়ুন, ইস্তিগফার বেশি করুন, এবং ফজরের জন্য বিশেষ দুআ করুন। আল্লাহ আপনার সহায় হবেন।
৫. অনলাইনে কোর্সে ভর্তি হয়ে কমপ্লিট না করা কি গুনাহ?
উত্তর: এটি নির্ভর করে কোর্সের শর্ত ও উদ্দেশ্যের উপর:
(ক) যদি কোর্সটি ফ্রি হয়:
কমপ্লিট না করলে সাধারণত গুনাহ নেই, তবে সময় ও শ্রমের অপচয় হয়। ইসলামে সময়ের অপচয় নিন্দনীয়।
হাদিস: "কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—কীভাবে তা ব্যয় করেছে।" (সুনানে তিরমিজি: ২৪১৭)
(খ) যদি কোর্সটি পেইড হয়:
টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে কমপ্লিট না করলে অর্থের অপচয় হয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ (ইসরাফ)। তবে এটি গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে যদি:
- টাকা হারাম হয় না,
- প্রতারণার উদ্দেশ্য না থাকে,
- শর্ত ভঙ্গ না হয়।
(খ) যদি কোর্সে শর্ত থাকে:
কিছু কোর্সে শর্ত থাকে যে কমপ্লিট করতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করা ওয়াদা ভঙ্গ হিসেবে গুনাহ হতে পারে।
সমাধান:
- ভর্তি হওয়ার আগে নিশ্চিত হোন যে আপনি কমপ্লিট করতে পারবেন।
- একসাথে অনেক কোর্সে ভর্তি হবেন না।
- একটি কোর্স শেষ করে আরেকটি শুরু করুন।
- যদি না পারেন, তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হোন।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৫৬ (ইসরাফ)
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৭৮
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. অজু ছাড়া মেসওয়াক | কুলি ওয়াজিব নয়, মেসওয়াক সুন্নত | | ২. স্বামীর আত্মীয়দের খরচে বাধা | নফাকা ঠিক থাকলে বাধা দেওয়া গুনাহ | | ৩. অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ | সরাসরি স্পর্শ নাজায়েয, ব্যাগে জায়েয | | ৪. ওয়াদা ভঙ্গ, নামাজ কাজা | তাওবা ও কাজা ফরজ, হতাশ হবেন না | | ৫. কোর্স কমপ্লিট না করা | ফ্রি হলে গুনাহ নেই, পেইড হলে সতর্কতা |
শেষ কথা: প্রিয় বোন, আপনি আল্লাহর প্রতি আন্তরিক। শয়তান আপনাকে হতাশ করছে। তাওবা করুন, ইস্তিগফার করুন, এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ আপনার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং আপনার সংসারে বরকত দান করবেন। আমিন।
দুআ: "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার।"
আল্লাহ তা'আলা ভালো জানেন।