কলম পড়ে গেলে নাকে ও কপালে ছোঁয়ানোর প্রথা কি ইসলামে বৈধ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
কলম পড়ে গেলে নাকে ও কপালে ছোঁয়ানোর প্রথা: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি প্রথা হলো—কলম হাত থেকে পড়ে গেলে সেটি তুলে নাকে এবং কপালে ছুঁয়ে নেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, এটির ইসলামে কোনো ভিত্তি আছে কি না, নাকি এটি কুসংস্কার?
উত্তরের মূল কথা
এ প্রথার ইসলামী শরীয়তে কোনো ভিত্তি নেই। এটি একটি কুসংস্কারমূলক ও অমূলক প্রথা, যা ধর্মের নামে বা "বরকতের" বিশ্বাসে করা হলে তা বিদআত ও কুসংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে যদি কেউ বিশ্বাস না রেখে নিছক অভ্যাসবশত করে, তবুও এটি পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ এটি অমুসলিম বা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির অনুকরণ।
দলিল ও বিশ্লেষণ
১. কুসংস্কারের সংজ্ঞা
কুসংস্কার (তাতায়্যুর/শুভ-অশুভ বিশ্বাস) হলো এমন বিশ্বাস বা কাজ, যার কোনো শরীয়তসম্মত ভিত্তি নেই, কিন্তু লোকেরা মনে করে এটি উপকার বা ক্ষতি করে, বা বরকত আনে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তাতায়্যুর (কুসংস্কার) শিরক।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৯১০; সুনানে তিরমিজি: ১৬১৪)
অন্য হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি কোনো বস্তুকে অশুভ লক্ষণ মনে করল, সে শিরক করল।" — (মুসনাদে আহমাদ)
২. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর বক্তব্য
রাদ্দুল মুহতার-এ ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন:
"যেসব কাজের কোনো শরীয়তসম্মত দলিল নেই এবং যেগুলোকে লোকেরা ধর্মীয় আমল বা বরকতের الوسيلة মনে করে, সেগুলো বিদআত। আর যেগুলোকে শুভ-অশুভের কারণ মনে করা হয়, সেগুলো কুসংস্কার।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬০-এর কাছাকাছি)
৩. ফাতাওয়া শামীতে স্পষ্ট বক্তব্য
ফাতাওয়া শামী ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে স্পষ্ট আছে—শরীয়তে অনুমোদিত নয় এমন কোনো কাজকে ধর্মীয় গুরুত্ব দেওয়া বা বরকতের বিশ্বাসে করা জায়েজ নয়।
৪. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"যেসব প্রথা সমাজে চলে আসছে কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলিল নেই, সেগুলোকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত, আর উপকার-ক্ষতির বিশ্বাস করা শিরক ও কুসংস্কার।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ২৪০-এর কাছাকাছি)
৫. হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.)-এর বক্তব্য
বেহেশতী জেওর-এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন:
"যে কাজের শরীয়তে দলিল নেই এবং যাকে লোকেরা ধর্মীয় আমল মনে করে, তা বিদআত। আর যাকে শুভ-অশুভের কারণ মনে করে, তা কুসংস্কার। উভয়ই পরিত্যাজ্য।"
কেন এটি কুসংস্কার?
১. শরীয়তে কোনো দলিল নেই — কুরআন, হাদিস, ইজমা বা কিয়াসে এর কোনো ভিত্তি নেই।
২. বরকতের বিশ্বাস — যদি মনে করা হয় এতে বরকত হবে বা অকল্যাণ দূর হবে, তবে এটি শিরক ও কুসংস্কারের অন্তর্ভুক্ত।
৩. অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণ — এ ধরনের প্রথা হিন্দুয়ানী বা অমুসলিম সংস্কৃতি থেকে আগত।
৪. নিছক অভ্যাস — যদি কেউ বিশ্বাস ছাড়া শুধু অভ্যাসবশত করে, তবুও এটি পরিত্যাগ করা উত্তম, কারণ এতে অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্য তৈরি হয়।
করণীয়
- এ প্রথা পরিত্যাগ করা।
- যদি কেউ অভ্যাসবশত করে ফেলে, তবে বিশ্বাস পরিশুদ্ধ রাখা—এতে কোনো উপকার বা ক্ষতি নেই।
- সমাজে এ ধরনের কুসংস্কার ছড়ানো থেকে বিরত থাকা।
- সন্তানদের এ ধরনের অমূলক প্রথা থেকে দূরে রাখা।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | কলম পড়ে গেলে নাকে-কপালে ছোঁয়ানো | শরীয়তে কোনো ভিত্তি নেই | | বরকতের বিশ্বাসে করা | কুসংস্কার ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত | | নিছক অভ্যাস হিসেবে করা | পরিত্যাগ করা উত্তম | | ধর্মীয় আমল মনে করা | বিদআত |
সিদ্ধান্ত: এটি একটি কুসংস্কারমূলক প্রথা, যা ইসলামে অনুমোদিত নয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং সমাজের অমূলক প্রথা পরিত্যাগ করা।