ছেলের ইনকাম মায়ের কাছে রাখা কি জরুরি? স্ত্রী-সন্তানের পিছনে খরচ করলে গুনাহ হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
এমতাবস্থায় কার কি হক, কার কোন সীমারেখা জানতে চাই।
Answer
পরিবারে হক ও সীমারেখা: স্বামী-স্ত্রী-পিতা-মাতার সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা
উত্তর (সংক্ষেপে):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়গুলো একাধিক দিক নিয়ে গঠিত। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতিটি দিকের বিধান নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ছেলের ইনকাম কি মায়ের কাছে রাখা জরুরি?
উত্তর: না, বাধ্যতামূলক নয়।
ইসলামী শরীয়তে সন্তানের উপার্জন পিতামাতার কাছে জমা রাখা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হলে তার উপার্জন তার নিজের মালিকানায় থাকে।
তবে পিতামাতার ভরণপোষণ (নাফাকা) সন্তানের উপর ওয়াজিব, যদি:
- পিতামাতা অভাবী হন,
- সন্তান সচ্ছল হয়,
- এবং পিতামাতার নিজের সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যায়।
দলিল:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا — "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ — "সন্তানের পিতার উপর তাদের (মা ও সন্তানের) খাদ্য ও পোশাকের দায়িত্ব ন্যায়সংগতভাবে বর্তায়।" (সূরা বাকারা: ২৩৩)
হানাফি ফিকহ:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
"সন্তানের সম্পদ পিতার সম্পদ নয়, আর পিতার সম্পদ সন্তানের সম্পদ নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭)
সুতরাং, ছেলের সমুদয় ইনকাম মায়ের কাছে রাখা ইসলামী দায়িত্ব নয় — এটি সামাজিক প্রথা বা পারিবারিক চাপ হতে পারে, কিন্তু শরীয়তের বিধান নয়।
২. স্ত্রী-সন্তানের পিছনে খরচ করলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: না, বরং এটাই ইসলামী দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ।
স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ স্বামীর উপর ফরজ। এতে খরচ করা গুনাহ নয়, বরং ইবাদত ও সদকা হিসেবে গণ্য।
হাদিস:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «دِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارٌ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارٌ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ — أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ» — "এক দীনার আল্লাহর পথে খরচ করলে, এক দীনার দাসমুক্তিতে, এক দীনার মিসকিনকে সদকা করলে, আর এক দীনার নিজের পরিবারের উপর খরচ করলে — এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সওয়াব সেই দীনারের, যা তুমি নিজের পরিবারের উপর খরচ করেছ।" (সহিহ মুসলিম: ৯৯৫)
হানাফি ফিকহ:
«ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে উল্লেখ আছে:
"স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব, যদি স্ত্রী স্বামীর ঘরে অবস্থান করে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৮)
সুতরাং, স্ত্রী-সন্তানের পিছনে খরচ করা গুনাহ নয়, বরং ফরজ দায়িত্ব পালন।
৩. প্রবাস থেকে আসলে সব টাকা-সামান মায়ের কাছে রাখা কি জরুরি?
উত্তর: না, শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরি নয়।
এটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়। তবে ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো:
- নিজের সম্পদ নিজের মালিকানায় থাকবে।
- স্ত্রীর হক আদায় করা ফরজ।
- পিতামাতার হক আদায় করা ফরজ (প্রয়োজন অনুযায়ী)।
যদি স্বামী সব সম্পদ মায়ের কাছে রেখে স্ত্রী-সন্তানকে বঞ্চিত করে, তাহলে এটি স্ত্রীর হক নষ্ট করা এবং ইসলামী দায়িত্বে অবহেলা।
হাদিস:
«كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ» — "মানুষের পাপের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে অবহেলা করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৯২)
৪. স্ত্রী যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে রাজি না হয়, তাহলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থানের হক রয়েছে।
ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর অন্যতম হক হলো স্বামীর সাথে স্বতন্ত্র বাসস্থান (বায়তুল খালওয়া), যেখানে সে স্বামীর সাথে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।
দলিল:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ — "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে ন্যায়সংগতভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
হানাফি ফিকহ:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরে স্বতন্ত্র কক্ষ থাকা তার হক, যেখানে শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কেউ তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭৫)
তবে:
- যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে রাজি হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই।
- যদি স্বামী তাকে জোরপূর্বক শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে বাধ্য করে এবং সেখানে তার প্রতি অন্যায় হয়, তাহলে স্বামী গুনাহগার হবে।
- স্ত্রী যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চায়, তাহলে তার জন্য আলাদা বাসস্থানের দাবি করা জায়েজ এবং এতে তার কোনো গুনাহ নেই।
৫. স্বামী প্রবাসে থেকে মা-বাবার খেদমত বউকে দিয়ে করানো কতটা যুক্তিসংগত?
উত্তর: শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি ন্যায়সংগত নয়, যদি তা স্ত্রীর সামর্থ্যের বাইরে হয় বা তার উপর জুলুম হয়।
- পিতামাতার খেদমত করা সন্তানের দায়িত্ব, পুত্রবধূর নয়।
- পুত্রবধূ স্বেচ্ছায় শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করলে সওয়াবের কাজ, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
- স্বামী যদি প্রবাসে থেকে স্ত্রীকে দিয়ে পিতামাতার সেবা করায় এবং স্ত্রী তা করতে না চায় বা কষ্ট পায়, তাহলে এটি স্ত্রীর উপর জুলুম।
হাদিস:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» — "ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
৬. পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ত্রীর কাছে না রেখে মায়ের কাছে রাখা কি ঠিক?
উত্তর: এটি শরীয়তের বিষয় নয়, বরং ব্যবহারিক ও পারিবারিক বিষয়। তবে স্ত্রীর প্রতি অবিশ্বাস ও তার হক নষ্ট করা হলে তা নাজায়েজ।
- স্ত্রীর হক হলো স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক।
- স্বামী যদি স্ত্রীকে সব বিষয়ে বাদ দিয়ে শুধু মায়ের উপর নির্ভর করে, তাহলে স্ত্রী অবহেলিত বোধ করে — এটি ইসলামী দাম্পত্যের মূলনীতির পরিপন্থী।
কুরআন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً — "তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রূম: ২১)
৭. মা-বাবার সাথে দীর্ঘসময় গল্প করে শুধু ঘুমের সময় স্ত্রীর কাছে আসা — এতে স্ত্রীর কষ্ট পাওয়া কি ঠিক?
উত্তর: স্ত্রীর কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক ও শরীয়তসম্মত।
- স্ত্রীর হক হলো স্বামীর সময়, মনোযোগ ও ভালোবাসা।
- যদি স্বামী সারাদিন মা-বাবার সাথে কাটিয়ে শুধু ঘুমের সময় স্ত্রীর কাছে আসে, তাহলে স্ত্রী অবহেলিত বোধ করবে — এটি ইসলামী দাম্পত্যের পরিপন্থী।
- ইসলামে পিতামাতার হক ও স্ত্রীর হক উভয়ই আদায় করতে হবে — একটির জন্য অন্যটি নষ্ট করা যাবে না।
হাদিস:
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
৮. সারসংক্ষেপ: কার কি হক ও সীমারেখা
| পক্ষ | হক ও সীমারেখা | |------|----------------| | স্বামী | নিজের উপার্জনের মালিক; তবে স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ ফরজ; পিতামাতার খেদমত ফরজ (প্রয়োজন অনুযায়ী) | | স্ত্রী | স্বামীর কাছে ভরণপোষণ, স্বতন্ত্র বাসস্থান, সময়, মনোযোগ, ভালোবাসা; শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা বাধ্যতামূলক নয় | | পিতামাতা | সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ (প্রয়োজনে), সম্মান, সদ্ব্যবহার; তবে পুত্রবধূর উপর জুলুম করার অধিকার নেই | | সন্তান | পিতামাতার ভরণপোষণ ও খেদমত করা ফরজ (প্রয়োজনে); তবে স্ত্রীর হক নষ্ট করা যাবে না |
৯. ইসলামী সমাধান ও পরামর্শ
১. স্বামীকে উভয় পক্ষের হক আদায় করতে হবে — পিতামাতার হক ও স্ত্রীর হক একসাথে। ২. স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা — যদি সে শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চায়। ৩. মায়ের কাছে সব টাকা রাখা বন্ধ করে পরিবারের বাজেট তৈরি করা — যেখানে স্ত্রী-সন্তানের হক, পিতামাতার হক ও নিজের প্রয়োজন থাকবে। ৪. স্ত্রীর সাথে পরামর্শ ও সম্মান — তাকে পরিবারের সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত করা। ৫. পিতামাতার খেদমত নিজে করা — প্রবাসে থাকলে সম্ভব হলে ছুটি নিয়ে, অথবা ভাই-বোনদের সাথে ভাগ করে নেওয়া। ৬. স্ত্রীকে জুলুম না করা — সে যদি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চায়, তাহলে তাকে বাধ্য না করা। ৭. পারিবারিক পরামর্শের জন্য একজন বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির শরণাপন্ন হওয়া।
১০. গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া রেফারেন্স
- ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি তাকি উসমানি (রহ.), খণ্ড ২, পৃ. ৩২১ (দাম্পত্য হক)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.), খণ্ড ৪, পৃ. ২৮৭
- রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.), খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭৫; খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭
- বেহেশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.), বিবাহ অধ্যায়
- মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.), সূরা নিসা: ১৯-এর তাফসির
- ফাতাওয়া আলমগিরি — খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৮ (নাফাকার বিধান)
১১. উপসংহার
ইসলামে পিতামাতার হক ও স্ত্রীর হক উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো এক পক্ষের হক আদায়ের নামে অন্য পক্ষের হক নষ্ট করা জুলুম। স্বামীর উচিত ন্যায়বিচার করা — মায়ের খেদমত করা, কিন্তু স্ত্রী-সন্তানের হকও আদায় করা। স্ত্রীর কষ্ট পাওয়া যদি বৈধ কারণে হয়, তাহলে স্বামী গুনাহগার হবে। আর স্ত্রীর জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চাওয়া গুনাহ নয়, বরং তার শরীয়তসম্মত হক।
وَاللَّهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ — "আল্লাহ জানেন কে ফাসাদ সৃষ্টিকারী আর কে সংশোধনকারী।" (সূরা বাকারা: ২২০)