নামাজে যাওয়ার আগে অযু বার বার ভেঙে যায়, আমি নিশ্চিত যে অযু বার বার ভেঙে যায় এ কারণে নামাজ পড়তে পারি না, কারণ অযু বার বার ভাঙতেই থাকে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?
Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi
Question
নামাজে যাওয়ার আগে অযু বার বার ভেঙে যায়, আমি নিশ্চিত যে অযু বার বার ভেঙে যায় এ কারণে নামাজ পড়তে পারি না, কারণ অযু বার বার ভাঙতেই থাকে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার সমস্যা সম্ভবত ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) বা কোনো শারীরিক কারণে বারবার অযু ভেঙে যাওয়া। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, আপনি যদি নিশ্চিত হন যে অযু বারবার ভেঙে যাচ্ছে (যেমন: বায়ু নির্গমন, পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি), তাহলে আপনি নামাজ পড়বেন না। কিন্তু যদি এটি সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা হয়, তাহলে শয়তানের ধোঁকায় পা না দিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে।
নিচে বিশদভাবে উত্তর দেওয়া হলো:
১. কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিধান
-
অযু ভঙ্গের নিশ্চিত হলে নামাজ জায়েজ নয়:
আল্লাহ তাআলা বলেন:"হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নামাজের জন্য উঠো, তখন নিজেদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করো এবং মাথা মাসেহ করো ও পা গোড়ালি পর্যন্ত ধৌত করো..." (সূরা আল-মায়েদা: ৬)
আয়াতের ব্যাখ্যায় ফকিহগণ বলেন, অযু শুদ্ধ না হলে নামাজ শুদ্ধ হয় না। -
সন্দেহ দূর করার নির্দেশনা:
নবী (ﷺ) বলেন:"যদি তোমাদের কেউ নামাজে থাকা অবস্থায় তার নাভির নিচে কিছু অনুভব করে এবং তার অযু ভেঙেছে কিনা সন্দেহ হয়, তবে সে যেন নামাজ ত্যাগ না করে, যতক্ষণ না সে শব্দ বা গন্ধ শুনতে পায়।" (সহিহ বুখারি: ১৩৭; সহিহ মুসলিম: ৩৬১)
এই হাদিস বুঝায়, নিশ্চিত না হলে অযু ভাঙা গণ্য হবে না।
২. শায়খ ইবনে তায়মিয়্যা, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে বাজ, আলবানী, উসাইমীন ও সালেহ ফাওজানের মতামত
-
শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়্যা (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি মনে করে তার অযু ভেঙে গেছে, কিন্তু নিশ্চিত না, সে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়েছে। তার উচিত এই ধারণা উপেক্ষা করে নামাজ আদায় করা।" (মাজমুউ ফাতাওয়া, ২১/২২৬)
-
শায়খ ইবনে বাজ (রহ.) বলেন:
"যদি বারবার অযু ভাঙার নিশ্চিত ঘটনা ঘটে (যেমন: পেটের অসুখে বায়ু নির্গমন), তাহলে প্রতি নামাজের জন্য নতুন অযু করতে হবে। আর যদি সন্দেহ হয়, তাহলে ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে নামাজ পড়তে থাকুন।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বাজ, ২৯/৬২)
-
শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন:
"ওয়াসওয়াসা দূর করতে নবী (ﷺ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সন্দেহকে গুরুত্ব না দিয়ে অযু শেষে "বিসমিল্লাহ" পড়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যান।" (সিলসিলা সহিহা, ২/৩১২)
-
শায়খ উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"যার অযু বারবার ভাঙে (যেমন: মুসতাহাযা বা পেটের অসুখে আক্রান্ত), সে প্রতিটি ফরজ নামাজের সময় অযু করবে এবং তারপর যতবার ইচ্ছা নফল নামাজ পড়তে পারবে। মাঝখানে অযু ভাঙলে তা উপেক্ষা করবে।" (শারহুল মুমতি, ১/২৪০)
-
শায়খ সালেহ আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"শয়তান মুসলিমকে নামাজ থেকে দূরে রাখতে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। সুতরাং নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া অযু ভাঙার ঘোষণা দেওয়া জায়েজ নয়।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ফাওজান, ১/১১৭)
৩. আপনার জন্য করণীয়
ক. প্রথমে নিশ্চিত হোন:
- আপনি কি সত্যিই অযু ভেঙে যাওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ দেখতে পান? (পানি/বায়ু বের হওয়া, পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি)
- নাকি এটি শুধু সন্দেহ বা ভয়? যদি সন্দেহ হয়, তাহলে নামাজ পড়ুন, কারণ নবী (ﷺ) সন্দেহকে অগ্রাহ্য করতে বলেছেন।
খ. যদি নিশ্চিত অযু ভাঙে (যেমন: মাজুর ব্যক্তি):
- আপনি যদি মাজুর হন (যেমন: দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা প্রস্রাবের সমস্যা), তাহলে প্রতিটি ফরজ নামাজের জন্য একবার অযু করবেন এবং সে অযু দিয়ে ফরজ ও নফল নামাজ পড়তে পারবেন, যতক্ষণ না নামাজের সময় শেষ হয় বা কোনো বড় নাপাকি (মল-মূত্র) বের না হয়।
- মাজুরের সংজ্ঞা: যদি এক নামাজের সময় অযু ভাঙতে থাকে এমনভাবে যে অযু করে নামাজ পড়া সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি মাজুর গণ্য হবেন। (ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, ১১/২২৪)
গ. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়:
- অযু করার সময় বেশি পানি ব্যবহার না করে স্বাভাবিক নিয়মে অযু করুন।
- অযু শেষে মনে মনে বলুন: "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।" (সহিহ মুসলিম: ২৩৪)
- নামাজে দাঁড়ানোর সময় শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আশ্রয় চেয়ে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
- নামাজে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করুন। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
ঘ. অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন:
- যদি সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কোনো নির্ভরযোগ্য সালাফি আলেমের কাছে সরাসরি পরামর্শ নিন। কারণ কখনো কখনো এটি মানসিক রোগ (OCD) বা শারীরিক সমস্যার কারণে হতে পারে।
৪. শেষ কথা
আপনার উচিত শয়তানের কুমন্ত্রণাকে উপেক্ষা করা এবং নামাজে অটল থাকা। নবী (ﷺ) বলেন:
"শয়তান তোমাদের কেউ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অযু ভেঙে যাওয়ার সন্দেহ সৃষ্টি করে। যদি কেউ নামাজে এ রকম কিছু অনুভব করে, তবে সে যেন নামাজ ত্যাগ না করে যতক্ষণ না শব্দ শুনতে পায় বা গন্ধ পায়।" (সহিহ বুখারি: ১৩৭)
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে অযু ভাঙছে, তাহলে প্রতি নামাজের জন্য নতুন অযু করুন এবং নামাজ আদায় করুন। আর যদি সন্দেহ হয়, তাহলে নামাজ চালিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা আপনার নামাজ কবুল করুন। (আমিন)