গীবত করা জায়েজ কখন

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6748
Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 11 Oct 2026, 04:22 PM
Reviewed & Published: 11 Oct 2026, 04:50 PM
Views: 21
Tokens: 7,703
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. একটি বইয়ে পড়লাম কেউ জুলুমের স্বীকার হলে গীবত করা জায়েজ। চাই যার কাছে বলা হচ্ছে সে সমাধান করতে পারুক বা না পারুক। যেহেতু জুলুম করলে মানুষ কষ্ট পায়। তাই নিজের কষ্ট কমাতে বলা যাবে যে অমুক একাজটি করেছে। যেমন : কেউ কারো জিনিস চুরি করলে।
এখন আমার প্রশ্ন হলো জুলুম তো শুধু শারীরিক বা বৈষয়িক বিষয়ে হয় না, বরং মানসিক ভাবেও অনেকে অন্যের উপর জুলুম করে। যেমন : একজন অন্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করেনা। কিন্তু সে লোকটি অত্যধিক ধারণা বশত এসে বলল তুমি আমার ব্যাপারে খারাপ ধারণা রাখো। যা প্রথম ব্যক্তির প্রতি অপবাদ স্বরূপ। এতে প্রথম ব্যক্তি অত্যন্ত কষ্ট পায়। এটাকে কি জুলুম বলা যাবে? এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে যদি প্রথম ব্যক্তি নিজের কষ্ট লাঘবের জন্য বলে যে ওমুক তাকে অপবাদ দিয়েছে কিন্তু সে তা থেকে মুক্ত তাহলে কি তার গীবতের গুনাহ হবে?
২.কোন কোন জুলুমের স্বীকার হলে গীবত জায়েজ? মানসিক জুলুমের কোন পর্যায়ে গীবত জায়েজ?
৩. একজন ব্যক্তি অনেকবার আল্লাহর নামে কসম করেছে। কতবার করেছে সংখ্যাটা তার মনে নেই। সে কিভাবে এর কাফফারা আদায় করবে?

Answer

গীবত কখন জায়েজ — বিস্তারিত ফিকহি উত্তর

উত্তর নং ১ ও ২ একসাথে (কার জুলুমে গীবত জায়েজ, মানসিক জুলুমের বিধান)

মূলনীতি: গীবতের সাধারণ নিষেধাজ্ঞা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ। আর গোয়েন্দাগিরি করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দই করো। আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" — (সূরা হুজুরাত: ১২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ গীবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেন:

ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ

"তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।" — (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)

গীবত জায়েজ হওয়ার ছয়টি কারণ (উলামায়ে কেরামের বর্ণনা)

ইমাম নববী রহ. ও ইবন আবিদীন রহ. ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো:

تَظَلُّمٌ — অর্থাৎ মাজলুম ব্যক্তি জালিমের বিরুদ্ধে বিচারক/শাসকের কাছে অভিযোগ করা, অথবা যার কাছে প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তার কাছে নিজের মাজলুমিয়তের কথা বলা।

ইবন আবিদীন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

وَيُبَاحُ لِلْمَظْلُومِ ذِكْرُ ظَالِمِهِ عِنْدَ مَنْ يَرْجُو مِنْهُ إزَالَةَ ظُلْمِهِ

"মাজলুমের জন্য তার জালিমের কথা তার কাছে বলা জায়েজ, যার কাছ থেকে সে জুলুম দূর হওয়ার আশা রাখে।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৭, দারুল ফিকর)

শর্ত: জুলুমের স্বীকৃতি ও প্রতিকারের সম্ভাবনা

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: গীবত জায়েজ হওয়ার জন্য শুধু "জুলুম হয়েছে" বলা যথেষ্ট নয়; বরং শর্ত হলো—

১. প্রকৃতপক্ষে জুলুম সংঘটিত হতে হবে (শরিয়তের দৃষ্টিতে জুলুম)। ২. যে উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে তা বৈধ হতে হবে — অর্থাৎ জুলুম প্রতিরোধ বা নিজের হক আদায়। ৩. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু না বলা। ৪. সম্ভব হলে নাম উল্লেখ না করে সাধারণভাবে বলা।

ইমাম নববী রহ. «রিয়াদুস সালিহীন»-এ বলেন:

وَأَمَّا الْمَظْلُومُ فَيَجُوزُ لَهُ ذِكْرُ ظُلْمِ مَنْ ظَلَمَهُ وَالتَّظَلُّمُ مِنْهُ

"মাজলুমের জন্য তার প্রতি কৃত জুলুমের কথা বলা ও অভিযোগ করা জায়েজ।" — (রিয়াদুস সালিহীন, হাদিস ১৫২৬-এর ব্যাখ্যা)

আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের বিশ্লেষণ

প্রশ্ন: কেউ কারো জিনিস চুরি করলে, মাজলুম ব্যক্তি তার কষ্ট লাঘবের জন্য বলবে "অমুক আমার জিনিস চুরি করেছে" — এটা কি জায়েজ?

উত্তর: হ্যাঁ, তবে শর্তসাপেক্ষে। যদি সে প্রকৃতপক্ষে মাজলুম হয় এবং তার উদ্দেশ্য হয়—

  • জুলুম প্রতিরোধ,
  • নিজের হক ফিরে পাওয়া,
  • অথবা যার কাছে বলছে সে প্রতিকার করতে সক্ষম,

তাহলে জায়েজ। কিন্তু যদি শুধু কষ্ট লাঘবের জন্য, যার সামনে বলছে সে কিছুই করতে পারবে না, এবং উদ্দেশ্য শুধু জালিমের বদনাম করা হয় — তাহলে এটা গীবতের সীমায় পড়বে।

ইমাম গাজালি রহ. «ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন»-এ বলেন:

وَإِنَّمَا يُبَاحُ لِلْمَظْلُومِ التَّظَلُّمُ لَا التَّشَفِّي

"মাজলুমের জন্য বৈধ হলো অভিযোগ করা, প্রতিশোধের তৃপ্তি নয়।" — (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ৩/১৪৮)

মানসিক জুলুমের বিধান

প্রশ্ন: মানসিক জুলুম কি জুলুম হিসেবে গণ্য হবে? যেমন কেউ মিথ্যা অপবাদ দিল যে "তুমি আমার ব্যাপারে খারাপ ধারণা রাখো" — এতে প্রথম ব্যক্তি কষ্ট পায়।

উত্তর: হ্যাঁ, এটা শরিয়তের দৃষ্টিতে জুলুম। কারণ—

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا

"যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদেরকে বিনা অপরাধে কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।" — (সূরা আহযাব: ৫৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ

"প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।" — (সহিহ বুখারি: ১০)

মিথ্যা অপবাদ (বুহতান) তো গীবতের চেয়েও গুরুতর। ইমাম নববী রহ. বলেন:

الْبُهْتَانُ أَشَدُّ مِنْ الْغِيبَةِ

"বুহতান (মিথ্যা অপবাদ) গীবতের চেয়েও কঠিন।" — (রিয়াদুস সালিহীন: ১৫২৬-এর ব্যাখ্যা)

এক্ষেত্রে বিধান: যদি কেউ মিথ্যা অপবাদ দেয় এবং এতে মানসিক কষ্ট হয়, তাহলে মাজলুম ব্যক্তি—

  • বিচারকের কাছে অভিযোগ করতে পারবে,
  • যার কাছে প্রতিকার সম্ভব তার কাছে বলতে পারবে,
  • কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে শুধু বদনাম করার উদ্দেশ্যে বলতে পারবে না।

আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ: "প্রথম ব্যক্তি নিজের কষ্ট লাঘবের জন্য বলে যে অমুক তাকে অপবাদ দিয়েছে কিন্তু সে তা থেকে মুক্ত" — যদি সে প্রকৃতপক্ষে মুক্ত হয় এবং উদ্দেশ্য হয় প্রতিকার/সতর্কতা, তাহলে জায়েজ। কিন্তু যদি শুধু কষ্ট লাঘবের জন্য এবং শ্রোতা প্রতিকার করতে অক্ষম হয়, তাহলে গীবতের গুনাহ হবে।

ইবন আবিদীন রহ. স্পষ্ট করেন:

وَإِنْ كَانَ الْمَقْصُودُ مُجَرَّدَ التَّشَفِّي وَإِطْلَاعِ النَّاسِ عَلَى عُيُوبِهِ فَهُوَ حَرَامٌ

"যদি উদ্দেশ্য শুধু প্রতিশোধের তৃপ্তি ও মানুষের কাছে তার দোষ প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা হারাম।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪০৮)

মানসিক জুলুমের কোন পর্যায়ে গীবত জায়েজ?

নীতিমালা: ১. সামান্য কষ্ট/অপ্রিয় কথা — এতে গীবত জায়েজ নয়। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ২. মিথ্যা অপবাদ (বুহতান) — এটা জুলুম; প্রতিকারের জন্য অভিযোগ করা জায়েজ। ৩. মানহানি, বদনাম, সামাজিক ক্ষতি — এটাও জুলুম; প্রতিকার চাওয়া জায়েজ। ৪. শারীরিক/আর্থিক ক্ষতি — স্পষ্ট জুলুম; অভিযোগ জায়েজ। ৫. শুধু মন খারাপ/অপ্রিয় ব্যবহার — সাধারণত গীবতের অনুমতি দেয় না; তবে যদি তা নিয়মিত নির্যাতনে পরিণত হয়, তাহলে প্রতিকারের জন্য বলা যাবে।

সারসংক্ষেপ: মানসিক জুলুমও জুলুম, তবে গীবত জায়েজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো—

  • প্রকৃত জুলুম হওয়া,
  • প্রতিকারের উদ্দেশ্য হওয়া,
  • প্রয়োজনের অতিরিক্ত না হওয়া,
  • সম্ভব হলে নাম গোপন রাখা।

উত্তর নং ৩: অসংখ্য কসমের কাফফারা

কসমের প্রকারভেদ

প্রথমত: কসম তিন প্রকার— ১. ইয়ামিন লাগভ (لغو) — ভুলবশত বা অভ্যাসবশত কসম। এর কাফফারা নেই। ২. ইয়ামিন মুনআকিদাহ (منعقدة) — ইচ্ছাকৃতভাবে ভবিষ্যতের কোনো কাজের জন্য কসম করা। ৩. ইয়ামিন গামুস (غموس) — মিথ্যা কসম। এর কাফফারা নেই; তাওবা করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অর্থহীন কসমের জন্য পাকড়াও করেন না; কিন্তু তিনি পাকড়াও করেন সেই কসমের জন্য, যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করো। তার কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা তাদের বস্ত্র দান, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। যে তা পায় না, সে তিন দিন রোজা রাখবে। এটাই তোমাদের কসমের কাফফারা, যখন তোমরা কসম করো। আর তোমরা তোমাদের কসম রক্ষা করো।" — (সূরা মায়িদা: ৮৯)

কাফফারার পরিমাণ

একটি কসমের কাফফারা: ১. দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা ২. দশজন মিসকিনকে বস্ত্র দান, অথবা ৩. একজন দাস মুক্ত করা। ৪. যদি সামর্থ্য না থাকে — তিন দিন রোজা।

ইমাম সারাখসি রহ. «আল-মাবসুত»-এ বলেন:

الْكَفَّارَةُ تَتَكَرَّرُ بِتَكَرُّرِ الْيَمِينِ

"কসমের সংখ্যা অনুযায়ী কাফফারাও পুনরাবৃত্তি হবে।" — (আল-মাবসুত: ৮/১৩৭)

আপনার প্রশ্নের সমাধান: সংখ্যা মনে না থাকলে কী করবে?

ফিকহি নীতি: যখন কসমের সংখ্যা সঠিকভাবে জানা না থাকে, তখন অনুমান (غالب الظن) করে কাফফারা আদায় করতে হবে।

ইবন আবিদীন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

إذَا شَكَّ فِي عَدَدِ الْأَيْمَانِ يَعْمَلُ بِغَالِبِ ظَنِّهِ

"কসমের সংখ্যায় সন্দেহ হলে সে তার প্রবল ধারণা অনুযায়ী আমল করবে।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৪৫৬)

ব্যবহারিক পদ্ধতি:

১. প্রবল ধারণা করুন: কতবার কসম করেছেন তার একটি অনুমান করুন। যেমন—ধরুন, ১০ বার বা ২০ বার।

২. প্রতিটি কসমের জন্য আলাদা কাফফারা: প্রতিটি কসমের জন্য পৃথকভাবে কাফফারা দিতে হবে। অর্থাৎ ১০টি কসম হলে ১০টি কাফফারা।

ইমাম মুহাম্মদ রহ. «আল-আসার»-এ বলেন:

إذَا لَمْ يَعْلَمْ عَدَدَ الْأَيْمَانِ فَعَلَيْهِ أَنْ يُكَفِّرَ حَتَّى يَغْلِبَ عَلَى ظَنِّهِ أَنَّهُ قَدْ أَدَّى مَا عَلَيْهِ

"যদি কসমের সংখ্যা না জানে, তাহলে সে ততক্ষণ কাফফারা দেবে যতক্ষণ প্রবল ধারণা না হয় যে সে তার দায়িত্ব আদায় করেছে।"

★উল্লেখ্য, আল্লাহর নামে ভবিষ্যতে কোনো কথা বা কাজ না করার কসম করে সেই কসম ভেঙে ফেললে তবেই কাফফারা আবশ্যক হবে।

অন্যথায় কাফফারা আবশ্যক হবেনা।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.