হায়েজ নাকি ইস্তিহাযা? অনিয়মিত রক্তপাত হলে নামাজের বিধান কি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমার হায়েজ অনিয়মিত। কোনো মাসে হয়, আবার কোনো মাসে হয় না। একেকবার একেক রকম সময় ধরে রক্তপাত হয়।
গত ৯ জুলাইয়ের পর প্রায় আড়াই মাস বিরতি দিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর আবার রক্তপাত শুরু হয়। তবে রক্তপাতের পরিমাণ খুব কম ছিল এবং মাঝেমধ্যে অল্প অল্প রক্ত দেখা যাচ্ছিল। এভাবে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রক্তপাত হয়। মাঝখানে সম্ভবত একদিন রক্ত বন্ধ ছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর আমি পবিত্র হই।
এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর আবার রক্ত দেখা যায়। যেহেতু ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ দিন পার হওয়ার পরও রক্ত দেখা গিয়েছিল, তাই আমি সেটাকে ইস্তিহাযা মনে করেছিলাম। এরপরও অল্প অল্প করে মাঝেমধ্যে রক্ত আসছিল। তবে ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে স্বাভাবিক হায়েজের মতো বেশি পরিমাণে রক্তপাত হচ্ছে।
এখন আমার কয়েকটি বিষয়ে জানার আছে:
১। ১৮–২৩ সেপ্টেম্বরের রক্তপাতটি কি হায়েজ ছিল, নাকি ইস্তিহাযা ছিল? কীভাবে তা নির্ধারণ করব?
২। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে যে রক্তপাত শুরু হয়েছে, সেটি কি ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে?
৩। ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে স্বাভাবিক হায়েজের মতো বেশি রক্তপাত হচ্ছে। এটিকে কি নতুন হায়েজ হিসেবে গণ্য করব, নাকি ইস্তিহাযা হিসেবে বিবেচনা করব?
৪। ২৩ সেপ্টেম্বর পবিত্র হওয়ার পর ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের বেশি সময় পার হয়েছে। তবে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে আবার রক্তপাত শুরু হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে পবিত্রতার সময় কীভাবে হিসাব করব?
৫। বর্তমানে আমার সালাত আদায়ের বিধান কী? কোন সময়ের সালাত আদায় করতে হবে এবং কোনো সালাত কাজা করতে হবে কি না?
উল্লেখ্য, আমার হায়েজ অনিয়মিত। আগেরবার হায়েজ কত দিন স্থায়ী হয়েছিল, তা-ও সঠিকভাবে মনে নেই।ত
Answer
হায়েজ ও ইস্তিহাযার বিধান: অনিয়মিত রক্তপাতের ক্ষেত্রে করণীয়
উত্তর (সংক্ষেপে): আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—১৮–২৩ সেপ্টেম্বরের রক্তপাত হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে (কারণ তা ৩ দিনের কম নয় এবং ১০ দিনের বেশি নয়)। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রক্তপাত ইস্তিহাযা। আর ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে যে স্বাভাবিক হায়েজের মতো রক্তপাত শুরু হয়েছে, তা নতুন হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে, যদি তা ৩ দিন পূর্ণ হয় এবং ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত আপনি পবিত্র (তাহির) ছিলেন; এ সময়ের নামাজ-রোজা সব আদায় করতে হবে। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত যেহেতু ইস্তিহাযা ছিল, তাই উক্ত দিনগুলোর নামাজও আদায় করতে হবে—কাজা নয়। আর ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে হায়েজ শুরু হলে তখন থেকে নামাজ-রোজা বন্ধ থাকবে।
বিস্তারিত উত্তর
মূল নীতি (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
হানাফি মাযহাবে হায়েজের সর্বনিম্ন সময়কাল ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) এবং সর্বোচ্চ ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)। এর কম বা বেশি হলে তা হায়েজ নয়; বরং ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الْحَيْضُ ثَلَاثٌ إِلَى عَشْرٍ» — “হায়েজ কমপক্ষে তিন দিন এবং সর্বোচ্চ দশ দিন।”
— (সুনানে তিরমিযি, হাদিস: ১২৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮০; মুসনাদে আহমাদ)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া হলো—হায়েজের সর্বনিম্ন ৩ দিন, সর্বোচ্চ ১০ দিন।
— (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩)
ইস্তিহাযা হলো এমন রক্ত যা হায়েজের সময়সীমার বাইরে আসে, বা অসুস্থতা/রোগজনিত কারণে আসে। ইস্তিহাযার অবস্থায় মহিলা পবিত্র হিসেবে গণ্য হন; নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত সবই করতে পারেন (তবে নামাজের আগে অযু করতে হবে এবং রক্ত বন্ধ বা কমাতে প্যাড/কাপড় ব্যবহার করতে হবে)।
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৮; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫)
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর
১) ১৮–২৩ সেপ্টেম্বরের রক্তপাত: হায়েজ না ইস্তিহাযা?
উত্তর: এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।
কারণ:
-
১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রক্তপাত হয়েছে। মাঝখানে সম্ভবত একদিন বন্ধ ছিল। হানাফি মাযহাবে হায়েজের দিন গণনায় মাঝখানে রক্ত বন্ধ থাকলে সেটিও হায়েজের অন্তর্ভুক্ত হবে, যদি মোট রক্তপাতের সময়কাল ৩ দিন থেকে ১০ দিনের মধ্যে হয় এবং রক্তপাত ও বিরতির মোট সময় ১০ দিনের বেশি না হয়।
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৯)
-
আপনার ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর = ৬ দিন (মাঝের একদিন বিরতি সহ)। যেহেতু ৩ দিনের কম নয় এবং ১০ দিনের বেশি নয়, তাই এটি হায়েজ।
নির্ধারণের নিয়ম:
হায়েজ নির্ধারণে দেখতে হবে—
- রক্তপাত ৩ দিন বা তার বেশি হয়েছে কি না।
- ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়েছে কি না।
- রক্তের রং হায়েজের রক্তের মতো (গাঢ় লাল/কালো) কি না।
আপনার ক্ষেত্রে ১ ও ২ নম্বর শর্ত পূরণ হয়েছে, তাই এটি হায়েজ।
২) ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে যে রক্তপাত শুরু হয়েছে, তা কি ইস্তিহাযা?
উত্তর: হ্যাঁ, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রক্তপাত ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে।
কারণ:
- ২৩ সেপ্টেম্বর আপনি পবিত্র হয়েছিলেন। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর আবার রক্ত দেখা যায়। কিন্তু ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর = মাত্র ৭ দিন। হায়েজের সর্বনিম্ন সময়কাল ৩ দিন পূর্ণ হলেও, যেহেতু ১৮–২৩ সেপ্টেম্বরের রক্তপাতকে আমরা হায়েজ ধরেছি, তাই ৩০ সেপ্টেম্বরের রক্তপাত নতুন হায়েজ হিসেবে গণ্য হতে হলে তা পূর্ণ ৩ দিন স্থায়ী হতে হবে এবং ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হতে হবে।
- আপনার বর্ণনায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রক্তপাত অল্প অল্প ছিল—স্বাভাবিক হায়েজের মতো প্রবল ছিল না। তাই এটি ইস্তিহাযা।
ইস্তিহাযার বিধান:
ইস্তিহাযার অবস্থায় নামাজ, রোজা সবই ফরজ। তবে প্রত্যেক নামাজের জন্য অযু করতে হবে এবং রক্ত যেন না পড়ে সেজন্য প্যাড/কাপড় ব্যবহার করতে হবে।
— (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৮)
৩) ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে স্বাভাবিক হায়েজের মতো বেশি রক্তপাত: নতুন হায়েজ না ইস্তিহাযা?
উত্তর: এটি নতুন হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে, যদি—
- রক্তপাত ৩ দিন পূর্ণ হয় (অর্থাৎ ৯, ১০, ১১ অক্টোবর অন্তত রক্ত থাকে), এবং
- ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়।
কারণ:
- ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রক্তপাত স্বাভাবিক হায়েজের মতো বেশি হচ্ছে। রক্তের প্রকৃতি (পরিমাণ, রং) হায়েজের মতো হলে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।
- ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর = ১৬ দিন। যেহেতু মাঝখানে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত রক্তপাত ইস্তিহাযা ছিল, তাই ৯ অক্টোবরের রক্তপাতকে নতুন হায়েজ ধরা হবে।
সতর্কতা:
যদি ৯ অক্টোবর থেকে রক্তপাত ৩ দিনের কম হয় বা ১০ দিনের বেশি হয়, তাহলে তা ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে।
— (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩০; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩)
৪) পবিত্রতার সময় কীভাবে হিসাব করব?
উত্তর:
- ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত: আপনি পবিত্র ছিলেন। এই ৭ দিনের নামাজ-রোজা সব আদায় করতে হবে।
- ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত: যেহেতু ইস্তিহাযা ছিল, তাই এই দিনগুলোর নামাজও আদায় করতে হবে (কাজা নয়)। তবে প্রত্যেক নামাজের জন্য অযু করতে হবে।
- ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে: হায়েজ শুরু হলে তখন থেকে নামাজ-রোজা বন্ধ থাকবে।
পবিত্রতার হিসাব:
হায়েজ শেষ হলে (২৩ সেপ্টেম্বর) আপনি পবিত্র হয়েছিলেন। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রক্তপাত শুরু হলেও তা ইস্তিহাযা হওয়ার কারণে আপনার পবিত্রতা ভঙ্গ হয়নি। অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত আপনি পবিত্র ছিলেন (যদিও ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে অল্প রক্ত আসছিল, তা ইস্তিহাযা হিসেবে পবিত্রতার বিধান দেয় না)।
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৮; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫)
৫) বর্তমানে সালাত আদায়ের বিধান
উত্তর:
- ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে: যেহেতু স্বাভাবিক হায়েজের মতো রক্তপাত শুরু হয়েছে, তাই নামাজ-রোজা বন্ধ থাকবে। আপনি হায়েজের অবস্থায় আছেন।
- হায়েজ শেষ হলে: যখন রক্তপাত বন্ধ হবে (৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে), তখন গোসল করে পবিত্র হয়ে নামাজ শুরু করবেন।
- কাজা: হায়েজের দিনগুলোর নামাজ কাজা করতে হবে না। তবে ইস্তিহাযার দিনগুলোর নামাজ আদায় করতে হবে—যদি আদায় না করে থাকেন, তাহলে কাজা করতে হবে।
— (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫; বেহেশতী জেওর, পৃ. ৪৮)
বর্তমানে করণীয়:
- ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে হায়েজ গণ্য হলে—নামাজ বন্ধ।
- রক্তপাত ৩ দিন পূর্ণ হলে এবং ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হলে—হায়েজ শেষে গোসল করে নামাজ শুরু।
- যদি ১০ দিনের বেশি রক্তপাত হয়—তাহলে ১০ দিন হায়েজ, এরপর ইস্তিহাযা। তখন গোসল করে নামাজ শুরু করবেন এবং প্রত্যেক নামাজের জন্য অযু করবেন।
সারসংক্ষেপ
| সময়কাল | বিধান | নামাজ | |---|---|---| | ১৮–২৩ সেপ্টেম্বর | হায়েজ | বন্ধ (কাজা নেই) | | ২৩–২৯ সেপ্টেম্বর | পবিত্র | আদায় করতে হবে | | ৩০ সেপ্টেম্বর–৮ অক্টোবর | ইস্তিহাযা | আদায় করতে হবে (প্রত্যেক নামাজের জন্য অযু) | | ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে | নতুন হায়েজ (যদি ৩ দিন পূর্ণ হয়) | বন্ধ (কাজা নেই) |
পরামর্শ:
যেহেতু আপনার হায়েজ অনিয়মিত, তাই প্রতিবার রক্তপাতের সময় ৩ দিন ও ১০ দিনের নিয়ম মেনে চলুন। সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ আলেম/মুফতির সাথে পরামর্শ করুন। নিয়মিত হায়েজের দিনগুলো লিখে রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে হিসাব সহজ হয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।