পর্দার জন্য হাত-মোজা ও পা-মোজা পরার বিধান কী? নন-মাহরামের সামনে হাত-পা ঢাকা কি ওয়াজিব? বিবাহের জন্য পাত্রকে ছবি দেওয়া যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
পর্দার জন্য আমার কি হাত মুজা পা মুজা পড়া আবশ্যক সেটার বিধান কি? আমি হাত, পা, মুজা পড়ি কিন্তু সঠিক বিধানটা কি জানিনা। অনেকে বলেছেন এটা না পড়লেও হবে এমন কথা শুনি। আর আমার ঘরে বা নানু বাড়িতে নন মাহরামের সামনে হাত/ পা মুজা পড়া আবশ্যক? হাত যদিও হিজাবের জন্য ঢাকা থাকে বের ও হয় প্রয়োজনে সেটা পড়ে কাজ করা তো সম্ভব হয়না। আর বিয়ের জন্য পাত্রকে নিজের ছবি দেয়া যাবে? যদি দেশের বাইরা পাত্র পক্ষরা সবাই থাকেন সেক্ষেত্রে সামনা সামনি দেখাটা সম্ভব যদি না হয় তখন পাত্রীর জন্য তখন কি করণীয়
Answer
পর্দা সম্পর্কিত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নগুলো পর্দা তথা হিজাব-নিকাব সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পর্দার মূল বিধান হলো—নারী তার সমস্ত শরীর (মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি সহ, ফিকহে হানাফি অনুযায়ী) নন-মাহরাম পুরুষ থেকে ঢেকে রাখবে। নিচে ধাপে ধাপে বিধান পেশ করা হলো।
১. হাত-মোজা ও পা-মোজা (গ্লাভস ও সক্স) পরার বিধান
মূলনীতি:
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নারীর সতর হলো সমস্ত শরীর—মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি পর্যন্ত (এবং পা সহ)। এটাই ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত, যা পরবর্তী হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম গ্রহণ করেছেন।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি), খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬—"المرأة كلها عورة إلا وجهها ويديها" এর ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানিফার মত উল্লেখ করে ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফিতনার কারণে মুখমণ্ডলও ঢাকা ওয়াজিব।
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮।
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫-৩৪০ (মুফতি তাকি উসমানি)।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫০ (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)।
হাত-মোজা ও পা-মোজা সম্পর্কে বিধান:
| বিষয় | বিধান | |------|------| | হাত-মোজা (গ্লাভস) | নন-মাহরামের সামনে হাত ঢেকে রাখা ওয়াজিব। তবে গ্লাভস পরা ফরজ নয়—কোনো কাপড়, চাদর বা হাতা দিয়েও ঢাকা সম্ভব হলে তা-ই যথেষ্ট। | | পা-মোজা (সক্স) | নন-মাহরামের সামনে পা ঢেকে রাখা ওয়াজিব। মোজা বা লম্বা কাপড় দিয়ে ঢাকা সম্ভব হলে তা-ই যথেষ্ট। |
গুরুত্বপূর্ণ: হাত-মোজা বা পা-মোজা নিজে কোনো ইবাদত বা ফরজ নয়; এগুলো শুধু সতর ঢাকার একটি মাধ্যম। যদি অন্য কোনো পোশাক দিয়ে হাত-পা ঢাকা সম্ভব হয়, তবে মোজা ছাড়াই পর্দা আদায় হবে। কিন্তু যদি মোজা ছাড়া হাত-পা ঢাকা সম্ভব না হয়, তবে মোজা পরা প্রয়োজনীয় হয়ে যায়।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬-৪০৮।
- বাহিশতী জেওর, পর্দার অধ্যায় (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬০।
"না পড়লেও হবে" — এই কথার বিশ্লেষণ:
যারা বলেন "মোজা না পড়লেও হবে"—তাদের কথা শর্তসাপেক্ষে সঠিক। যদি হাত-পা অন্য কোনোভাবে ঢাকা থাকে, তবে মোজা ছাড়াই পর্দা আদায় হবে। কিন্তু যদি হাত-পা খোলা থাকে, তবে তা হারাম। শুধু "মোজা না পড়লেও হবে" বলে হাত-পা খোলা রাখা জায়েজ নয়।
২. ঘরে বা নানু বাড়িতে নন-মাহরামের সামনে হাত/পা মোজা পরার বিধান
নন-মাহরাম (যেমন: চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই, মামাতো ভাই, বোনের জামাই, ফুফুর জামাই, নন-মাহরাম কাজিন, প্রতিবেশী পুরুষ, অপরিচিত পুরুষ) এর সামনে হাত-পা ঢাকা ওয়াজিব—তা সে ঘরে হোক, নানু বাড়িতে হোক, বা বাইরে হোক। স্থান পরিবর্তনে বিধান পরিবর্তন হয় না।
রেফারেন্স:
- সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১: "وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا..."
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.), খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯০-৪০০।
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬।
হাত ঢেকে কাজ করা কঠিন হলে কী করবেন?
আপনি বলেছেন—হাত হিজাবে ঢাকা থাকে, কিন্তু প্রয়োজন হলে বের হয় এবং কাজ করা কঠিন হয়। এর সমাধান:
- হাত-মোজা বা গ্লাভস ব্যবহার করুন — এতে হাত ঢাকা থাকবে এবং কাজও করা যাবে।
- যদি গ্লাভস পরেও কাজ না হয়, তবে শুধু প্রয়োজনের সময়টুকু হাত বের করা যাবে, কিন্তু সেটাও নন-মাহরামের সামনে না করে পর্দার আড়ালে করা উত্তম।
- বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে (যেমন: চিকিৎসা, রান্না-বান্নার অপরিহার্য কাজ) শুধু প্রয়োজনীয় অংশ বের করার অনুমতি আছে, তবে তা নন-মাহরামের দৃষ্টি এড়িয়ে হতে হবে।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪০-৩৪৫।
- ইমদাদুল আহকাম, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫০।
৩. বিবাহের জন্য পাত্রকে নিজের ছবি দেওয়ার বিধান
হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট বিধান:
নারীর ছবি (বিশেষত মুখমণ্ডল ও শরীরের ছবি) নন-মাহরাম পুরুষকে পাঠানো জায়েজ নয়। এটি পর্দার সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭ (ছবি সংক্রান্ত অধ্যায়)।
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫০-৩৫৫।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৫।
- আহকামে পর্দা (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)।
তবে একটি ব্যতিক্রম:
যদি বিবাহের প্রস্তাব আসে এবং পাত্র পক্ষ সরাসরি দেখতে না পারে, তবে শরিয়তের অনুমতি হলো:
-
পাত্র নিজে পাত্রীকে দেখবে — শরিয়তে বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্রের জন্য পাত্রীকে দেখা সুন্নত/মুস্তাহাব।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন তার জন্য দেখা উত্তম, যদি তা বিবাহের উদ্দেশ্যে হয়।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২০৮২; জামে তিরমিজি, হাদিস ১০৮৭। -
মাহরাম পুরুষের মাধ্যমে দেখা — পাত্রীর ভাই, বাবা, চাচা ইত্যাদি মাহরাম পুরুষ পাত্রকে পাত্রীর বর্ণনা দিতে পারেন বা পাত্রকে পাত্রীর সাথে দেখা করাতে পারেন (শরিয়তের সীমা রক্ষা করে)।
-
ছবি পাঠানো — যদি একান্তই দেখা সম্ভব না হয় এবং ছবি পাঠানোর প্রবল প্রয়োজন হয়, তবে কিছু হানাফি ফুকাহা শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছেন:
- ছবি হতে হবে সম্পূর্ণ পর্দাসহ (মুখমণ্ডল সহ ঢাকা)।
- শুধু পাত্র নিজে দেখবে, অন্য কেউ নয়।
- ছবি দেখার পর মুছে ফেলা বা ফেরত দেওয়া হবে।
- ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫২-৩৫৫ (মুফতি তাকি উসমানি)।
- ফাতাওয়া রাহিমিয়া, খণ্ড ৮, পৃ. ২৫০।
- কিফায়াতুল মুফতি, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮০।
তবে সর্বোত্তম ও নিরাপদ পথ: ছবি না পাঠিয়ে সরাসরি দেখা বা মাহরামের মাধ্যমে দেখা-শোনার ব্যবস্থা করা।
৪. দেশের বাইরে পাত্র পক্ষ থাকলে করণীয়
যদি পাত্র দেশের বাইরে থাকে এবং সরাসরি দেখা সম্ভব না হয়, তবে করণীয়:
১. ভিডিও কলে দেখা (শর্তসাপেক্ষে):
- যদি পাত্র ও পাত্রী উভয়েই পর্দা রক্ষা করে (পাত্রী পূর্ণ পর্দায়, পাত্র নিজের ঘরে একা) এবং তৃতীয় কেউ না থাকে (মাহরাম উপস্থিত থাকতে পারে), তবে বিবাহের প্রস্তাবের উদ্দেশ্যে ভিডিও কলে দেখা-শোনার অনুমতি কিছু সমকালীন হানাফি ফুকাহা দিয়েছেন।
- তবে সতর্কতা: এটি ফিতনার দরজা খুলে দিতে পারে, তাই মাহরামের উপস্থিতি আবশ্যক।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৫-৩৬০।
- আহকামে পর্দা (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)।
২. মাহরামের মাধ্যমে দেখা:
- পাত্রীর বাবা, ভাই বা মাহরাম পুরুষ পাত্রের সাথে দেখা করে পাত্রীর পক্ষ থেকে কথা বলবেন।
- পাত্রী নিজে পর্দার আড়াল থেকে কথা শুনতে পারেন বা মাহরামের মাধ্যমে প্রশ্ন-উত্তর পাঠাতে পারেন।
৩. ছবি পাঠানো (একান্ত প্রয়োজন হলে):
- উপরের ৩ নম্বর পয়েন্টে বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে।
৪. সবচেয়ে উত্তম পথ:
- সরাসরি দেখা না হলে বিবাহ সম্পন্ন করে বিবাহের পর দেখা-শোনা করা। ইসলামে বিবাহের আগে দেখা সুন্নত, কিন্তু ফরজ নয়। যদি দেখা সম্ভব না হয়, তবে আল্লাহর উপর ভরসা করে বিবাহ করা এবং বিবাহের পর একে অপরকে দেখা-শোনা করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নারীকে তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ দেওয়া হয় তার নাম, তার বংশ, তার সম্পদ ও তার দ্বীন দেখে। তুমি দ্বীনদার নারীকে গ্রহণ করো।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৬।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | হাত-পা মোজা পরা কি আবশ্যক? | সতর ঢাকার জন্য প্রয়োজনীয়; অন্য কোনোভাবে ঢাকা সম্ভব হলে মোজা ছাড়াই চলবে। | | নন-মাহরামের সামনে হাত-পা ঢাকা? | ওয়াজিব — ঘরে, নানু বাড়িতে, বাইরে সর্বত্র। | | হাত ঢেকে কাজ করা কঠিন? | গ্লাভস ব্যবহার করুন; প্রয়োজনে পর্দার আড়ালে হাত বের করুন। | | পাত্রকে ছবি দেওয়া? | জায়েজ নয়; একান্ত প্রয়োজন হলে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি আছে। | | দেশের বাইরে পাত্র পক্ষ? | মাহরামের মাধ্যমে দেখা, ভিডিও কল (শর্তসহ), বা বিবাহের পর দেখা। |
দুআ
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার পূর্ণ বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب