হারাম টাকা দান করার বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6696
Questioner: Aslam
Question Asked: 10 Oct 2026, 08:02 PM
Reviewed & Published: 10 Oct 2026, 08:16 PM
Views: 12
Tokens: 6,909
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
হারাম টাকা বিনা সোওয়াবে গরিবকে দান করে দিতে হয়। এটা জানি
তবে আমি কয়েকটি সিনারিও এর বিষয়ে পরিস্কার জ্ঞান নিতে চাই।
১/ এমন কোনো দাতব্য সংস্থাকে কি হারামটাকাগুলো দান করা যাবে যারা রাস্তায় পড়ে থাকা গরিব বা অসহায় ব্যক্তিদেকে তাদের দাতব্য সংস্থায় আশ্রয় দেয় এবং তাদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে??
২/ কোনো মহিলার থাকার বাসস্থান আছে। মানুষের বাসায় কাজ করে ৪ সন্তান নিয়ে দিন কাটায় তবে সেই টাকা স্বাভাবিক দিন যাপনের জন্য অপ্রতুল.. তাকে সন্তানের লেখাপড়া বা অন্যান্য বিষয়ের জন্য পরিচিতদের সাহায্য নিতে হয়। তাকে কি সেই টাকা দেয়া যাবে???

৩/ খালা এবং মামাতো ভাইয়ের বউ এর কোনো উপার্জন নাই এবং তারা প্রচুর টাকা ঋণগ্রস্ত... তাদের কি এই হারাম টাকা দেয়া যাবে??
৪/ অসুস্থ বিড়ালের চিকিৎসা বা খাবারে জন্য কেউ টাকা চাইলে সেই হারাম টাকা দেয়া যাবে??
এছাড়াও কাকে কাকে দেয়া যাবে? আর কাকে দেয়া যাবে না??? পরিস্কার দিকনির্দেশনা চাচ্ছি

Answer

হারাম মাল দান করার বিধান: একটি বিশ্লেষণমূলক ফতোয়া

উত্তর:

হারাম উপার্জনের মাল নিজের কাছে রাখা, ভোগ করা বা সওয়াবের নিয়তে দান করা—কোনোটিই জায়েয নয়। তবে হারাম মালের মালিকানা হালাল করার একমাত্র পথ হলো তা আসল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া (যদি মালিক জানা থাকে)। আর যদি মালিক জানা না থাকে বা খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে নিসাব পরিমাণ না হলে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তা গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দেওয়া—এটাই ফকীহদের প্রসিদ্ধ সমাধান। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


মূলনীতি (ভিত্তি)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«كُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ» "যে গোশত হারাম উপার্জন থেকে গড়ে উঠেছে, তার জন্য জাহান্নামই বেশি উপযুক্ত।" — (মুসনাদ আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত: ২৭৬০)

আর আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَتَقَبَّلُ إِلَّا مِنَ الْمُتَّقِينَ﴾ "নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ছাড়া কারো আমল কবুল করেন না।" — (সূরা মায়িদা: ২৭)

ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ লিখেছেন:

"হারাম মাল সদকা করলে সদকার সওয়াব পাওয়া যাবে না; বরং তা আসল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। মালিক অজানা হলে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিবকে দিয়ে দেবে।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭, কিতাবুল গাসব)

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন:

"হারাম মালের ক্ষেত্রে সদকার নিয়ত করা জায়েয নয়; বরং তা 'তাখলীস' বা মুক্তি দেওয়ার নিয়তে দেওয়া হয়।" — (ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৩৯৮)


১ম প্রশ্ন: দাতব্য সংস্থাকে হারাম টাকা দেওয়া যাবে কি?

উত্তর: যদি সেই সংস্থা প্রকৃত হকদার (গরিব, অসহায়, এতিম, ঋণগ্রস্ত) ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায় এবং সংস্থাটি নিজে মালিকানা নিয়ে ভোগ না করে—তাহলে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া হারাম মাল তাদের মাধ্যমে গরিবদের কাছে পৌঁছানো জায়েয।

তবে শর্তগুলো:

  1. সংস্থাটি হারাম মালকে নিজের সম্পদ হিসেবে গ্ৰহণ না করবে।
  2. সওয়াবের আশা ছাড়াই দিতে হবে।
  3. সংস্থার পরিচালক/কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এই হারাম মাল থেকে দেওয়া যাবে না।
  4. প্রশাসনিক খরচ (অফিস ভাড়া, যানবাহন ইত্যাদি) এই মাল থেকে নেওয়া যাবে না।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন:

"হারাম মাল সদকা করার সময় সওয়াবের নিয়ত করবে না; বরং এই নিয়ত করবে যে, আমি এই নাপাক মাল থেকে মুক্তি পেতে চাই।" — (বেহেশতী জেওর, ৭ম অংশ)

সতর্কতা: অনেক দাতব্য সংস্থা দাতার নামে সওয়াবের রসিদ দেয়—এটি হারাম মালের ক্ষেত্রে জায়েয নয়।


২য় প্রশ্ন: ৪ সন্তানের জননী, স্বামী নেই, উপার্জন অপ্রতুল—তাকে দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, তাকে দেওয়া যাবে, যদি সে প্রকৃত হকদার হয় অর্থাৎ যাকাত গ্রহনের উপযুক্ত হয়। কারণ:

  • সে গরিব/মিসকিনের অন্তর্ভুক্ত।
  • সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার উপর।
  • তার আয় দিনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়।

তবে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দিতে হবে। তাকে বলবেন না যে "এটি সদকা"—বরং বলবেন "এটি আপনার হক, আল্লাহর পক্ষ থেকে সহায়তা।"

দলিল: আল্লাহ বলেন:

﴿إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ...﴾ "সদকা তো কেবল ফকির, মিসকিন...দের জন্য।" — (সূরা তাওবা: ৬০)

ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"হারাম মাল মালিক অজানা হলে ফকির-মিসকিনকে দেওয়া হবে; ধনীকে দেওয়া যাবে না।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭)


৩য় প্রশ্ন: খালা ও মামাতো ভাইয়ের বউ—ঋণগ্রস্ত, উপার্জন নেই—তাদের দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, তাদের দেওয়া যাবে, যদি তারা প্রকৃত ঋণগ্রস্ত (গারিমীন) হয় এবং নিসাবের মালিক না হয়।

তবে শর্ত:

  • ঋণ হালাল কারণে হয়েছে (যেমন: চিকিৎসা, ব্যবসায় ক্ষতি, সংসার খরচ)।
  • ঋণ হারাম কারণে (সুদ, জুয়া, মদ) হলে তাদের দেওয়া যাবে না—কারণ তখন তা হারাম কাজে সহায়তা হবে।

আল্লাহ বলেন:

﴿وَالْغَارِمِينَ﴾ "...এবং ঋণগ্রস্তদের জন্য।" — (সূরা তাওবা: ৬০)

মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী (রহ.) «ফাতাওয়া মাহমুদিয়া»-তে বলেন:

"হারাম মাল ঋণ পরিশোধে দেওয়া যাবে না, যদি সেই ঋণ সুদ বা হারাম লেনদেন থেকে হয়।" — (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ১৭/৩৪৫)


৪র্থ প্রশ্ন: অসুস্থ বিড়ালের চিকিৎসা বা খাবারে দেওয়া যাবে?

উত্তর: যাবে না। কারণ:

  1. হারাম মালের ক্ষেত্রে হকদার হলো মানুষ (ফকির, মিসকিন, গারিমীন)।
  2. পশু-পাখির খাবারে হারাম মাল দেওয়া জায়েয নয়—কারণ এতে হারাম মাল ইস্তেমাল (ব্যবহার) হয়, যা নিষিদ্ধ।
  3. পশুর চিকিৎসা-খাবার হালাল মাল থেকে দেওয়া উচিত।

ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"হারাম মাল পশুকে খাওয়ানো যাবে না; কারণ তা অপচয় ও হারামের ব্যবহার।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৮)

তবে যদি কেউ হালাল মাল থেকে বিড়ালের চিকিৎসা করায়—তাতে কোনো দোষ নেই; বরং পশুর প্রতি দয়া ইসলামের শিক্ষা।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.