"যাকাত না দিলে সম্পদ হারাম হয় কি? বন্ধকি জমি থেকে খাজনা নেওয়া কি জায়েজ?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
(একজন বোনের হয়ে প্রশ্ন করছি)
প্রশ্ন ১: ওস্তাজ আমি আইওএম মাদ্রাসার একজন ত্বলিবা আলহামদুলিল্লাহ। ওস্তাজ আমরা গ্রামে থাকি গ্রামের প্রায় সকল মানুষই তেমন ইসলাম বিধি নিষেধ দ্বীন পালন করে না, আমার বাবাও যাকাত দেয় না আমি বুঝিয়েছি কিন্তু আব্বু অন্যান্য মানুষদের কথা বলে যে তারা তো আমাদের চেয়ে অধিক সম্পদের মালিক তারাও যাকাত দেয় না, আমার কথা শুনে না আব্বু, ওস্তাজ এতে যাকাত না দিলে সম্পদ কি হারাম হবে এবং আমরা কি হারাম খাচ্ছি ওস্তাজ?????
প্রশ্ন ২: এবং আব্বু নাকি আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে শুনেছে জমি বন্ধক নেয়া জায়েজ এবং যেদিন জমির মালিক টাকা ফেরত দিবে সেদিন খাজনা হিসেবে জমির মালিককে ২০০ টাকা দিলে নাকি তা জায়েয হয়, এবং আব্বু জমির মালিকের কাছে অনুমতি নেন জমিতে চাষ করে খাওয়ার,,,আমি আব্বুকে বুঝিয়েছিলাম প্রথমে বুজতে পেরে জমি বন্ধক আর নিতে চায় নি কিন্তু ইমামের কাছ থেকে এই কথা শোনার পর আবার বন্ধক নিতে চায়,,,, ওস্তাজ এটা কি জায়েজ? আমি কি করবো কিভাবে আব্বুকে বোঝালে বুঝবে বুজতে পারছি না,,,,, আমার বাবা ব্যবসা করেন এবং আমাদের কিছু নিজস্ব জমি আছে সেখানেও চাষ করেন আব্বু তো সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা কি এখন হারাম খাচ্ছি,,, হালাল, হারামের মিশ্রণ মনে হচ্ছে আমার কাছে ওস্তাজ আমি অনেক বেশি টেনশনে পেরেশানিতে আছি,,,,
প্রশ্ন ৩: ওস্তাজ আমার কিছু আগের জমানো টাকা ছিলো হাদিয়া ছিলো ওই টাকা মাদ্রাসায় দিয়েছিলাম এবং কিছু টাকা আব্বুর কাছ থেকেও নিয়ে মাদ্রাসায় দিয়েছি এখন হাসের ডিম বিক্রি টাকা মাদ্রাসায় দিচ্ছি,,, ওস্তাজ এই টাকা কি মাদ্রাসায় দিতে পারবো???বললে খুবই মুনাছিব হয় ওস্তাজ,,,,,, ওস্তাজ সমাজের মানুষের খুবই করুন অবস্থা,,,,, ওস্তাজ আমার জন্য একটু দোয়া করবেন আমি যেন আব্বুকে বোঝাতে পারি,, এবং আইওএম মাদ্রাসায় ইলমের সাথে ওস্তাজদের দোয়ার ছায়ায় যাতে থাকতে পারি,,,,ইংশাহআল্লহ,,
Answer
উত্তর: যাকাত না দেওয়া, জমি বন্ধক ও হালাল-হারামের বিধান
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দ্বীনের বুঝ দান করুন এবং আপনার আব্বুকে হেদায়েতের তাওফিক দিন। আমিন।
প্রশ্ন ১: যাকাত না দিলে সম্পদ হারাম হবে কি? আমরা কি হারাম খাচ্ছি?
বিধান:
যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করা মহাপাপ ও কবিরা গুনাহ। তবে এতে সম্পদ সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায় না,বরং যাকাতের পরিমাণ তার জিম্মায় ঋণ হিসেবে থাকবে।"
সুতরাং আপনারা হারাম ভক্ষন করছেননা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ "তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো।" (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ "যারা স্বর্ণ ও রূপা পুঞ্জীভূত করে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দাও।" (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ... "স্বর্ণ ও রূপার যে মালিক তার হক (যাকাত) আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের পাত তৈরি করা হবে..." (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৮৭)
হানাফি ফিকহের বিধান:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
الزكاة حق الله تعالى في المال، فإذا لم يؤدها كان آثماً، والمال لا يصير حراماً بكله، بل يبقى قدر الزكاة في ذمته ديناً "যাকাত হলো সম্পদে আল্লাহর হক। আদায় না করলে গুনাহগার হবে, কিন্তু সম্পদ সম্পূর্ণ হারাম হবে না; বরং যাকাতের পরিমাণ তার জিম্মায় ঋণ হিসেবে থাকবে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুয যাকাত)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
إذا وجبت الزكاة ولم يؤدها، يأثم ويطالب بها في الآخرة، ولا يحكم بحرمة ماله كله "যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পর আদায় না করলে গুনাহগার হবে এবং আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে, তবে তার সম্পূর্ণ সম্পদ হারাম বলে ফতোয়া দেওয়া হবে না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুয যাকাত)
পরামর্শ: আপনার আব্বুকে ভালোবাসা ও নম্রতার সাথে বোঝান। সরাসরি "হারাম" শব্দ ব্যবহার না করে বলুন — "আব্বু, যাকাত না দিলে কিয়ামতের দিন কঠিন হিসাব দিতে হবে, আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন।" আপনার আব্বুর জন্য দুআ করুন, কারণ হেদায়েত আল্লাহর হাতে।
প্রশ্ন ২: জমি বন্ধক নেওয়া ও খাজনা নেওয়ার বিধান
বিধান:
ইমাম সাহেবের বলা কথাটি ভুল ও ফিকহের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা যা সমাজে ছড়িয়ে আছে।
সুতরাং বন্ধক নেয়া জমি চাষ করা স্পষ্ট হারাম। ইহা হতে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
বন্ধক (রাহন) হলো ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে কোনো বস্তু রাখা। বন্ধককৃত জমি থেকে খাজনা, ফসল বা কোনো প্রকার লাভ নেওয়া ঋণদাতার জন্য হারাম — কারণ এটি সুদ (রিবা) এর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক এমন ঋণ যা লাভ টেনে আনে, তা সুদ।" (শারহু মা'আনিল আছার, ইমাম তাহাবি; মাজমাউল আনহুর)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
الرهن لا ينتفع به المرتهن، فإن انتفع به كان ربا "বন্ধককৃত বস্তু থেকে ঋণদাতা লাভ নিতে পারবে না; যদি নেয়, তবে তা সুদ হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুর রাহন)
ফাতাওয়া উসমানিতে (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.):
"বন্ধকি জমি থেকে খাজনা বা ফসল নেওয়া সুদের অন্তর্ভুক্ত। ঋণদাতা যদি জমি থেকে কোনো লাভ নেয়, তবে তা রিবা হবে।" (ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুর রাহন)
প্রশ্ন ৩: মাদ্রাসায় টাকা দেওয়ার বিধান
বিধান:
মাদ্রাসায় টাকা দেওয়া সদকা হিসেবে জায়েজ — যদি টাকাটি হালাল হয়। তবে কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে:
১. আপনার নিজের জমানো টাকা ও হাদিয়া:
আপনার নিজের হালাল টাকা মাদ্রাসায় দেওয়া জায়েজ। হাদিয়া হিসেবে পাওয়া টাকাও যদি হালাল হয়, তবে তা দেওয়া জায়েজ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً "কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, যাতে আল্লাহ তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন?" (সূরা আল-বাকারা: ২৪৫)
২. আব্বুর কাছ থেকে নেওয়া টাকা:
যদি আপনার আব্বু আপনাকে টাকা দেন এবং তা হালাল হয়, তবে তা মাদ্রাসায় দেওয়া জায়েজ। কিন্তু যদি সেই টাকায় হারামের অংশ থাকে, তবে সেই টাকা মাদ্রাসায় দেওয়া জায়েজ নয় — কারণ মাদ্রাসায় হারাম টাকা দেওয়া জায়েজ নয়। সেক্ষেত্রে উক্ত টাকা ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব মিসকিনকে দান করতে পারেন।
৩. হাসের ডিম বিক্রির টাকা:
হাসের ডিম বিক্রির টাকা হালাল — যদি হাসগুলো হালাল উপায়ে পালা হয় এবং ডিম বিক্রি হালাল হয়। এই টাকা মাদ্রাসায় দেওয়া জায়েজ।
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ:
১. আপনার আব্বুকে ভালোবাসা ও নম্রতার সাথে বোঝান — কঠোরতা করবেন না। আল্লাহ বলেন:
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا "মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।" (সূরা আল-বাকারা: ৮৩)
২. আপনার আব্বুর জন্য দুআ করুন — বিশেষ করে তাহাজ্জুদের সময়। আল্লাহ হেদায়েত দানকারী।
৩. ইমাম সাহেবকে মাহরামের মাধ্যমে বলুন — যদি তিনি সঠিক জ্ঞানী হন, তবে তিনি সংশোধন করবেন। যদি না করেন, তবে আপনার আব্বুকে বলুন: "আব্বু, আমরা অন্য বিজ্ঞ মুফতী সাহেবের কাছ থেকে ফতোয়া নিই।"
৪. আপনি নিজে দ্বীনের উপর অটল থাকুন — আপনার আব্বুর গুনাহের দায় আপনার উপর নেই। আপনি হালাল খাওয়ার চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৫. আপনার টেনশন কমিয়ে দিন — আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছেন, আল্লাহ তা দেখছেন। আল্লাহ বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
৬. আইওএম মাদ্রাসায় ইলম অর্জন চালিয়ে যান — আপনার জন্য দুআ করছি, আল্লাহ আপনাকে ইলমে নাফে ও আমলে সালেহ দান করুন। আমিন।
والله تعالى أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين