সিরাত প্রদর্শনীতে 3D মডেলে মানুষ, উট, ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণীর স্পষ্ট অবয়ব ব্যবহার জায়েজ কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6677
Questioner: Talibaaa
Question Asked: 10 Oct 2026, 01:52 PM
Reviewed & Published: 10 Oct 2026, 01:56 PM
Views: 9
Tokens: 4,553
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আজকাল বিভিন্ন সিরাত বিষয়ক প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। তো সেখানে মদিনা বা মক্কার 3D মডেল বানানো হয়। এখানে সাম্প্রতিক একটি মডেলে মানুষ ও উট ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণীর মডেল বা পুতুল স্পষ্ট অবয়বে বিদ্যমান রয়েছে। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে তা মানুষ ,উট এবং ঘোড়া। অনেকটা মূর্তির মত এগুলো। তো এই ধরনের প্রদর্শনী তে 3D মডেল হিসেবে স্পষ্ট প্রাণীর অবয়ব ব্যবহার জায়েজ কি?

Answer

প্রশ্ন: সিরাত প্রদর্শনীতে 3D মডেলে স্পষ্ট প্রাণীর অবয়ব (মানুষ, উট, ঘোড়া) ব্যবহার জায়েজ কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, জায়েজ নয়। প্রাণীর স্পষ্ট অবয়বযুক্ত 3D মডেল বা পুতুল—তা মাটি, প্লাস্টিক, কাগজ, ডিজিটাল বা যেকোনো উপাদানেরই হোক—তা ছবি/মূর্তি নির্মাণের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সিরাত প্রদর্শনী বা দ্বীনি উদ্দেশ্য হলেও এ নিষেধাজ্ঞা রহিত হয় না।


কুরআনের দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِن مَّحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ "তারা সুলাইমান (আ.)-এর জন্য তৈরি করত যা তিনি চাইতেন—মসজিদ, মূর্তি..." (সূরা সাবা: ১৩)

এখানে "তামাসীল" (মূর্তি/প্রাণীর অবয়ব) শব্দটি এসেছে। তবে উলামায়ে কেরাম বলেন, এটি সুলাইমান (আ.)-এর পূর্ববর্তী শরিয়তের বিধান ছিল; আমাদের শরিয়তে তা মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মূর্তি নির্মাণ সম্পূর্ণ হারাম ঘোষিত হয়েছে।


হাদীসের দলিল

১. কঠোর হুঁশিয়ারি

إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ "কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি/মূর্তি নির্মাণকারীরা।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৫০; সহীহ মুসলিম: ২১০৯

২. নির্মাতাকে চ্যালেঞ্জ

مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فَإِنَّ اللَّهَ يُعَذِّبُهُ حَتَّى يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ فِيهَا "যে ব্যক্তি কোনো (প্রাণীর) ছবি/মূর্তি বানায়, আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে তাতে রূহ ফুঁকে দেয়—অথচ সে কখনোই রূহ ফুঁকতে পারবে না।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৬৩; সহীহ মুসলিম: ২১১০

৩. ঘরে মূর্তি থাকলে ফেরেশতা প্রবেশ করেন না

لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ صُورَةٌ "যে ঘরে (প্রাণীর) ছবি/মূর্তি থাকে, সেখানে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৪৯; সহীহ মুসলিম: ২১০৬

৪. হাদীসে জিবরীল-এ স্পষ্ট নিষেধ

রাসূলুল্লাহ ﷺ জিবরীল (আ.)-কে বললেন:

إِنَّا لَا نَدْخُلُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ "আমরা (ফেরেশতারা) এমন ঘরে প্রবেশ করি না যেখানে কুকুর বা (প্রাণীর) ছবি থাকে।" — সহীহ বুখারী: ৩২২৫; সহীহ মুসলিম: ২১০৫


হানাফী ফিকহের দলিল

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার

وَيَحْرُمُ تَصْوِيرُ صُورَةِ حَيَوَانٍ وَإِنْ كَانَ مِنْ غَيْرِ جِنْسِهِ، سَوَاءٌ كَانَ لَهُ ظِلٌّ أَوْ لَا "প্রাণীর ছবি/মূর্তি তৈরি করা হারাম—তা যে উপাদানেই হোক, ছায়াযুক্ত (মূর্তি) হোক বা ছায়াহীন (সমতল ছবি) হোক।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৭৫ (দারুল মা'রিফা)

ইবনে আবিদীন (রহ.) আরও উল্লেখ করেন:

وَالْحَاصِلُ أَنَّ تَصْوِيرَ الْحَيَوَانِ حَرَامٌ عَلَى كُلِّ حَالٍ "মোটকথা, প্রাণীর ছবি/মূর্তি তৈরি করা সর্বাবস্থায় হারাম।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৭৫

ফাতাওয়া আলমগীরী

وَلَا يَجُوزُ تَصْوِيرُ الْحَيَوَانِ وَتَصْوِيرُ مَا لَهُ رُوحٌ "প্রাণীর এবং রূহধারী সৃষ্টির ছবি/মূর্তি তৈরি করা জায়েজ নয়।" — ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫০

ফাতাওয়া উসমানী

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"প্রাণীর ছবি বা মূর্তি তৈরি করা এবং তা প্রদর্শন করা—উভয়ই নিষিদ্ধ। দ্বীনি উদ্দেশ্যে হলেও এ বিধান পরিবর্তন হয় না।" — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৬০-৫৬৫

ইমদাদুল ফাতাওয়া

হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন:

"ছবি/মূর্তি নির্মাণের হুকুম উপাদান বা উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে না; বরং প্রাণীর অবয়ব তৈরি করা নিজেই নিষিদ্ধ।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩০


3D মডেল কি "ছবি" হিসেবে গণ্য হবে?

হ্যাঁ। আধুনিক ফিকহী গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে:

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | হাতে তৈরি মূর্তি/পুতুল | হারাম (সর্বসম্মত) | | ছায়াযুক্ত 3D মডেল | হারাম (রাদ্দুল মুহতার) | | ডিজিটাল 3D মডেল (স্ক্রিনে) | হারাম (ফাতাওয়া উসমানী, ফাতাওয়া রহীমিয়া) | | প্রাণীর স্পষ্ট অবয়বযুক্ত পুতুল | হারাম (শিশুদের খেলনার পুতুল ব্যতিক্রম) |

মূলনীতি: প্রাণীর স্পষ্ট অবয়ব থাকলে—তা মাটি, প্লাস্টিক, কাগজ, ডিজিটাল বা 3D প্রিন্ট—সবই একই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।


দ্বীনি উদ্দেশ্য কি ওজর হতে পারে?

না। কারণ:

  1. হাদীসে কোনো ব্যতিক্রম নেই — দ্বীনি বা দুনিয়াবী উদ্দেশ্যের পার্থক্য করা হয়নি।
  2. ইবনে আবিদীন (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন: "সর্বাবস্থায় হারাম"।
  3. ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি: হারাম বস্তু দ্বীনি কাজে ব্যবহার করলে তা হালাল হয় না। যেমন—চুরি করা টাকা দিয়ে মসজিদ বানানো জায়েজ নয়।
  4. শরীয়তের উদ্দেশ্য: মূর্তিপূজার দরজা বন্ধ করা এবং আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ থেকে বিরত থাকা।

বিকল্প সমাধান

সিরাত প্রদর্শনীতে প্রাণীর স্পষ্ট অবয়ব ছাড়াই দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া সম্ভব:

  1. নাম-লেবেল বা তীর চিহ্ন দিয়ে স্থান চিহ্নিত করা
  2. প্রতীকী চিহ্ন (যেমন—তাবু, পাহাড়, কূপ) ব্যবহার করা
  3. মানচিত্র ও ডায়াগ্রাম ব্যবহার করা
  4. প্রাণীর অবয়ব ছাড়া ভৌগোলিক মডেল তৈরি করা
  5. লিখিত বর্ণনা ও অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা

উপসংহার

| প্রশ্ন | উত্তর | |-------|-------| | 3D মডেলে স্পষ্ট প্রাণীর অবয়ব ব্যবহার | হারাম | | দ্বীনি উদ্দেশ্যে হলে | তবুও হারাম | | মূর্তির মতো হলে | আরও কঠোরভাবে হারাম | | বিকল্প উপায়ে প্রদর্শনী | জায়েজ |

পরামর্শ: সিরাত প্রদর্শনীর আয়োজকদের উচিত প্রাণীর স্পষ্ট অবয়বযুক্ত 3D মডেল সম্পূর্ণ পরিহার করা এবং বিকল্প প্রতীকী উপায়ে দ্বীনি শিক্ষা উপস্থাপন করা। আল্লাহ আমাদের হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.