শিশুর নজর লাগলে কী করবেন?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার মেয়ের বয়স ২৬ মাস। ও কিছুই খেতে চায় না। জিদ দেখায়। ওজনও কম। খেলেও প্রায় সময় বমি করে দেয়। আগে ঠিক ভাবে ঘুমাতো। এখন ঘুমের ঠিক নাই। ওর নজর লাগে সেটা বুঝি আমি। যেমন ওর দাদুকে একদিন বলেছিলাম বেবির দুপুরে ঘুমাতে বেশি টাইম লাগে না। এর পর থেকে আর দুপুরে ঘুমাতে চায় না। ঘুমালেও অনেক দেরি করে।
খাওয়াও সেইম, এক রাতে ওর দাদু বললো, ওকে খাইয়ে দিলেই গিলে ফেলে তাড়াতাড়ি। পরদিন ভোর থেকে বমি আর পেট খারাপ করে শেষ। ওকে নিয়মিত সকাল সন্ধ্যার আমল করে ফু দেয়া হয়। রুকাইয়ার সূরা ছেড়ে রাখা হয়। কি করবো আমি। আমার সব কিছু মিলিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি আবারও ২মাসের প্রেগন্যান্ট।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
আপনার মেয়ের বয়স মাত্র ২৬ মাস। তার খাওয়া না চাওয়া, ঘুমের অনিয়ম, খেলেই বমি করা, ওজন কমে যাওয়া — এসব শুধু নজর বা জিনের সমস্যা নয়; এগুলো শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের (pediatrician) কাছে দ্রুত দেখানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের লক্ষণ হতে পারে:
- গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা (যেমন GERD, ফুড অ্যালার্জি, ইনটলারেন্স)
- দাঁত ওঠার সমস্যা বা সংক্রমণ
- রক্তশূন্যতা বা পুষ্টির অভাব
- থাইরয়েড বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ
শরীয়তের দৃষ্টিতে চিকিৎসা করানো সুন্নাহ ও জরুরি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً» — "চিকিৎসা করো, কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার ঔষধ দেননি।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৮৫৫; সুনানে তিরমিজি ২০৩৮ — হাসান সহিহ)
তাই প্রথম কাজ ডাক্তারের কাছে যাওয়া, পাশাপাশি নিচের আমলগুলো চালিয়ে যাওয়া।
নজর সম্পর্কে শরীয়তের বিধান
ইসলামে নজর (বদনজর) সত্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْعَيْنُ حَقٌّ» — "নজর সত্য।" (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৪০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
«الْعَيْنُ حَقٌّ وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ» — "নজর সত্য; যদি কোনো কিছু তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে নজর তা করত।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৮)
তবে প্রতিটি অসুস্থতাকে নজর বলা ঠিক নয়। ইবনে আবিদিন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, অসুস্থতার কারণ নির্ণয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং চিকিৎসার পাশাপাশি দুআ-রুকইয়াহ করা — উভয়ই কাম্য। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৬৪০-এর কাছাকাছি আলোচনা)
আপনার করণীয়
১. ডাক্তারের কাছে যান
শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখান। বমি, ওজন কমা, খাওয়ায় অনীহা — এসবের শারীরিক কারণ আছে কি না পরীক্ষা করান। এটাই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
২. নিয়মিত আমল চালিয়ে যান
আপনি যে সকাল-সন্ধ্যার আমল ও রুকইয়ার সূরা পড়ে ফু দিচ্ছেন — এটি চালিয়ে যান, বরং আরও বাড়ান:
- সূরা আল-ফাতিহা (রুকইয়ার সর্বোত্তম সূরা)
- আয়াতুল কুরসি (সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৫)
- সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস (মুআওবিযাতাইন)
- সূরা আল-ইখলাস
- সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এগুলো পড়ে শরীরে ফু দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০১৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮২)
৩. সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আমল
- সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার: «بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ»
- সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার: «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ»
- সকাল-সন্ধ্যা ৭ বার: «حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ»
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮৮; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৩৮৮)
৪. বাচ্চার জন্য বিশেষ দুআ
- «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ» — "আল্লাহর পূর্ণ কালিমার মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও প্রত্যেক ক্ষতিকর নজর থেকে আশ্রয় চাই।" (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৭১)
এটি হাসান ও হুসাইনের (রা.) জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ পড়তেন।
৫. সদকা করুন
নিয়মিত সদকা করুন — কমপক্ষে প্রতিদিন কিছু টাকা বা খাবার গরিবকে দিন। সদকা বালা-মুসিবত দূর করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ» — "সদকা গুনাহকে নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভায়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৬১৬ — হাসান সহিহ)
৬. নিজের যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়ান
আপনি গর্ভবতী, তাই নিজের উপর বিশেষ যত্ন নিন। বেশি বেশি:
- কুরআন তিলাওয়াত
- দরুদ শরিফ
- ইস্তিগফার
- «لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ»
৭. বাচ্চাকে জোর করবেন না
খাওয়ানোর সময় জোর করলে বমি বাড়ে। অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ান। ডাক্তারের পরামর্শ নিন পুষ্টি সম্পর্কে।
৮. ঝাড়ফুঁক করানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা
শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ (কুরআন-সুন্নাহর দুআ ও আয়াত দিয়ে) করাতে পারেন। তবে কবিরাজ, তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁকে অশরীয়তসম্মত পদ্ধতি, জিন-শয়তানের নামে কিছু করা — সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইবনে আবিদিন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ স্পষ্ট করেছেন যে, কুরআন-সুন্নাহর বাইরে ঝাড়ফুঁক জায়েজ নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩)
আপনার কষ্টের বিষয়ে
আপনি গর্ভবতী এবং মানসিকভাবে কষ্টে আছেন — এটি স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا» — "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮৬)
আরও বলেন:
«فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا • إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا» — "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।" (সূরা আশ-শারহ, আয়াত ৫-৬)
আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, ডাক্তারি চিকিৎসা ও দুআ-রুকইয়াহ একসাথে চালিয়ে যান। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ শিফা দান করবেন।
সারসংক্ষেপ
| করণীয় | বিবরণ | |---|---| | ১ | দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান | | ২ | সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আমল চালিয়ে যান | | ৩ | সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, মুআওবিযাতাইন পড়ে ফু দিন | | ৪ | নিয়মিত সদকা করুন | | ৫ | বাচ্চাকে জোর না করে অল্প অল্প খাওয়ান | | ৬ | নিজের যিকির-তিলাওয়াত বাড়ান | | ৭ | অশরীয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক থেকে বিরত থাকুন |
আল্লাহ আপনার মেয়েকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার গর্ভকালীন সময়কে সহজ করুন। আমিন।