দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি তোলা ও পর্দার বিধান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমি আমার পরিচিত একজন স্যারের কাছে যাই,মহিলা ডাক্তার পরিচিত নেই ফলে তাদের ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহন করার সামর্থ আমার নেই।আমি নিজেও ডেন্টাল সার্জন তাই আমার জানা আছে যে এই চিকিৎসা পদ্ধতির একটা অংশ ফটোগ্রাফ।।অর্থাৎ রোগীর আগের চেহারা ও দাঁতের অবস্থার ছবি তুলে চিকিৎসা পরবর্তী পরিবর্তন বিবেচনা করা হয়।।স্যার তাই আমার চেহারার এবং দাঁতের ফটো তুলে রেখেছেন উনার মোবাইলে।কিন্তু আমার অনেক মানসিক কষ্ট হচ্ছে এই ব্যাপার টা নিয়ে৷ আমি সবসময় পর্দা করে চলি,মুখ ঢেকে রাখি,, আমি কোনভাবেই এই মানসিক যন্ত্রনা থেকে বের হতে পারছিনা।।আমি আল্লাহর কাছে কিভাবে তওবা করবো।
Answer
উত্তর: দাঁতের চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি তোলা ও পর্দার বিধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার মানসিক কষ্টের বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বিচারযোগ্য। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. মূল নীতি: পর্দার বিধান ও প্রয়োজনের ব্যতিক্রম
ইসলামে নারীর পর্দা ফরজ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
"মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে, আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা প্রকাশ্য।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
তবে ইসলাম একটি বাস্তবধর্মী দ্বীন। প্রয়োজন ও বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে শরীয়ত কিছু ছাড় দিয়েছে। ফিকহের একটি মূলনীতি হলো:
الضرورات تبيح المحظورات — "প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে।" (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, অনুচ্ছেদ ২১)
الحاجة تنزل منزلة الضرورة — "প্রয়োজনীয়তা জরুরতের পর্যায়ে নামে।" (যদি তা عام বা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়)
২. চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি তোলা — হানাফী ফিকহের বিধান
(ক) ছবি তোলার মূল বিধান
হাদীসে ছবি তৈরি সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে:
إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ
"কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি নির্মাতারা।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৫০, সহীহ মুসলিম: ২১০৯)
তবে ফটোগ্রাফি (আলো দিয়ে ছবি ধারণ) সম্পর্কে হানাফী ফকীহগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
- নিষিদ্ধ — কারণ এটি ছবি তৈরি ও সংরক্ষণের অন্তর্ভুক্ত (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩০; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, খণ্ড ২৮, পৃ. ২৪০)।
- প্রয়োজনে জায়েয — বিশেষত চিকিৎসা, শনাক্তকরণ, পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদি জরুরি প্রয়োজনে (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৬০৮-৬১০; আহকামে ফটোগ্রাফি, মুফতি তাকী উসমানী)।
(খ) চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি তোলা
ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) স্পষ্ট করেছেন:
চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনে, বিশেষত যখন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অগ্রগতি পরিমাপের জন্য ছবি অপরিহার্য, তখন তা জায়েয। তবে শর্ত হলো: ১. ছবি তোলা ও দেখা শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকবে। ২. অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শন ও সংরক্ষণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ৩. সম্ভব হলে একই লিঙ্গের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৬০৯-৬১০)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"চিকিৎসার প্রয়োজনে ছবি তোলা অনুমোদনযোগ্য, কারণ এটি সরাসরি ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্যে নয়, বরং চিকিৎসার একটি উপকরণ।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩২)
(গ) মহিলার চিকিৎসার জন্য পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
المرأة إذا لم تجد طبيبة امرأة واضطرت إلى الطبيب الرجل جاز لها ذلك بشرط أن يكون بحضور محرم وأن لا يخلو بها
"মহিলা যদি মহিলা চিকিৎসক না পায় এবং পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে বাধ্য হয়, তবে তা জায়েয — শর্ত হলো মাহরামের উপস্থিতি এবং নির্জনে না থাকা।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮)
আপনার জেলায় যদি অভিজ্ঞ মহিলা ডেন্টাল সার্জন না থাকে,
সেক্ষেত্রে প্রয়োজনের ভিত্তিতে** পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং চিকিৎসার অংশ হিসেবে ছবি তোলা শরীয়তসম্মত।
অন্যথায় এটি জায়েজ নেই।
৩. তবে আপনার মানসিক কষ্ট ও পর্দার বিষয়টি
আপনার মানসিক কষ্টের মূল কারণ দুটি:
- ছবি চিকিৎসকের মোবাইলে সংরক্ষিত থাকা — যা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
- আপনি সর্বদা পর্দা করেন, মুখ ঢেকে রাখেন — তাই এই ব্যতিক্রম আপনার জন্য কঠিন।
সমাধান ও পরামর্শ:
ক. চিকিৎসকের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করুন যে, চিকিৎসা শেষে আপনার ছবিগুলো মুছে ফেলার জন্য। এটি আপনার অধিকার। চিকিৎসক যদি মুসলিম হন, তবে তিনি অবশ্যই সম্মান করবেন।
খ. যদি সম্ভব হয়, ছবি তোলার সময় শুধু মুখমণ্ডল ও দাঁতের প্রয়োজনীয় অংশ যেন তোলা হয়, সম্পূর্ণ চেহারা নয় — এটিও শরীয়তের দৃষ্টিতে আরও সংযত।
গ. ভবিষ্যতে সম্ভব হলে মহিলা চিকিৎসক বা অনলাইন কনসালটেশন-এর ব্যবস্থা নিন, যেখানে আপনি নিজেই ছবি তুলে পাঠাতে পারেন এবং চিকিৎসক আপনার ছবি সংরক্ষণ না করার শর্তে চিকিৎসা দিতে পারেন।
ঘ. আপনার মানসিক কষ্টের বিষয়টি অতিরঞ্জিত ওয়াসওয়াসা-ও হতে পারে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মূলনীতি:
الوسواس لا يلتفت إليه في العبادات والمعاملات — "ইবাদত ও লেনদেনে ওয়াসওয়াসার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না।"
আপনি শরীয়তের অনুমোদিত একটি কাজ করেছেন — চিকিৎসার প্রয়োজনে। এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই ইনশাআল্লাহ।
৪. তওবা কীভাবে করবেন?
যদিও আপনার কাজটি শরীয়তসম্মত ছিল, তবুও আপনি যদি মনে করেন যে কোনো সীমালঙ্ঘন হয়েছে বা সন্দেহ রয়েছে, তবে তওবার পদ্ধতি:
(ক) তওবার শর্ত (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী):
- অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া (নাদামাত)।
- ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প।
- যদি কারো হক নষ্ট হয়, তা ফিরিয়ে দেওয়া — এখানে কারো হক নষ্ট হয়নি।
- যদি আল্লাহর হক হয়, তবে ইস্তিগফার।
(খ) তওবার দুআ:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
"হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৬, সুনানে তিরমিযী: ৩৪৩৪)
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
"আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক, এবং আমি তাঁর কাছে তওবা করছি।"
(গ) নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ:
- সালাতুল তওবা (তওবার নামাজ) — ২ রাকাত পড়ে দুআ করা।
- সাদাকাহ — সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা।
- ইস্তিগফার — বেশি বেশি "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলা।
- দরুদ শরীফ — বেশি বেশি পড়া।
আল্লাহ তা'আলা আপনার মানসিক কষ্ট দূর করুন, আপনার পর্দা রক্ষা করুন এবং আপনার চিকিৎসা সহজ করুন। আমীন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ