স্বপ্নে স্বর্ণের চেইন পড়িয়ে দেওযার ব্যখ্যা কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.আমি স্বপ্নে দেখি এমন– সৌদি কোনো শায়েখের মতো একজন ব্যক্তি আমার জাওজকে স্বর্ণের বড় একটা চেইন পড়িয়ে দিচ্ছেন৷ চেইনটা স্বাভাবিকের মতো ছোট না, লম্বাতে এমন বড় যে দুইটা প্যাচ দিয়ে পড়তে হচ্ছে তবুও প্রায় পেট অব্ধি হচ্ছে। আর হালকা না অনেকটাই ভারী৷ আমার জাওজ সম্মানের খাতিরে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে গ্রহণ করলেন তারপর স্বর্ণ ছেলেদের যে হারাম এইটা ভেবে সাথে সাথেই উনি খুলে ফেলেছেন। সাথে আরো একটা এমন খুবই সুন্দর হারের মতো হাদিয়া দিচ্ছেন। আমি বলছি এমন তো আমার আছে, পরে ভালো করে দেখে বলছি, না এটা তো আমারটা থেকে ভারী, অনেক সুন্দর৷ আমার জাওজ এত আগ্রহ করছেন না কিন্তু আমি খুবই খুশি হচ্ছি। অনেকটা এমন বলতেছি যে, উনাকে দিচ্ছে আসলে তো এগুলো আমারই হবে। তারপরে আরো একটা ব্রেসলেট টাইপের চুড়ি, আংটি এনেছেন। আংটি অথবা চুড়ি এরমধ্যে যেকোনো একটা অন্য কোন ব্যাগে রেখেছেন খুঁজতে বলছেন ওই শায়েখ। আর উনি শুধু আরবিই বুঝেন, ইংরেজি বুঝেননা আর এজন্য আমি খুব কথা বলতে চাচ্ছি কিন্তু কোনো কথাই বলা হচ্ছেনা তবে উনি খুব হাসি হাসি মুখে হাসছেন। তারপর আমার মামিকে দেখলাম, আমরা কোথায় যেন বের হচ্ছি লাগেজ গুছিয়ে। মামি বলছেন, এগুলো ভালোভাবে খুব সাবধানতার সাথে ব্যাগে নাও।
স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে দেখছি ফোনে ফজরের আযান দিচ্ছে, ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। কন্সিভ করেছি জানার খুব সম্ভবত একদিন পরেই এমন স্বপ্ন দেখি।
২.এর একদিন পরেই দেখি– আমার আপন ছোট খালামনি মারা গিয়েছেন এমন। অথচ উনি জীবিত কিন্তু অনেক অসুস্থই থাকতেন। বর্তমানে বেশ ভালো, একদম সুস্থ আছেন আলহামদুলিল্লাহ। ওইরাতেই এর সাথে আবার বিচ্ছিন্নভাবে আমার ননদের ব্যাপারেও দেখি কিন্তু উনি মারা গিয়েছেন কিনা স্বপ্নে এটা সঠিক মনে করতে পারছিনা।
৩.আবার, খুব সম্ভবত ২/৩ দিন পরেই অসুস্থ ছিলাম, চেক আপের জন্য বাবার বাসায় আসি আর ওইদিন একাই ঘুমিয়েছিলাম তো স্বপ্নে দেখি– আমার এক চাচাতো দাদা, যিনি অনেক বছরই হবে মারা গিয়েছেন। আমার এক বান্ধবী মিলে আসছি, তো আমাদের প্রাইমারি টিচার বাসার কাছেরই খুব ক্লোজ একজন ম্যামও ওই গাড়িতে উঠেছেন আর সামনের দিকে বসে যান। তো আমি মুখে বলিনি আমার বাবু হবে, শুধু বললাম যে একটু মাঝের দিকে বসি আমার ঝাকি লাগবে। পরে পিছনেই বসে যাই, আর সাথে সাথে দেখছি আবার বাসার সামনের দিকে এসে গিয়েছি তখনই বলে আমি নেমে যাই৷ আর সেই বান্ধবীরই দাদা, যিনি আমারও সম্পর্কে চাচাতো দাদা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু একটা চাচ্ছেন। টাকা বা খাবার এমন কিছু, নির্দিষ্ট মনে নেই। উনার চোখগুলো কেমন জ্বলজ্বল করছিলো কিন্তু বাকিটা দেখতে আগের মতোই অনেকটা। আমি খুব ভয় পেয়ে দ্রুত হেটে বাসার দিকে চলে আসছি যে উনি অন্যদিকে বা অন্য কারো দিকে চলে যাক কিন্তু উনি আমার পিছে পিছেই আসছেন সেই হাত বাড়িয়ে। আমি আমাদের বাসায় ঢুকেই একদম দরজা লাগিয়ে দিচ্ছি। এই স্বপ্ন দেখেও খুব ভয় পাই প্রায় রাত ২.৩০ বাজে এমন হবে। আমি এমনিতেই একা ঘুমাতে পারিনা স্বপ্ন দেখে প্রায়শই চিল্লানি দিয়ে উঠি এজন্য একা ঘুমাতে দেয়না কেউ কিন্তু ওইদিন খুব ভয় পেয়ে পরে আম্মুর রুমে চলে যায়।
এই স্বপ্নগুলো ব্যাখ্যা দিবেন প্লিজ ইন শা আল্লহ।
আর আমার শারীরিক হালতও যেহেতু একটু খারাপ, কন্সিভ করেছি স্বপ্নগুলো এদিকে কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা এজন্য চিন্তিত। এছাড়া আমার সালাত, আমলের ব্যাপারেও খুবই চিন্তিত। কোনভাবেই আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আনতে পারছিনা, ইমান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে খুব বেশি। নেক সোহবতে থাকলে একটু ঠিক হয়, তালিমে যেয়ে খুব নিয়ত করি বাসায় থেকেও সেভাবে চলব কিন্তু যেভাবে চাচ্ছি পাকাপোক্তভাবে হয়েই উঠছেনা। অন্তরের রোগও জেকে বসেছে। জাওজের সাথে প্রায়ই গলা উঁচু করে কথা হয় নানান বিষয়াদির জন্য৷ যত যা কিছুই হয়ে যাক আমি সবর করতে চাই, রব্বের উপর তাওয়াক্কুল রাখতে চাই কিন্তু পারিনা। আমাকে প্লিজ কিছু নাসীহাহ দিবেন উস্তায ইন শা আল্লহ।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই বলব, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি বিশেষ জ্ঞানের বিষয় এবং এটি সরাসরি কুরআন-হাদীসের আলোকে দেওয়া যায় না। তবে কিছু সাধারণ নিয়ম আছে। আপনার বর্ণিত স্বপ্নগুলো এবং বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে নিম্নোক্ত পরামর্শ দেওয়া হলো:
১ম স্বপ্নের ব্যাখ্যা (স্বর্ণের চেইন ও হাদিয়া):
- স্বপ্নে স্বর্ণ দেখা সাধারণত দুনিয়াবি সম্পদ, চিন্তা, বা সন্তানের ইঙ্গিত বহন করে। যেহেতু আপনি গর্ভধারণ করেছেন (উল্লেখ করেছেন "কন্সিভ করেছি"), এই স্বপ্নটি সম্ভবত আপনার সন্তানের কল্যাণ এবং ভবিষ্যতের বরকত নির্দেশ করে।
- স্বর্ণের চেইন ভারী ও লম্বা হওয়া = সন্তানের প্রতি আপনার দায়িত্ব ও ভালোবাসার ভারীতা।
- আপনার জাওজ স্বর্ণ খুলে ফেলা = তিনি দুনিয়াবি জিনিসকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, বরং দ্বীনের পথে চলতে চান। এটি সন্তানের জন্য একটি ভালো পরিবেশের ইঙ্গিত।
- আপনি যেভাবে ওই উপহারগুলোকে নিজের বলে মনে করছেন = এটি সন্তান লাভের সুসংবাদ (যদি হন গর্ভবতী) অথবা ভবিষ্যতে এমন কোনো উপহার/সম্পদ আসতে পারে।
- মামির কাছে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার নির্দেশ = অর্জিত জিনিস সংরক্ষণের তাগিদ, অর্থাৎ সন্তানের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা।
হাদীস থেকে:
- স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের ভীতি, (৩) মনের কল্পনা। (বুখারী, মুসলিম)
- আপনার স্বপ্নটি সুসংবাদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ আপনি ঘুম ভেঙে ফজরের আযান শুনেছেন (শেষ রাতে বা ফজরের সময়ের স্বপ্ন প্রায়শই সত্য হয়)।
২য় স্বপ্নের ব্যাখ্যা (খালা ও ননদের মৃত্যু):
- জীবিত মানুষকে মৃত দেখা সাধারণত তাদের দীর্ঘায়ু বা রোগমুক্তির ইঙ্গিত বহন করে। যেহেতু খালা বর্তমানে সুস্থ আছেন, এটি তার সুস্থতা অব্যাহত থাকার সুসংবাদ।
- ননদের ব্যাপারে অস্পষ্ট স্মৃতি = হয়তো তার ব্যাপারে কোনো দুশ্চিন্তা বা সম্পর্কের উন্নতির প্রয়োজন। বাস্তবে তার খোঁজখবর নিন।
৩য় স্বপ্নের ব্যাখ্যা (মৃত চাচাতো দাদার ভয় দেখানো):
- মৃত ব্যক্তিকে কিছু চাইতে দেখা = সাদাকা ও দোয়ার প্রয়োজন। আপনার ঐ দাদা (মাগফিরাতের জন্য) আপনার কাছে সাদাকা চেয়েছেন।
- আপনি ভয় পেয়ে দরজা লাগানো = দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকার ইঙ্গিত, তবে পেছনে ফিরে সাদাকা দেওয়া জরুরি।
- সমাধান: আপনি বা আপনার পরিবার তার নামে সাদাকা (টাকা, খাবার) করুন। মৃতের জন্য সূরা ইখলাস, ফাতিহা পড়ে দোয়া করুন।
আপনার বর্তমান অবস্থার জন্য বিশেষ নাসীহাহ:
আপনি উল্লেখ করেছেন ইমানে দুর্বলতা, সালাতে সময়মতো না আসা, জাওজের সাথে কথা কাটাকাটি। এটি শয়তানের কাজ। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আমল করুন:
১. ইমান শক্তিশালী করার উপায়:
- ছোট ছোট আমল শুরু করুন: ফজরের নামাজ ঠিক সময়ে পড়া, সূরা ইখলাস ও কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক ইত্যাদি পড়া।
- কালেমা ও দরূদ শরীফ বেশি পড়ুন: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু" ও "আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদ" দিনে ১০০ বার।
- কুরআনের অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন, বিশেষ করে সূরা ইনশিরাহ, সূরা ফাতিহা।
২. স্বামীর সাথে সম্পর্কের উন্নতি:
- গলা না উঁচু করার নিয়ত করুন। যদি রাগ আসে, চুপ থাকুন বা অযু করুন।
- সালাম ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "সবচেয়ে ভালো মুসলিম সেই যে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করে।" (তিরমিযী)
- দাম্পত্য কলহের সময় একটি আয়াত মনে রাখুন: "যদি তোমরা স্ত্রীদের সাথে বাজে ব্যবহার করো, তবে তাওয়াক্কুল করে আল্লাহর উপর ভরসা করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
৩. গর্ভাবস্থায় সতর্কতা:
- আপনার স্বপ্ন ও দুর্বলতা গর্ভাবস্থার সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত তিলাওয়াত ও দোয়া করুন: "রব্বি হাবলি মিনাস সা-লিহীন" (সূরা সাফফাত: ১০০) সন্তানের জন্য পড়ুন।
- শয়তানের ভয় থেকে বাঁচতে আয়াতুল কুরসি ও চার কুল পড়ে ঘুমান।
৪. স্বপ্নের জন্য সতর্কতা:
- স্বপ্ন দেখে ভয় পেলে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম" পড়ুন। (বুখারী)
- মৃত ব্যক্তির জন্য সাদাকা ও দোয়া করতে ভুলবেন না।
সঠিক হানাফি ফতোয়া ও রেফারেন্স:
- ইবনে আবেদীন (রাদ্দুল মুহতার) তে এসেছে: স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে গেলে স্বপ্নদ্রষ্টার অবস্থা ও সময় বিবেচনা করতে হবে। আপনার স্বপ্নগুলো ফজরের সময় হওয়ায় সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্য হয়।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে বলা হয়েছে: স্বর্ণের চেইন পরা স্ত্রীর জন্য সন্তানের সুসংবাদ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি শফী) তে এসেছে: স্বপ্নে জীবিত ব্যক্তির মৃত্যু দেখলে তার জন্য দীর্ঘায়ুর দোয়া করতে হবে।
চূড়ান্ত পরামর্শ:
আপনার বর্তমান দুর্বলতা সাময়িক। গর্ভাবস্থায় অনেক নারীরই ইবাদতে অলসতা আসে। তাই ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল সহকারে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। প্রতিদিন অন্তত ৫ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করুন। স্বামীর সাথে সুসম্পর্কের জন্য দু’জনে মিলে নামাজের জামাআত করার চেষ্টা করুন।
শেষে এই দোয়া পড়ুন:
"রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়াতিনা কুররাতা আ’ইউনিন ওয়াজ্আলনা লিল-মুত্তাকীন ইমামা" (সূরা ফুরকান: ৭৪)
والله أعلم بالصواب