কুরআন পড়ার পর সেই খাটে শোয়া যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ঘরের মেঝেতে বা খাটে বসে কুরআন পড়ার পর সেই খাটে শোয়ার হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্ন হলো—ঘরের মেঝেতে বা খাটে বসে কেউ কুরআন তিলাওয়াত করলে, সেই খাটে শোয়া যাবে কি? এ ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, শোয়া যাবে। কুরআন পড়ার কারণে খাট বা মেঝে অপবিত্র (নাপাক) হয় না, এবং তা নিষিদ্ধও হয় না। কুরআন তিলাওয়াত একটি ইবাদত, যা স্থানকে অপবিত্র করে না; বরং স্থানকে বরকতময় করে। তবে কুরআন পড়ার সময় আদব-শিষ্টাচার রক্ষা করা কর্তব্য।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূলনীতি: কুরআন পড়া স্থানকে নাপাক করে না
কুরআন তিলাওয়াত একটি পবিত্র ইবাদত। এটি পাঠ করার দ্বারা স্থান, খাট, বিছানা বা মেঝে কোনোভাবেই নাপাক হয় না। ফিকহের মূলনীতি হলো—
الأصل في الأشياء الطهارة "প্রত্যেক বস্তুর মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা।"
অর্থাৎ কোনো বস্তুকে নাপাক বলার জন্য দলিল প্রয়োজন। কুরআন পড়ার কারণে খাট নাপাক হওয়ার কোনো দলিল নেই। সুতরাং সেই খাটে শোয়া, ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়া সম্পূর্ণ জায়েয।
২. কুরআন পাঠের আদব
যদিও খাটে শোয়া জায়েয, তবে কুরআন পাঠের সময় নিম্নলিখিত আদব রক্ষা করা উচিত:
- পবিত্র অবস্থায় থাকা: সম্ভব হলে অজু করে পড়া উত্তম।
- সম্মানজনক অবস্থানে বসা: কুরআনকে সম্মান দেখিয়ে বসা।
- মনোযোগ সহকারে পড়া: অমনোযোগী হয়ে পড়া উচিত নয়।
- কুরআন রাখার স্থান: কুরআন শরিফ উঁচু ও সম্মানজনক স্থানে রাখা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا "আর কুরআন পড়ো সুস্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে।" (সূরা মুযযাম্মিল: ৪)
৩. খাটে শোয়ার বিধান
খাটে বসে কুরআন পড়ার পর সেই খাটে শোয়া বা ঘুমানো—
- জায়েয ও বৈধ। এতে কোনো গুনাহ নেই।
- খাট নাপাক হয় না, তাই শোয়ার আগে ধোয়া বা পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।
- যদি কেউ কুরআন পড়ার সময় মুখ থেকে লালা বা থুতু খাটে পড়ে, তবে তা নাপাক নয়; শুধু পরিষ্কার করে নেওয়া উত্তম।
৪. ফিকহি দলিল
রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, কুরআন পাঠ বা যিকিরের কারণে স্থান নাপাক হয় না। ইবাদতের স্থান বরং বরকতময় হয়।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে—
কুরআন পাঠের স্থান পবিত্র থাকে; তিলাওয়াতের কারণে কোনো বস্তু নাজিস (অপবিত্র) হয় না।
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন—
কুরআন পড়ার পর সেই স্থানে শোয়া-বসা, ঘুমানো সবই জায়েয। কুরআনের আদব হলো পড়ার সময় সম্মান রক্ষা করা, পড়ার পর স্থানকে নাপাক মনে করা নয়।
৫. বিশেষ সতর্কতা
যদিও খাটে শোয়া জায়েয, তবে নিম্নলিখিত বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত:
- কুরআন শরিফের সম্মান: কুরআন শরিফ যেন খাটের নিচে বা অপমানজনক স্থানে না থাকে।
- পায়ের দিক: কুরআন শরিফের দিকে পা প্রসারিত করে শোয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম, যদিও তা হারাম নয়।
- নাপাক অবস্থায়: যদি খাটে নাপাকি (যেমন বাচ্চার প্রস্রাব) লেগে থাকে, তবে তা পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি—এটি কুরআন পড়ার কারণে নয়, বরং নাপাকির কারণেই।
- কুরআন পড়ার সময়: কুরআন পড়ার সময় খাটে শোয়া অবস্থায় পড়া যায়, তবে বসে পড়া উত্তম।
উপসংহার
ঘরের মেঝেতে বা খাটে বসে কুরআন পড়ার পর সেই খাটে শোয়া সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ। কুরআন তিলাওয়াত স্থানকে নাপাক করে না; বরং স্থানকে বরকতময় করে। তবে কুরআনের আদব হিসেবে সম্মান রক্ষা করা, পবিত্র অবস্থায় পড়া এবং কুরআন শরিফ উঁচু স্থানে রাখা কর্তব্য।