স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য মেয়ের সাথে ভিডিও কলে অনৈতিক কাজ করা কি জিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এতে কি তার দীর্ঘদিনের আমল নষ্ট হবে? সে দল্যে দোয়া গুলো করে আসতেছে সেগুলা নষ্ট হবে,সেগুলা কি কবুল হবে না?? এরপর থেকেই তার দোয়া কি কবুল হবে, দোয়া করতে গেলেই মনে হয় আমি বড় পাপ কাজ করলাম।এখন কি হবে। এখন কি করা উচিত
Answer
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত কাজ (স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য মেয়ের সাথে ভিডিও কলে অশ্লীল/অনৈতিক কাজ) হুবহু হাদ্দযোগ্য জিনা (ব্যভিচার) হিসেবে প্রমাণিত হবে না, তবে তা হারাম, ফাহিশা ও জিনার সমতুল্য বা জিনার দিকে নিয়ে যাওয়া কবিরা গুনাহ। এটি থেকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে। প্ল্যাটফর্মে বলা মানে শরয়ী সাক্ষী হওয়া নয়; শরয়ী সাক্ষী হলো চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ, যারা সরাসরি জিনার ঘটনা দেখবে। দোয়া-আমল নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন: কবিরা গুনাহ তাওবা ছাড়া আমল বরবাদ করতে পারে, তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন এবং আমল ফিরে আসে। হতাশ হওয়া যাবে না; বরং তাওবা, ইস্তিগফার, নামাজ, সৎ সঙ্গ ও হারাম সম্পর্ক ত্যাগ করা উচিত।
১) এটি কি জিনা বা ব্যভিচার হবে?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
জিনার শরয়ী সংজ্ঞা হলো—পুরুষের লিঙ্গ নারীর গোপনাঙ্গে প্রবেশ করা, যা বিবাহ ছাড়া হয়। এতে হাদ্দ (শরয়ী শাস্তি) প্রমাণিত হয় চারজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী বা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“তোমরা জিনার কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।”
(সূরা আল-ইসরা: ৩২)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ
“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো।”
(সূরা আন-নূর: ২)
ফিকহি ব্যাখ্যা:
ভিডিও কলে পরস্পর দেখা, কথা বলা, উত্তেজনার সাথে অশ্লীল কাজ করা—এগুলো যিনার মূল কাজ নয়, বরং যিনার ভূমিকা/মুকাদ্দিমা। একে ফিকহের পরিভাষায় বলা হয় “যিনার দিকে নিয়ে যাওয়া হারাম কাজ”। এটি কবিরা গুনাহ, তবে এর দ্বারা হাদ্দে জিনা ওয়াজিব হয় না।
হানাফি কিতাবের বক্তব্য:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): “যিনার হাদ্দ প্রমাণিত হয় শুধু ওয়াতি (প্রবেশ) দ্বারা, আর তা প্রমাণিত হয় চার সাক্ষী বা স্বীকারোক্তি দ্বারা।”
- আল-হিদায়া: “জিনার হাদ্দের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আবশ্যক।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি: “চার সাক্ষী ছাড়া জিনার হাদ্দ প্রমাণিত হয় না।”
তাই ভিডিও কলে অনৈতিক কাজ জিনা হিসেবে শরয়ীভাবে প্রমাণিত হবে না, কিন্তু গুনাহ হিসেবে তা জিনার সমান বা তার চেয়ে কম নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ
“চোখের জিনা হলো দেখা, কানের জিনা হলো শোনা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৭; মুসনাদে আহমাদ)
ইমাম তহাবি (রহ.) শরহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেন, এ ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জিনা মাজাজি জিনা, যা হারাম ও গুনাহ, কিন্তু হাদ্দ নয়।
২) প্ল্যাটফর্মে বললে কি সাক্ষী থাকলো?
উত্তর: না।
শরয়ী সাক্ষী হওয়ার জন্য শর্ত:
- চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম, ন্যায়পরায়ণ পুরুষ।
- তারা সরাসরি জিনার ঘটনা (প্রবেশ) দেখবে।
- সাক্ষীরা একই সময়, একই ঘটনা, একই বিবরণ দেবে।
- কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা থাকবে না।
হানাফি কিতাব:
- আল-হিদায়া: “জিনার হাদ্দের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আবশ্যক।”
- রাদ্দুল মুহতার: “নারীদের সাক্ষ্য জিনার হাদ্দে গ্রহণযোগ্য নয়।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি: “চার পুরুষ সাক্ষী ছাড়া জিনার প্রমাণিত হয় না।”
প্ল্যাটফর্মে কেউ বলা বা অনলাইনে জানানো শরয়ী সাক্ষ্য নয়। এটি শুধু গুনাহের স্বীকারোক্তি বা প্রচার হতে পারে, যা আরও গুনাহ। তাই এ ধরনের কথা প্রকাশ করা উচিত নয়; বরং আল্লাহর কাছে গোপন রাখা ও তাওবা করা উত্তম।
৩) দীর্ঘদিনের আমল ও দোয়া কি নষ্ট হবে?
মূলনীতি:
- কবিরা গুনাহ তাওবা ছাড়া আমল নষ্ট করতে পারে, বিশেষ করে যদি তা ইখলাস ও তাকওয়া নষ্ট করে।
- কিন্তু তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফ করেন এবং আমল ফিরিয়ে দেন।
- আল্লাহ বলেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَىٰ
“নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল তার জন্য যে তাওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং হেদায়েত লাভ করে।”
(সূরা ত্বা-হা: ৮২)
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ শিরক ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ তিনি যাকে চান ক্ষমা করেন।”
(সূরা আন-নিসা: ৪৮)
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
“গুনাহ থেকে তাওবাকারী এমন, যেন তার কোনো গুনাহ নেই।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০; মিশকাত)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: “তাওবা সহিহ হলে পূর্বের গুনাহ মাফ হয় এবং আমল বরবাদ হয় না; বরং নেকি ফিরে আসে।”
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন: “কবিরা গুনাহের পর তাওবা করলে আল্লাহর রহমতে আমল নষ্ট হয় না; তবে শর্ত হলো—অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ ত্যাগ করা, আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা।”
তবে যদি কেউ গুনাহকে হালাল মনে করে বা তাওবা না করে, তাহলে আমল নষ্ট হতে পারে। আর দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ হতে পারে: হারাম উপার্জন, হারাম কাজ, দোয়ায় জবাব দেরি, বা আল্লাহর হিকমত।
৪) এখন কী করা উচিত?
ধাপে ধাপে করণীয়:
-
সাথে সাথে তাওবা করুন:
- অন্তর থেকে অনুতপ্ত হোন।
- ভিডিও কল, চ্যাট, অশ্লীল সম্পর্ক সম্পূর্ণ ত্যাগ করুন।
- ওই মেয়ের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করুন।
- স্ত্রীর হক আদায় করুন, তাকে ভালোবাসুন, সময় দিন।
-
ইস্তিগফার ও দোয়া:
- বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ুন।
- সাইয়েদুল ইস্তিগফার পড়ুন।
- নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ পড়ুন।
-
কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচার ব্যবস্থা:
- মোবাইল/ইন্টারনেটে অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকুন।
- প্রয়োজনে ফোনে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, অ্যাপ ব্লক করুন।
- সৎ সঙ্গী বাছাই করুন।
- চোখের হেফাজত করুন।
-
দোয়া কবুলের জন্য শর্ত:
- হারাম উপার্জন বর্জন।
- হালাল খাবার।
- দোয়ায় অস্থির না হওয়া।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
-
আত্মবিশ্বাস রাখুন:
- শয়তান হতাশা দেয়। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া হারাম।
- আল্লাহ বলেন:
لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
“আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
(সূরা আয-যুমার: ৫৩)
-
প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন:
- স্থানীয় মুফতি বা বিশ্বস্ত আলেমের সাথে দেখা করে বিস্তারিত পরামর্শ নিন।
- স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করুন।
৫) সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | ভিডিও কলে অনৈতিক কাজ কি জিনা? | হুবহু হাদ্দযোগ্য জিনা নয়, তবে হারাম ও জিনার সমতুল্য কবিরা গুনাহ। | | প্ল্যাটফর্মে বললে সাক্ষী হবে? | না, শরয়ী সাক্ষী হতে চারজন পুরুষ সাক্ষী লাগে। | | দীর্ঘদিনের আমল নষ্ট হবে? | তাওবা করলে নষ্ট হবে না; তাওবা ছাড়া বিপদ। | | দোয়া কবুল হবে? | তাওবা, হালাল উপার্জন ও ইখলাসের সাথে দোয়া করলে ইনশাআল্লাহ কবুল হবে। | | এখন কী করবে? | তাওবা, ইস্তিগফার, হারাম সম্পর্ক ত্যাগ, স্ত্রীর হক আদায়, সৎ সঙ্গ, নফল ইবাদত। |
মনে রাখবেন: আল্লাহর রহমত অসীম। শয়তান আপনাকে হতাশ করতে চায়। আপনি যদি আন্তরিক তাওবা করেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন এবং আপনার আমল ও দোয়া কবুল করবেন। ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।