১১বছর বয়সী ছোট ভাইকে ৩দিনের তাবলীগে পাঠানো ঠিক হবে কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার ১১ বছর বয়সী ছোট ভাই ৩দিনের তাবলীগে যেতে চাচ্ছে। আমার মা যেতে দিচ্ছে না। আমার মায়ের দ্বীনের বুঝ নেই। আমার বাবা নেই।আমার ছোট আরেকটি ১৬বছর বয়সী ভাই আছে ওকে তাবলীগে যেতে বললে ও যায় না।আমার ১১ বছর বয়সী ছোট ভাইটা নামাজ পড়ে।ওকে শুরুতে ইসলাম মেনে চলার কথা বললে তখন আমার কথা শুনতো।অনেকটা ইসলাম মেনে চলতো।কিন্তু এখন অতো মানে না।আগের থেকে অনেকটা খারাপ হয়ে গেছে।ওর দ্বীনি কোনো বন্ধু বা সার্কেল নেই।তাই আমি চাচ্ছিলাম যে,ওই একটু তাবলীগে যাক।যদি এতে একটু ভালো হয়।
১)উপরে বর্ণিত কারণে সাড়ে ১১বছর বয়সী আমার ভাইকে তাবলীগে পাঠানোটা কি ঠিক হবে?
২) আমার মা তো তাবলীগে যেতে দিতে চায় না। এক্ষেত্রে মায়ের কথা অমান্য করা কি ঠিক হবে?
৩)আমি উপরে বর্ণিত কারণে আমার ভাইকে তাবলীগে পাঠাতে চাচ্ছি এক্ষেত্রে মায়ের কথা অমান্য করা কি ঠিক হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশদ উত্তর প্রদান করা হলো।
১) ১১ বছর বয়সী ভাইকে তাবলীগে পাঠানো কি ঠিক হবে?
উত্তর: ১১ বছর বয়সী শিশু শরীয়তের দৃষ্টিতে নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক)। তবে তাকে তাবলীগের মতো নেক কাজে পাঠানো যদি নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করে, তবে তা জায়েয হবে:
- শিশুটি নিজে আগ্রহী ও সক্ষম হয়।
- তার নিরাপত্তা ও খেদমতের জন্য কোনো বয়স্ক মাহরাম (যেমন: বাবা, চাচা, বড় ভাই) সঙ্গী থাকে।
- এটি তার দ্বীনি শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।
আপনার বিবরণ অনুযায়ী, ভাইটি নামাজ পড়ে এবং তাবলীগে যেতে আগ্রহী। তবে তার জন্য বয়স্ক মাহরাম সঙ্গী না থাকলে এবং মায়ের অনুমতি না থাকলে একা পাঠানো ঠিক হবে না। কারণ নাবালেগের সফর নিরাপত্তাহীনতায় পরিণত হতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন:
"নাবালেগের সফর বৈধ নয়, যদি না কোনো বয়স্ক অভিভাবক সঙ্গী থাকে।"
(الهداية، كتاب الحظر والإباحة، فصل في السفر)
২) মায়ের কথা অমান্য করা কি ঠিক হবে?
উত্তর: পিতামাতার আনুগত্য ফরজ (ওয়াজিব), তবে তা গুনাহের কাজে নয়। তাবলীগে যাওয়া নফল ইবাদত। তাই মা যদি দ্বীনদার না হন এবং অহেতুক বাধা দেন, তবুও তার অনুমতি ব্যতীত সন্তানের জন্য বের হওয়া জায়েয নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا"
"আমি মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আনকাবুত: ৮)
ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.) ও হানাফী ফুকাহারা বলেছেন:
"পিতামাতার অনুমতি ব্যতীত নফল নামায, রোযা বা তাবলীগের জন্য বের হওয়া জায়েয নয়, যদি তাদের কষ্ট হয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬:৪১৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৯)
সুতরাং মায়ের কথা অমান্য করা জায়েয নয়। বরং তাকে বুঝিয়ে বা অন্যায় বাধা দিলে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দোয়া করতে হবে।
৩) মায়ের অনুমতি ছাড়া ভাইকে তাবলীগে পাঠানো কি ঠিক হবে?
উত্তর: আপনি বড় ভাই হলেও আপনি তার অভিভাবক নন। অভিভাবক হলেন মা (যেহেতু বাবা নেই)। তাই মায়ের অনুমতি ছাড়া আপনার ভাইকে পাঠানো গুনাহের কাজ হবে। এটি মায়ের হক নষ্ট করার শামিল। হাদীসে এসেছে:
"لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ"
"সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ব্যাপারে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসলিম)
তবে এখানে তাবলীগ নাফরমানী নয়, বরং নেক কাজ। তাই মায়ের অনুমতি আবশ্যক।
পরামর্শ:
১. মায়ের সাথে আলোচনা করুন: তাকে বুঝান যে, তাবলীগ একটি নেক কাজ যা ভাইয়ের চরিত্র গঠনে সহায়ক। নিরাপত্তার ব্যবস্থা (যেমন: আপনার বা কোনো মাহরামের সঙ্গ) নিশ্চিত করুন।
২. স্থানীয় দ্বীনী পরিবেশ তৈরি করুন: তাকে মসজিদের হালকা, স্থানীয় মক্তব বা দ্বীনি ক্যাম্পে পাঠান।
৩. দোয়া করুন: মায়ের হিদায়াত ও ভাইয়ের সংশোধনের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন।
সারকথা:
- মায়ের অনুমতি ব্যতীত তাবলীগে পাঠানো জায়েয নয়।
- ভাইকে দ্বীনি পরিবেশ দেওয়ার বিকল্প পন্থা অবলম্বন করুন।
- মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখুন এবং ধৈর্য ধরে তাকে বুঝান।
মহান আল্লাহ আপনার ভাইকে হিদায়াত দান করুন এবং আপনার মায়ের কলব নরম করুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা আনকাবুত: ৮, সূরা লুকমান: ১৫
- হাদীস: সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪০
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৬/৪১৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫৯
- আল-হিদায়া: كتاب الحظر والإباحة
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৭৪
- বাহেশতি জেওর: ১/২৪৫