ইমামের তিলাওয়াত শুদ্ধ না থাকলে তার পিছনে নামাজ হবে কি?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 6563
Questioner: Sazzad Al Haque
Question Asked: 08 Oct 2026, 09:19 AM
Reviewed & Published: 08 Oct 2026, 10:44 AM
Views: 17
Tokens: 5,727
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
১. কোন ইমামের যদি তিলাওয়াত শুদ্ধ না থাকে তাহলে তার পিছনে কি সালাত আদায় করা জায়েজ? লাহনে জলি থাকলে হুকুম কি আর লাহনে খফি থাকলে হুকুম কি?
২. কোন ইমাম যদি সালামের উত্তর ঠিক মত না দেয়, তার যদি আচার ব্যবহার খারাপ হয় এবং পর নারীদের দিকে তাকানোর বদ অভ্যাস থাকে ও তাদের সাথে কথা বলে এমন ইমামের পিছনে সালাত আদায়ের হুকুম কি?
৩. ফাসেক ব্যক্তি কে? ফাসেক ব্যক্তিকে সালাম দেয়ার হুকুম কি? তার পিছনে ইক্তিদা করে সালাত আদায়ের হুকুম কি?
৪. যে ব্যক্তি সালামের উত্তর ঠিক মত দেয় না তাকে আগে সালাম দেয়ার হুকুম কি?

Answer

ইমামত ও ইকতিদা সংক্রান্ত মাসায়েল

উত্তর (সংক্ষিপ্ত):

১. লাহনে জলি (যেমন ح، س، ص، ط، ض، ظ ইত্যাদি হরফের মাখরাজ বা সিফাত পরিবর্তন করে অর্থ বিকৃত করা) থাকলে সেই ইমামের পিছনে সালাত জায়েজ নয়। আর লাহনে খফি (যেমন নুন-মীম গুন্নাহ, মাদ্দের পরিমাণ ইত্যাদি সূক্ষ্ম ভুল) থাকলে সালাত জায়েজ, তবে ইমামতি মাকরুহ।

২. সালামের উত্তর ঠিকমতো না দেওয়া, খারাপ আচরণ, পর-নারীর দিকে তাকানো ও প্রকাশ্যে তাদের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা — এসব ফিসক (পাপ)। এমন ফাসিক ইমামের পিছনে সালাত জায়েজ, তবে মাকরুহে তাহরিমি। সম্ভব হলে অন্য নেককার ইমামের পিছনে জামাত করা উচিত।

৩. ফাসিক হলো সেই মুসলিম, যে প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহ করে, যে ফরজ-ওয়াজিব তরক করে বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে। ফাসিককে সালাম দেওয়া জায়েজ (বরং সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত, যদি তাকে সংশোধনের নিয়ত থাকে)। তবে তার পিছনে ইকতিদা করে সালাত মাকরুহে তাহরিমি — জায়েজ হবে কিন্তু গুনাহগার হবে।

৪. যে ব্যক্তি সালামের উত্তর ঠিকমতো দেয় না, তাকে আগে সালাম দেওয়া জায়েজ; বরং সে যদি মুসলিম হয় তবে তাকে সালাম দেওয়া সুন্নত। তবে যদি সে সালামের উত্তর দেওয়াই ছেড়ে দেয় (ওয়াজিব তরক করে), তাহলে তাকে সালাম দেওয়া ছেড়ে দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে — তবে সম্পূর্ণ বন্ধ করা ঠিক নয়।


বিস্তারিত উত্তর

১. লাহনে জলি ও লাহনে খফি

লাহনে জলি (اللحن الجلي) অর্থ স্পষ্ট ভুল — যা কিরাতের হরফ বা শব্দে এমন পরিবর্তন আনে যে অর্থ বিকৃত হয়ে যায় বা কুরআনের শব্দই বদলে যায়। যেমন:

  • ح-কে ه পড়া
  • ص-কে س পড়া
  • ط-কে ت পড়া
  • ض-কে د পড়া
  • শব্দের হরকত (ইরাব) পরিবর্তন করে অর্থ বদলে দেওয়া

হুকুম: যে ইমাম লাহনে জলি করে, তার পিছনে সালাত জায়েজ নয়। কারণ এতে কুরআনের হরফ পরিবর্তিত হয়, যা হারাম।

ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন: "اللحن الجلي يفسد الصلاة" — লাহনে জলি সালাত নষ্ট করে।
(বাদায়েউস সানায়ে, ১/২৩৩)

লাহনে খফি (اللحن الخفي) অর্থ সূক্ষ্ম ভুল — যা অর্থ বিকৃত করে না, শুধু তাজবীদের সৌন্দর্য নষ্ট করে। যেমন:

  • গুন্নাহ না দেওয়া
  • মাদ্দে ত্ববীয়ী ছাড়া অতিরিক্ত টানা
  • ইখফা, ইদগামের ভুল

হুকুম: এতে সালাত জায়েজ, তবে ইমামতি মাকরুহ।

ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন: "اللحن الخفي لا يفسد الصلاة لكن يكره"
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৭৪)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "লাহনে জলি হলে ইমামতি বাতিল, লাহনে খফি হলে মাকরুহ।"
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩০৩)


২. ফাসিক ইমামের পিছনে সালাত

ইমাম যদি সালামের উত্তর ঠিকমতো না দেয়, আচার-ব্যবহার খারাপ হয়, পর-নারীর দিকে তাকায় ও তাদের সাথে প্রকাশ্যে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে — এসব কবিরা গুনাহ ও ফিসক।

হুকুম:

  • এমন ইমামের পিছনে সালাত জায়েজ — কারণ ফিসক ইমামতিকে বাতিল করে না।
  • তবে মাকরুহে তাহরিমি — কারণ ফাসিককে ইমাম বানানো শরীয়ত সমর্থন করে না।
  • সম্ভব হলে অন্য নেককার ইমামের পিছনে জামাত করা ওয়াজিব পর্যায়ের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ"
(সূরা হুদ: ১১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ"
(সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "ফাসিক ইমামের পিছনে নামাজ হয়, কিন্তু তার পিছনে জামাত করা মাকরুহ।"
(বেহেশতী জেওর, নামাজ অধ্যায়)

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) থেকে বর্ণিত: "لا يصلي خلف الفاسق إلا أن يخاف الفتنة" — ফাসিকের পিছনে নামাজ পড়া যাবে না, তবে ফিতনার ভয় থাকলে পড়া যাবে।
(আল-আসার, ১/১৪২)


৩. ফাসিক কে? ফাসিককে সালাম ও তার পিছনে ইকতিদা

ফাসিকের সংজ্ঞা:
ফাসিক হলো সেই মুসলিম,যে প্রকাশ্যে কবিরা গুনাহ করে, যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গেছে — ফরজ-ওয়াজিব তরক করে বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে, তবে হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বলে না (তাহলে কাফির হয়ে যাবে)।

ইমাম তাহাভী (রহ.) বলেন: "الفسق هو الخروج عن الطاعة" — ফিসক হলো আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
(আকিদাতুত তাহাবিয়া)

ফাসিককে সালাম দেওয়ার হুকুম:

  • জায়েজ — বরং সুন্নত, যদি তাকে সংশোধনের নিয়ত থাকে।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ ফাসিক ও পাপীদের সাথেও সৌজন্য ব্যবহার করতেন।
  • তবে যদি সালাম দেওয়া তাকে আরও গুনাহে উৎসাহিত করে, তাহলে ترك করা যাবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ" — তোমাদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।
(সহিহ মুসলিম: ৫৪)

ফাসিকের পিছনে ইকতিদা করে সালাত:

  • জায়েজ, তবে মাকরুহে তাহরিমি।
  • যদি ফাসিক ইমাম হয় এবং মুক্তাদি তাকে অপছন্দ করে, তবুও নামাজ হয়ে যাবে।
  • তবে সম্ভব হলে ফাসিককে ইমাম বানানো থেকে বিরত থাকা উচিত।

ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "تكره إمامة الفاسق" — ফাসিকের ইমামতি মাকরুহ।
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৫৬)

ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে: "لا تجوز إمامة الفاسق في الصلاة" — ফাসিকের ইমামতি জায়েজ নয় (অর্থাৎ মাকরুহে তাহরিমি)।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৬)


৪. যে সালামের উত্তর ঠিকমতো দেয় না, তাকে আগে সালাম দেওয়া

হুকুম:

  • যদি সে মুসলিম হয়, তবে তাকে আগে সালাম দেওয়া জায়েজ ও সুন্নত।
  • সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব — সে যদি উত্তর না দেয়, সে গুনাহগার হবে, কিন্তু তোমার সালাম দেওয়া বন্ধ করা জরুরি নয়।
  • তবে যদি সে বারবার উত্তর দিতে অস্বীকার করে এবং তাকে সালাম দেওয়া তাকে আরও অবহেলায় উৎসাহিত করে, তাহলে কমিয়ে দেওয়া বা ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে — তবে সম্পূর্ণ বন্ধ করা ঠিক নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"خَمْسٌ تَجِبُ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ: رَدُّ السَّلَامِ..." — পাঁচটি হক মুসলিমের উপর মুসলিমের রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো সালামের উত্তর দেওয়া।
(সহিহ মুসলিম: ২১৬২)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "رد السلام واجب بالإجماع" — সালামের উত্তর দেওয়া ইজমা অনুযায়ী ওয়াজিব।
(শরহে মুসলিম, ১৪/৩)

ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি সালামের উত্তর দেয় না, তাকে সালাম দেওয়া ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং তার সংশোধনের জন্য দুআ করা উচিত।"
(ফায়যুল বারী, ৪/৩৪৫)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.