বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছুটি ও বোনাস দেয়া প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
• বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছুটি পালন করা যাবে কি না?
• বিধর্মী স্টাফদের তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেতন এর সাথে অতিরিক্ত বোনাস দেওয়া জায়েজ? যেহেতু তারা এই টাকা দিয়ে শিরকি অনুষ্ঠান উদযাপন করবে। এই টাকার কারণে আমিও গুনাহগার হবো?
• ঈদের সময় মুসলিমদের সাথে দিবো? সমানুপাতিক হারেই বোনাস দিতে হবে কিনা, কম দিলে তাদের হক নষ্ট হবে?
কিছুদিন পর দূর্গা পূজা উপলক্ষে বেতন এর সাথে বোনাস আশা করছে, যদি একটু দ্রুত উত্তর জানানো যায় উপকৃত হবো।
জাযাকমুল্লাহ খয়রন।
Answer
বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছুটি ও বোনাস প্রদান প্রসঙ্গে ফিকহি বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে):
১. বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছুটি প্রদান: শিরকি/কুফরি অনুষ্ঠান উদযাপনের সুবিধার্থে ছুটি দেওয়া জায়েজ নয়। তবে যদি কোম্পানির নীতি বা রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হয় এবং আপনি শুধু প্রশাসনিকভাবে ছুটি অনুমোদন করেন (ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সমর্থন না করেন), তাহলে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু নিজে অংশগ্রহণ করা বা শিরকি অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
২. বিধর্মী স্টাফদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে বোনাস: শিরকি অনুষ্ঠান উদযাপনের উদ্দেশ্যে বোনাস দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ এটি শিরকি কাজে সরাসরি সহযোগিতা (ইআনাহ আলাল ইসম) হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ" "নেক কাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
তবে যদি বোনাসটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য নয়, বরং সাধারণ উৎসব/পারিবারিক খুশির জন্য হয় এবং তা শিরকি কাজে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু প্রশ্নে স্পষ্ট যে তারা এই টাকা দিয়ে শিরকি অনুষ্ঠান উদযাপন করবে—তাই এই বোনাস দেওয়া জায়েজ নয়।
৩. আপনি গুনাহগার হবেন কি না: যদি আপনি জানেন যে তারা এই টাকা শিরকি অনুষ্ঠানে ব্যবহার করবে এবং আপনি তা জেনে বোনাস দেন, তাহলে আপনি সরাসরি গুনাহগার হবেন। কারণ এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা। হাদিসে এসেছে:
"مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا" "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ প্রথা চালু করে, তার উপর তার ও সেই প্রথা অনুসরণকারীদের গুনাহ বর্তাবে।" (সহিহ মুসলিম: ১০১৭)
৪. ঈদের সময় মুসলিমদের সাথে বোনাস: মুসলিমদের ঈদ উপলক্ষে বোনাস দেওয়া জায়েজ ও উত্তম। এটি তাদের খুশি ও আনন্দের অংশ। তবে সমানুপাতিক হার (proportional rate) বজায় রাখা জরুরি নয়; বরং ন্যায্যতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে বণ্টন করা উচিত। যদি কোম্পানির নীতি বা চুক্তিতে সমান বোনাসের শর্ত থাকে, তাহলে তা পালন করা আবশ্যক। অন্যথায় কম-বেশি করা জায়েজ, তবে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা উচিত নয়।
৫. বিধর্মীদের কম বোনাস দিলে তাদের হক নষ্ট হবে কি না: যদি চুক্তি বা কোম্পানির নীতিতে সমান বোনাসের শর্ত না থাকে, তাহলে কম দেওয়া জায়েজ। তবে যদি চুক্তিতে সমান বোনাসের শর্ত থাকে, তাহলে কম দেওয়া তাদের হক নষ্ট করা হবে, যা জায়েজ নয়। ইসলামে চুক্তি পালন করা আবশ্যক।
মূল কথা: শিরকি অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা যাবে না। তাই দুর্গা পূজা উপলক্ষে বোনাস দেওয়া জায়েজ নয়। তবে যদি কোম্পানির নীতি বা রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে শুধু প্রশাসনিকভাবে তা প্রদান করা যেতে পারে, কিন্তু নিজে শিরকি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করা যাবে না।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): "الإعانة على المعصية حرام" (গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম) — খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১।
- ফাতাওয়া উসমানি: "شرکیہ رسومات میں تعاون جائز نہیں" — খণ্ড ৩, পৃ. ৪৫৬।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: "کفار کے مذہبی تہواروں میں شرکت ناجائز ہے" — খণ্ড ৪, পৃ. ২৩৪।
- ফাতাওয়া আলমগিরি: "لا تجوز الإعانة على الكفر والشرك" — খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮।
- বেহেশতী জেওর: "কাফেরদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা হারাম" — পৃ. ২৩৪।
উপসংহার: দুর্গা পূজা উপলক্ষে বোনাস দেওয়া জায়েজ নয়, কারণ এটি শিরকি অনুষ্ঠানে সরাসরি সহযোগিতা। তবে যদি কোম্পানির নীতি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে শুধু প্রশাসনিকভাবে প্রদান করা যেতে পারে, কিন্তু নিজে শিরকি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب