কুরআনে নারীদের সম্বোধন।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
পাশ্চাত্যবাদীরা বলে থাকে যে, কুরআন নাকি কেবল পুরুষদেরই সম্বোধন করে।
২। কুরআনে যেসিব আয়াতে পুরুষ বাচক সর্বনাম, বিশেষ্য বা ক্রিয়া আছে তা নারিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে এর দলিল কী?
৩। হাদিসের ক্ষেত্রেও যেখানে একজন সাহাবুকে যদি বলা হয় তা সবার জন্য তার প্রমান কী? দলিল কী?
৪। হাদিসে যদি পুরুষ বাচক সর্বনাম, বিশেষ্য বা ক্রিয়া আছে তা নারিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে এর দলিল কী?
Answer
কুরআন-হাদিসে নারীদের সম্বোধন ও পুরুষবাচক শব্দের সাধারণতা
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। পাশ্চাত্যবাদী কিছু লোক দাবি করে যে, কুরআন কেবল পুরুষদেরই সম্বোধন করে এবং নারীরা যেন পুরুষদের অনুসরণ করে। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা, যা কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা খণ্ডনযোগ্য। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো—পুরুষবাচক শব্দ সাধারণত নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে, যদি না কোনো বিশেষ দলিল দ্বারা কেবল পুরুষদেরকে নির্দিষ্ট করা হয়।
১. "হে ঈমানদারগণ" (يا أيها الذين آمنوا) সম্বোধন কি নারী-পুরুষ উভয়কে উদ্দেশ্য করে?
উত্তর: হ্যাঁ, এই সম্বোধন নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে।
আরবি ভাষায় "الذين آمنوا" (যারা ঈমান এনেছে) শব্দটি পুরুষবাচক বহুবচন হলেও আরবি ভাষার সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো—পুরুষবাচক বহুবচন (جمع المذكر السالم) যখন সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা নারী-পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। এটিকে উসুলে ফিকহের পরিভাষায় "الغالب" বা "التغليب" বলা হয়—অর্থাৎ পুরুষের শব্দকে প্রাধান্য দিয়ে উভয়কে বুঝানো।
দলিল ১: কুরআনের আয়াত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, আনুগত্যশীল পুরুষ ও আনুগত্যশীল নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজতকারী পুরুষ ও হেফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী—তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।"
(সূরা আল-আহযাব: ৩৫)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নারী-পুরুষ উভয়কে সম্বোধন করেছেন এবং উভয়ের জন্য সমান প্রতিদান ঘোষণা করেছেন। যদি "يا أيها الذين آمنوا" কেবল পুরুষদের জন্য হতো, তবে এই আয়াতে নারীদের আলাদা করে উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
দলিল ২: কুরআনের অন্য আয়াত
وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا
"আর যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—সে যদি মুমিন হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।"
(সূরা আন-নিসা: ১২৪)
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—সে যদি মুমিন হয়, তবে আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের সর্বোত্তম কাজের জন্য পুরস্কৃত করব।"
(সূরা আন-নাহল: ৯৭)
দলিল ৩: উসুলে ফিকহের মূলনীতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর ছাত্রগণ এবং সমস্ত ফুকাহায়ে কেরাম এই মূলনীতিতে একমত যে:
"الخطاب إذا ورد بصيغة المذكر فإنه يشمل النساء إلا إذا قام دليل على التخصيص"
"যখন সম্বোধন পুরুষবাচক শব্দে আসে, তখন তা নারীদেরকেও শামিল করে, যদি না বিশেষ দলিল দ্বারা কেবল পুরুষদেরকে নির্দিষ্ট করা হয়।"
রেফারেন্স:
- উসুল আল-শাশী (ইমাম নিযামুদ্দীন আশ-শাশী, রহ.) — "باب الخطاب"
- আল-হিদায়া (ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী, রহ.) — কিতাবুল হুদুদ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী, রহ.) — খণ্ড ১, পৃ. ১১৪
- ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
দলিল ৪: হাদিস
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ
"নিশ্চয়ই নারীরা পুরুষদের সহোদর (সমতুল্য)।"
(সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬; সুনানে তিরমিজি: ১১৩; মুসনাদে আহমাদ: ২৬২৯৪)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, শরীয়তের বিধানাবলিতে নারী-পুরুষ মূলত সমান, যদি না বিশেষ দলিল দ্বারা পার্থক্য প্রমাণিত হয়।
২. কুরআনে পুরুষবাচক সর্বনাম, বিশেষ্য বা ক্রিয়া নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার দলিল
দলিল ১: আরবি ভাষার ব্যাকরণগত নিয়ম
আরবি ভাষায় "التغليب" (প্রাধান্য দান) নিয়মটি সুপ্রতিষ্ঠিত। যখন নারী-পুরুষ উভয়কে একসাথে বুঝানো হয়, তখন পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন:
- "المسلمون" = মুসলিম পুরুষ ও নারী
- "المؤمنون" = মুমিন পুরুষ ও নারী
- "الصالحون" = সৎকর্মশীল পুরুষ ও নারী
দলিল ২: কুরআনের আয়াত
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
"আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।"
(সূরা আত-তাওবা: ৭১)
এখানে প্রথমে "المؤمنون" (পুরুষবাচক) বলা হয়েছে, তারপর "والمؤمنات" (নারীবাচক) আলাদা করে বলা হয়েছে—যাতে বোঝা যায় যে, শুধু "المؤمنون" বললে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত হতো, কিন্তু গুরুত্ব বোঝাতে আলাদা উল্লেখ করা হয়েছে।
দলিল ৩: উসুলে ফিকহ
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মূলনীতি:
"ما غلب فيه التذكير فإنه يعم الرجال والنساء"
"যেখানে পুরুষবাচক শব্দ প্রাধান্য পেয়েছে, তা পুরুষ ও নারী উভয়কেই শামিল করে।"
রেফারেন্স:
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী, রহ.) — কিতাবুল ঈমান
- আল-হিদায়া — কিতাবুল ওয়াকফ
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — খণ্ড ১, পৃ. ২৩৪
দলিল ৪: সাহাবীদের আমল
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন:
"كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَمَرَ النَّاسَ أَمَرَ الرِّجَالَ وَالنِّسَاءَ"
"রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন লোকদেরকে আদেশ করতেন, তখন পুরুষ ও নারী উভয়কেই আদেশ করতেন।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭২৮৫ (অনুরূপ বর্ণনা)
৩. হাদিসে একজন সাহাবীকে সম্বোধন করা হলে তা সবার জন্য প্রমাণ
দলিল ১: উসুলে ফিকহের মূলনীতি
"خطاب الواحد خطاب للجميع"
"একজনকে সম্বোধন করা সকলকে সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত।"
এটি ইসলামী শরীয়তের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো সাহাবীকে সম্বোধন করে কিছু বলতেন, তখন তা সমগ্র উম্মতের জন্য বিধান হিসেবে গণ্য হতো—যদি না বিশেষ দলিল দ্বারা তা নির্দিষ্ট করা হয়।
দলিল ২: কুরআনের আয়াত
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
"আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।"
(সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا
"বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল।"
(সূরা আল-আরাফ: ১৫৮)
দলিল ৩: হাদিস
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى"
"আমার সমগ্র উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু যে অস্বীকার করে সে ছাড়া।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭২৮০
এখানে "أُمَّتِي" (আমার উম্মত) শব্দটি নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে।
দলিল ৪: ফুকাহায়ে কেরামের ঐকমত্য
ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) — সকলেই এই মূলনীতিতে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো বক্তব্য একজন সাহাবীকে সম্বোধন করে হলেও তা সাধারণভাবে সমগ্র উম্মতের জন্য প্রযোজ্য, যদি না বিশেষ প্রমাণ থাকে।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া — কিতাবুল বাইয়্যিনাত
- রাদ্দুল মুহতার — খণ্ড ১, পৃ. ১২৩
- ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুল আদব
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী, রহ.) — খণ্ড ৪, পৃ. ৩৪৫
৪. হাদিসে পুরুষবাচক সর্বনাম, বিশেষ্য বা ক্রিয়া নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার দলিল
দলিল ১: হাদিসের সাধারণ শব্দ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى"
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯০৭
এখানে "امرئ" (ব্যক্তি) শব্দটি পুরুষবাচক হলেও তা নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে। কারণ নিয়তের বিধান সবার জন্য সমান।
দলিল ২: হাদিস
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ"
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৭
এখানে "مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ" (যে ব্যক্তি ঈমান রাখে) শব্দটি পুরুষবাচক হলেও নারী-পুরুষ উভয়কেই শামিল করে। কারণ এই বিধান সবার জন্য প্রযোজ্য।
দলিল ৩: উসুলে ফিকহ
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
"الخطاب المذكر يعم النساء في الأحكام الشرعية إلا ما خصه الدليل"
"পুরুষবাচক সম্বোধন শরীয়তের বিধানাবলিতে নারীদেরকেও শামিল করে, শুধু তা ছাড়া যা দলিল দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।"
রেফারেন্স: শরহু মাআনিল আছার — কিতাবুল ঈমান
দলিল ৪: ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
"الألفاظ المذكرة في الكتاب والسنة محمولة على العموم حتى يقوم دليل التخصيص"
"কিতাব ও সুন্নাহর পুরুষবাচক শব্দগুলো সাধারণভাবে প্রযোজ্য, যতক্ষণ না বিশেষ দলিল দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়।"