আজরাইল শব্দ নিয়ে অন্যকে সম্ভোধন

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6524
Questioner: Ch Rafi
Question Asked: 07 Oct 2026, 03:22 PM
Reviewed & Published: 07 Oct 2026, 04:54 PM
Views: 46
Tokens: 5,689
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. আমােদর এলাকায় অনেকে, খারাপ/রাগী মানুষ বা দুষ্ট ছেলেদের বুঝাতে আজরাইল শব্দ ব্যবহার করে, এভাবে একজন ফেরেশতার নাম ব্যবহার করে এসব বলায় কি কুফর হবে?

২. একজন শিক্ষিকা বললেন,
যাচ্ছি আজরাইলদের ক্লাসে, এরা এতো আজরাাইল যা বলার বাহিরে (অনেক দুষ্ট বুঝানো উদ্দেশ্য)

এটা শুনে আরেকজন টিচার হাসলো, সে জানতো আজরাইল ফেরেশতার নাম, এটাও জানতো ওই শিক্ষিকা ফেরেশতা বুঝানোর জন্য বলেন নি।

য়ে এই বক্তব্য শুনে হাসলো সে কি কাফের হবে???

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

হামদ ও সালাতের পর:

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্ন দুটি মূলত দুটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত: ১. ফেরেশতার নাম (আজরাইল) ব্যবহার করে খারাপ/দুষ্ট মানুষকে বোঝানো কি কুফর? ২. শিক্ষিকার বক্তব্য শুনে যে শিক্ষক হেসেছেন, তিনি কি কাফের হবেন?


১ম প্রশ্নের উত্তর: আজরাইল শব্দ ব্যবহার করে দুষ্ট মানুষ বোঝানো কি কুফর?

মূলনীতি

ইসলামি শরিয়তে কুফরের সংজ্ঞা হলো: ইসলামের অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করা, অবমাননা করা, বা এমন কথা/কাজ করা যা আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, ফেরেশতা বা দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়ের শান-মানহানির দিকে নিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ

"আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা অবশ্যই বলবে: আমরা তো কেবল হাসি-তামাশা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে?"

(সূরা তাওবা: ৬৫)

ফেরেশতার নাম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিধান

ফেরেশতাগণ আল্লাহর সম্মানিত বান্দা ও তাঁর নির্দেশ পালনকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন:

بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ

"বরং তারা সম্মানিত বান্দা। তারা তাঁর আগে কথা বলে না এবং তারা তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে।"

(সূরা আম্বিয়া: ২৬-২৭)

ফেরেশতাদের নাম নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা অবমাননার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। তবে তা সরাসরি কুফর হবে কি না, তা নির্ভর করে নিয়ত ও উদ্দেশ্যের উপর।

ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

"الاستهزاء بالملائكة كفر لأنهم عباد الله المكرمون، والاستهزاء بهم استهزاء بالله تعالى"

"ফেরেশতাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফর, কারণ তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা; তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা আল্লাহর সাথেই ঠাট্টা করার শামিল।"

(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, মাসআলাতুল মুরতাদ্দ)

ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:

"من سبّ ملكاً من الملائكة أو استهزأ به كفر"

"যে ব্যক্তি কোনো ফেরেশতাকে গালি দেয় বা তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, সে কাফের হয়ে যায়।"

(ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুস সিয়ার, বাবুল মুরতাদ্দ)

তবে এখানে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় লোকেরা আজরাইল শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করে — অর্থাৎ "মৃত্যুর ফেরেশতা" বা "প্রাণ নেওয়ার ফেরেশতা" হিসেবে নয়, বরং "খারাপ/দুষ্ট/রাগী মানুষ" বোঝাতে। এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

ক) যদি উদ্দেশ্য হয় ফেরেশতার অবমাননা বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ: তাহলে তা কুফর হবে। কারণ এতে ফেরেশতার সম্মানহানি ও দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করা হয়।

খ) যদি উদ্দেশ্য হয় কেবল রূপক অর্থে "দুষ্ট/খারাপ মানুষ" বোঝানো, ফেরেশতার অবমাননা নয়: তাহলে তা কুফর নয়, তবে নাজায়েজ, গুনাহ ও শরিয়তবিরোধী। কারণ ফেরেশতার নাম আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া সম্মানিত নাম, তা অপব্যবহার করা উচিত নয়।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

"ফেরেশতাদের নাম নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা বা অবমাননার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কুফরের অন্তর্ভুক্ত। তবে যদি কেবল রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয় এবং ফেরেশতার প্রতি অবমাননার নিয়ত না থাকে, তাহলে তা কুফর নয়, বরং গুনাহ।"

(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৭)

উপসংহার (১ম প্রশ্ন)

  • যদি আজরাইল শব্দ ব্যবহার করে ফেরেশতাকে অবমাননা বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার নিয়ত থাকে → কুফর।
  • যদি কেবল রূপক অর্থে "দুষ্ট/খারাপ মানুষ" বোঝানোর নিয়ত থাকে, ফেরেশতার অবমাননার নিয়ত না থাকে → কুফর নয়, তবে নাজায়েজ ও গুনাহ।
  • তবে সাধারণ মুসলিমদের উচিত ফেরেশতাদের নাম সম্মানের সাথে ব্যবহার করা এবং এ ধরনের অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা।

২য় প্রশ্নের উত্তর: শিক্ষিকার বক্তব্য শুনে যে শিক্ষক হেসেছেন, তিনি কি কাফের?

ঘটনার বিশ্লেষণ

ঘটনাটি হলো:

  • শিক্ষিকা বললেন: "যাচ্ছি আজরাইলদের ক্লাসে, এরা এতো আজরাইল যা বলার বাহিরে" — এখানে তিনি রূপক অর্থে দুষ্ট ছেলেদের বোঝাতে "আজরাইল" শব্দ ব্যবহার করেছেন।
  • আরেকজন শিক্ষক হাসলেন।
  • তিনি জানতেন আজরাইল ফেরেশতার নাম।
  • তিনি এটাও জানতেন যে শিক্ষিকা ফেরেশতা বোঝানোর জন্য বলেননি, বরং দুষ্ট ছেলেদের বোঝানোর জন্য বলেছেন।

হাসির বিধান

হাসি নিজে কুফর নয়। কুফর হয় তখনই যখন হাসির মাধ্যমে দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয় বা অবমাননা করা হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ۞ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ

"বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? অজুহাত দেখিও না, তোমরা ঈমান আনার পর কুফর করে ফেলেছ।"

(সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)

এখানে হাসির প্রকৃতি নির্ণয়

এখানে শিক্ষক হেসেছেন শিক্ষিকার কথার রসিকতা বা মজার দিক দেখে, ফেরেশতাকে অবমাননা বা ঠাট্টা করার নিয়তে নয়। কারণ:

  1. শিক্ষিকা ফেরেশতা বোঝাননি, বরং দুষ্ট ছেলেদের বোঝানোর জন্য রূপক অর্থে বলেছেন।
  2. শিক্ষক জানতেন শিক্ষিকার উদ্দেশ্য ফেরেশতা বোঝানো নয়।
  3. হাসিটি ছিল শিক্ষিকার কথার অদ্ভুততা বা মজার দিক দেখে, দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করার নিয়তে নয়।

ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"الكفر إنما يكون بالاستهزاء بالدين أو إنكار ما علم من الدين بالضرورة، وأما الضحك من غير قصد الاستهزاء فليس بكفر"

"কুফর হয় দ্বীনের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় অস্বীকার করার মাধ্যমে। আর ঠাট্টার নিয়ত ছাড়া হাসা কুফর নয়।"

(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা তাওবার ৬৫-৬৬ আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেন:

"মুনাফিকরা রাসূল (সা.)-এর সম্পর্কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং এটাকে খেল-তামাশা মনে করত। আল্লাহ তাআলা তাদের কুফরির ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যদি কেউ দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, বরং সাধারণ কোনো কথার মজার দিক দেখে হাসে, তাহলে তা কুফর নয়।"

(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৫৭)

তবে সতর্কতা

যদিও এখানে হাসিটি কুফর নয়, তবে ফেরেশতাদের নাম নিয়ে রূপক অর্থে ব্যবহার করা বা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা উচিত নয়। এটি শরিয়তের আদবের পরিপন্থী। মুসলিমদের উচিত ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং তাদের নাম সম্মানের সাথে ব্যবহার করা।

উপসংহার (২য় প্রশ্ন)

  • শিক্ষক যে হেসেছেন, তা কুফর নয়, কারণ:
    • তিনি ফেরেশতাকে অবমাননা বা ঠাট্টা করার নিয়তে হাসেননি।
    • শিক্ষিকা ফেরেশতা বোঝানোর জন্য বলেননি, বরং রূপক অর্থে দুষ্ট ছেলেদের বোঝাতে বলেছেন।
    • হাসিটি ছিল কথার মজার দিক দেখে, দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করার নিয়তে নয়।
  • তবে এ ধরনের রূপক ব্যবহার ও হাসি-ঠাট্টা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং ফেরেশতাদের নাম সম্মানের সাথে ব্যবহার করা কর্তব্য।
  • যদি কেউ ফেরেশতাকে অবমাননা বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার নিয়তে হাসে বা কথা বলে, তাহলে তা কুফর হবে এবং তাওবা করতে হবে।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | ফেরেশতাকে অবমাননা/ঠাট্টার নিয়তে আজরাইল শব্দ ব্যবহার | কুফর | | রূপক অর্থে দুষ্ট মানুষ বোঝাতে আজরাইল শব্দ ব্যবহার (অবমাননার নিয়ত ছাড়া) | কুফর নয়, তবে নাজায়েজ ও গুনাহ | | শিক্ষিকার রূপক কথার মজার দিক দেখে হাসা (অবমাননার নিয়ত ছাড়া) | কুফর নয় | | ফেরেশতাকে অবমাননা/ঠাট্টার নিয়তে হাসা | কুফর |

আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.