হায়েজ অবস্থায় সূরা, তিলাওয়াত পড়া নেওয়া যাবে কিনা?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6503
Questioner: طالبة
Question Asked: 06 Oct 2026, 11:13 PM
Reviewed & Published: 07 Oct 2026, 02:47 AM
Views: 12
Tokens: 8,031
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহি ওয়া বারকাতুহ,
উস্তাদ আমি একজন তাজবীদের শিক্ষিকা। সেই সুবাদে আলহামদুলিল্লাহ আমার বোনদের পড়া নিতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় বোনেরা হায়েজরত থাকেন তখন বোনদের পড়া কীভাবে নিবো নাকি নিবো না? হানাফি ফিকহ অনুযায়ী যতটুকু জানি শেখার ক্ষেত্রে শব্দে শব্দে ভেঙে পড়া যায়। তো আমরা অধিকাংশ শিক্ষিকারা হায়েজরত অবস্থায় বোনদের পড়া ভেঙে ভেঙে নিয়েছি এতদিন। উদ্দেশ্য ছিলো এভাবে পড়তে পারা শেখানো যেহেতু পরীক্ষার সময় হায়েজ থাকলে ভেঙে ভেঙে পড়া নেওয়া হয় আর একসাথে অনেক পড়া যাতে আটকে না যায় কারণ বোনেরা অনেকে ব্যস্ত থাকেন নানান কারণে তারউপর নতুন শিখছেন একসাথে ২টা তিনটা পড়া হায়েজের কারণে আটকে গেলে সেগুলো কভার করতে তারা হিমশিম খান। আমাদের ম্যানেজম্যান্ট থেকে হায়েজ অবস্থায় সূরা তিলাওয়াত নিতে নিষেধ করা হয়েছে ফিকহে ইমার্জেন্সি ব্যতীত হায়েজ অবস্থায় পড়া নেওয়া জায়েজ নাই বলে আর সুস্থ অবস্থায় মাঝে ভেঙে পড়া শেখাতে বলেছেন আমরা এখন সেটা ফলো করার চেষ্টা করেছি কিন্তু বোনরা এটায় দ্বিমত পোষণ করছেন বিশেষ করে পড়া জমে যায় এবং এটেন্ডেন্স আটকে থাকে বলে। তাদের মতে সেমিস্টার সময় সীমিত আর সিলেবাসও নির্দিষ্ট এভাবে পড়াগুলো জমতে থাকলে সেগুলো ভালোমতো কভার হয়না পরবর্তী সেমিস্টারের আগে। এভাবেই পরবর্তী সেমিস্টার শুরু হয় নতুন সিলেবাসে আগের পড়াগুলো আদোআদো অবস্থাতেই এমতাবস্থায় আমাদের করনীয় কি জানালে মুনাসিব হয়।
জাযাকুমুল্লহ খইর

Answer

হায়েজ অবস্থায় সূরা/তিলাওয়াত পড়া বা পড়ানো যাবে কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নারীর জন্য জায়েজ নয়। তবে শেখানোর উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে ভেঙে ভেঙে পড়া হানাফি ফিকহে অনুমোদিত — শর্ত হলো: (১) একবারে এক শব্দ বা শব্দের অংশ পড়া, (২) এক আয়াত একসাথে না পড়া, (৩) তালিম/শেখানোর নিয়ত থাকা। আর শিক্ষিকা নিজে হায়েজ অবস্থায় থাকলে তিনি নিজে তিলাওয়াত করতে পারবেন না, তবে ছাত্রীকে শেখাতে/শোনাতে পারবেন শব্দে-শব্দে ভেঙে।


বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

১. হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম

হানাফি মাজহাবে হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় নারীর জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ নয়। দলিল:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ هِشَامٍ، حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ قَتَادَةَ، عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ سَمُرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «الْحَائِضُ لَا تَقْرَأُ الْقُرْآنَ»

— সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩১ (ইমাম তিরমিজি বলেন: হাসান-সহিহ)

«لَا تَقْرَأِ الْحَائِضُ وَلَا الْجُنُبُ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ»

— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৫৯৬; মুসনাদে আহমাদ

ফিকহি কিতাব:

  • আল-হিদায়া: "الحائض لا تقرأ القرآن" — হায়েজ অবস্থায় কুরআন পড়া যাবে না।
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃ. ২৯৩: "ولا تقرأ الحائض القرآن" — হায়েজ অবস্থায় কুরআন পড়া নিষিদ্ধ।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮: একই হুকুম।

২. শেখার/শেখানোর উদ্দেশ্যে ভেঙে ভেঙে পড়ার অনুমতি

হানাফি ফিকহে তালিম বা শেখার উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়ার অনুমতি রয়েছে। কারণ এটি "তিলাওয়াত" (পূর্ণ কুরআন পাঠ) হিসেবে গণ্য হয় না, বরং "তালিম" (শিক্ষা) হিসেবে গণ্য হয়।

দলিল ও ফিকহি বক্তব্য:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৯৩: ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন —

    "وَلَا بَأْسَ أَنْ تَقْرَأَ الْحَائِضُ الْكَلِمَةَ الْكَلِمَةَ لِلتَّعْلِيمِ"

    "হায়েজ অবস্থায় শিক্ষার উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে পড়াতে অসুবিধা নেই।"

  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮: "الحائض إذا قرأت الكلمة الكلمة للتعليم لا بأس به" — হায়েজ অবস্থায় শিক্ষার জন্য শব্দে-শব্দে পড়লে অসুবিধা নেই।

  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৫: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন — "হায়েজ অবস্থায় শিক্ষিকা ছাত্রীকে শব্দে-শব্দে ভেঙে শেখাতে পারবেন, তবে এক আয়াত একসাথে পড়া যাবে না।"

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৭: হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন — "শিক্ষার প্রয়োজনে শব্দে-শব্দে পড়ার অনুমতি আছে, কিন্তু পূর্ণ আয়াত বা একাধিক আয়াত একসাথে পড়া যাবে না।"

৩. শর্তসমূহ (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়ার অনুমতির জন্য নিম্নলিখিত শর্ত প্রযোজ্য:

  1. একবারে এক শব্দ বা শব্দের অংশ পড়তে হবে — এক আয়াত একসাথে নয়।
  2. তালিম/শেখার নিয়ত থাকতে হবে — সাধারণ তিলাওয়াতের নিয়ত নয়।
  3. শব্দের মাঝে বিরতি দিতে হবে — যাতে পূর্ণ আয়াতের ধারাবাহিকতা না হয়।
  4. শিক্ষিকা নিজে হায়েজ অবস্থায় থাকলে তিনি নিজে তিলাওয়াত করবেন না; বরং ছাত্রীকে শেখাবেন বা ছাত্রীর পড়া শুনবেন।
  5. ছাত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকলে শিক্ষিকা তাকে শব্দে-শব্দে ভেঙে শেখাতে পারবেন এবং তার পড়া শুনতে পারবেন।

৪. আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে করণীয়

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • আপনি শিক্ষিকা — আপনি যদি হায়েজ অবস্থায় থাকেন, তাহলে আপনি নিজে সূরা/তিলাওয়াত পড়তে পারবেন না। তবে ছাত্রীকে শব্দে-শব্দে ভেঙে শেখাতে পারবেন এবং তার পড়া শুনতে পারবেন।
  • ছাত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকলে — সে শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়তে পারবে (তালিমের নিয়তে), কিন্তু এক আয়াত একসাথে পড়তে পারবে না।
  • পরীক্ষার প্রস্তুতি — পরীক্ষার সময় হায়েজ হলে শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়ার অনুমতি আছে, তাই এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করা ঠিক আছে।
  • ম্যানেজমেন্টের নির্দেশ — ম্যানেজমেন্ট যদি "ফিকহে ইমার্জেন্সি ব্যতীত নিষেধ" করে থাকে, তবে তা ফিকহি দৃষ্টিতে কঠোরতা। হানাফি ফিকহে তালিমের উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে পড়ার সুস্পষ্ট অনুমতি আছে। আপনি ম্যানেজমেন্টকে রাদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগিরি, ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-এর বরাত দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে পারেন।
  • ছাত্রীদের দ্বিমত — তাদের যুক্তি (সেমিস্টার সীমিত, সিলেবাস নির্দিষ্ট, পড়া জমে যাওয়া) ফিকহি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য, কারণ তালিমের স্বার্থে শব্দে-শব্দে পড়ার অনুমতি শরিয়ত দিয়েছে।

৫. বিশেষভাবে লক্ষণীয়

  • সুস্থ অবস্থায় মাঝে ভেঙে পড়া শেখানো — এটি ভালো অভ্যাস, তবে হায়েজ অবস্থায় শব্দে-শব্দে পড়া শেখানোও জায়েজ। তাই সুস্থ অবস্থায় ভেঙে পড়া শেখানো বাধ্যতামূলক নয়, বরং ঐচ্ছিক।
  • একসাথে ২-৩টি পড়া জমে যাওয়া — হায়েজের কারণে পড়া জমে গেলে শব্দে-শব্দে ভেঙে কভার করা যাবে, কারণ তালিমের অনুমতি আছে।
  • এক আয়াত একসাথে পড়া — হায়েজ অবস্থায় এক আয়াত একসাথে পড়া যাবে না, এমনকি তালিমের নিয়তেও নয়। তাই শিক্ষিকা/ছাত্রীকে অবশ্যই শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়তে হবে।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|------| | হায়েজ অবস্থায় সাধারণ তিলাওয়াত | জায়েজ নয় | | তালিমের উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়া | জায়েজ | | এক আয়াত একসাথে পড়া (হায়েজে) | জায়েজ নয় | | শিক্ষিকা হায়েজে ছাত্রীকে শেখানো | জায়েজ (শব্দে-শব্দে) | | ছাত্রী হায়েজে শব্দে-শব্দে পড়া | জায়েজ (তালিমের নিয়তে) | | পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ভেঙে পড়া | জায়েজ |

পরামর্শ: ম্যানেজমেন্টকে ফিকহি দলিলসহ বুঝিয়ে দিন যে, হানাফি মাজহাবে তালিমের উদ্দেশ্যে শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়া জায়েজ। পাশাপাশি ছাত্রীদের বোঝান যে, এক আয়াত একসাথে পড়া যাবে না — শব্দে-শব্দে ভেঙে পড়তে হবে। এতে উভয় পক্ষের সমস্যার সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।


রেফারেন্স:

  • সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩১
  • সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৫৯৬
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃ. ২৯৩
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৮
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৭

واللہ أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.