নফল/ তাহাজ্জুদ সালাতের রুকু ও সিজদায় নিজ মাতৃভাষায় (বাংলা ভাষায়) দুয়া করা।

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 650
Questioner: Rased Hasan
Question Asked: 24 May 2026, 04:04 AM
Reviewed & Published: 24 May 2026, 04:58 AM
Views: 74
Tokens: 4,590
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ সালাত ব্যতীত নফল/ তাহাজ্জুদ সালাতের রুকু ও সিজদায় আমার নিজ মাতৃভাষা বাংলায় দুয়া করতে পারব কিনা? এই দুটি যায়গায় আমি ঋন মুক্তির আরবি দুয়া, মা বাবার জন্য কুরআনের আরবি দুয়া, সহ যে যাবতীয় দুয়া গুলো আরবিতে পাঠ করে থাকি সেগুলো নফল/ তাহাজ্জুদ সালাতের রুকু ও সিজদায় পড়তে পারব কিনা? আমি এখানে ঐ সকল বিষয়ের কথা বলছিনা যেগুলো আমরা ফরজ ওয়াজিব ও সুন্নাহ সালাত এর রুকু সিজদায় পাঠ করে থাকি। আমি কি নফল/ তাহাজ্জুদ সালাতের রুকু সিজদায় এভাবে বাংলা ভাষার দুয়া করতে পারব "হে আমার রব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমার পিতা মাতাকে ক্ষমা করে দিন, আমার আত্মীয় স্বজনদের ক্ষমা করে দিন, আমাকে সুস্থতা দান করুন। আমার মৃত্যু ভাইকে ক্ষমা করে দিন, তার জীবনের যাবতীয় ভুল ত্রুটি অপরাধ সমূহ ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাকে পর্যাপ্ত রিযিক দান করুন, হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দিন ইত্যাদি"

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
প্রশ্নকারী ভাই/বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি নফল ও তাহাজ্জুদ সালাতের রুকু ও সিজদায় কীভাবে দুয়া করতে পারেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি। উত্তরটি হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।


উত্তর: নফল/তাহাজ্জুদ সালাতে রুকু ও সিজদায় দুয়া করার বিধান

১. আরবি দুয়া পড়া (যেমন ঋণমুক্তির দুয়া, পিতা-মাতার জন্য কুরআনের দুয়া ইত্যাদি)

  • সিজদায় আরবি দুয়া পড়া (কুরআনের আয়াত বা মাসনূন দুয়া) জায়েজ এবং মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়। তাই তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দুয়া করো।” (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)
    হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে: নফল সালাতের সিজদায় কুরআনের আয়াত দুয়ার নিয়তে পড়া জায়েজ, তবে তিলাওয়াতের নিয়তে পড়া মাকরুহ। (আল-হিদায়া: ১/১২০; ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১০৯)

  • রুকুতে আরবি দুয়া পড়াও জায়েজ, তবে রুকুর মূল জিকির হলো “সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম”। অতিরিক্ত দুয়া পড়তে কোনো বাধা নেই, বিশেষত নফল সালাতে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ) থেকে বর্ণিত: রুকুতে দুয়া করা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার: ২/১৮০; ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৫৩)

২. বাংলা (মাতৃভাষা) ভাষায় দুয়া করা

  • সিজদায় বাংলায় আখেরাত নিয়ে দুয়া করা জায়েজ। হানাফি ফিকহের ইমামগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন: “সিজদা ও কুনূতে আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় দুয়া করা জায়েজ। তবে আরবি উত্তম।” (রদ্দুল মুহতার: ২/১৮০; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/২৫১)
    ইমাম আবু হানিফা (রহ) নিজেও ফারসি ভাষায় সিজদায় দুয়া করার অনুমতি দিয়েছেন। (শরহু মা‘আনিল আসার: ১/২৫০)

  • রুকুতে বাংলায় দুয়া করা সম্পর্কে হানাফি ফিকহে মতভেদ আছে। অধিকাংশ ফুকাহা বলেছেন: রুকু মূলত তাসবীহের স্থান, তাই বাংলায় দুয়া করা মাকরুহ তানজিহি (অপছন্দনীয়)। তবে নফল সালাতে যদি কখনো প্রয়োজন হয়, তাহলে তা জায়েজ। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৫৪; বাহিশতি জেওর: ২/২২৫)
    মোটকথা: নফল ও তাহাজ্জুদে রুকুতে বাংলায় আখেরাত নিয়ে দুয়া করা জায়েজ হলেও উত্তম হলো আরবি দুয়া পড়া। আর সিজদায় বাংলায় আখেরাত সম্পর্কে দুয়া করা পুরোপুরি জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।

৩. আপনার উল্লেখিত বাংলা দুয়াটি পড়া

আপনি যে দুয়াটি লিখেছেন— “হে আমার রব, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করে দিন, আমার আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষমা করে দিন, আমাকে সুস্থতা দান করুন, আমার মৃত ভাইকে ক্ষমা করে দিন, তার জীবনের যাবতীয় ভুল ত্রুটি অপরাধ সমূহ ক্ষমা করে দিন, আপনি আমাকে পর্যাপ্ত রিজিক দান করুন, হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দিন”— এটি পড়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো:

  • বাংলায় বলার সময় সিজদা বা রুকুর আদব বজায় রাখতে হবে (যেমন মাথা স্থির রাখা, অযথা নড়াচড়া না করা)। এবং আখেরাত সম্পর্কীয় দোয়া হতে হবে।
  • দুয়ার অর্থ অবশ্যই বৈধ ও শরিয়তসম্মত হতে হবে। আপনার দুয়া সম্পূর্ণ বৈধ।
  • খুব দীর্ঘ করে ফেলা যাবে না, কারণ সালাতে ধৈর্য ও শিষ্টাচার জরুরি।

৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুআক্কাদা সালাতে রুকু-সিজদায় বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় দুয়া করা জায়েজ নেই। শুধু নফল ও তাহাজ্জুদ সালাতে এই সুযোগ আছে।
  • নফল সালাতেও রুকু ও সিজদার মূল জিকির (তাসবীহ) আদায় করা আবশ্যক। অতিরিক্ত দুয়া সেটার পর পড়বেন।
  • কুরআনের আয়াত দুয়ার নিয়তে পড়লে তা জায়েজ, কিন্তু তিলাওয়াতের নিয়তে পড়া মাকরুহ। আর কুরআনের অনুবাদ (বাংলা) পড়ার নিয়ত করলে সেটা কুরআন তিলাওয়াত বলে গণ্য হবে না— বরং তা দুয়া হিসেবে গণ্য হবে, যা জায়েজ।

হানাফি কিতাবের রেফারেন্স

  1. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
    “ويجوز الدعاء بغير العربية في السجود والقنوت ... والأولى أن يكون بالعربية”
    (সিজদা ও কুনূতে আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় দুয়া করা জায়েজ ... তবে আরবি উত্তম।) [২/১৮০]

  2. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
    “নফল সালাতে সিজদায় নিজ ভাষায় দুয়া করা জায়েজ, তবে উত্তম হলো আরবি মাসনূন দুয়া পড়া।” (১/২৫৪)

  3. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি):
    “নফল নামাজে সিজদায় নিজ ভাষায় দুয়া করতে পারবে, তবে ফরজে নয়।” (১/২৫১)

  4. বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি):
    “সিজদায় নিজ ভাষায় দুয়া করা জায়েজ আছে, তবে তা আরবি না হওয়াই ভালো নয়।” (২/২২৫)

  5. শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবি):
    ইমাম আবু হানিফা (রহ) ফারসি ভাষায় সিজদায় দুয়া করার অনুমতি দিয়েছেন। (১/২৫০)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.