ঘুমের মধ্যে কান্নার আওয়াজ শোনা, ফজরের আযানের সাথে বন্ধ হয়ে যাওয়া—এর ইসলামী ব্যাখ্যা কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি ভোররাত আনুমানিক ৪:১০ মিনিটে ঘুমের ভেতর অনুভব করেছেন যে কেউ কাঁদছে। ঘুম-ঘুম অবস্থায় উঠে বসেছিলেন, আবার শুয়ে পড়লেন, কিন্তু ঘুম আর এলো না—বরং ভয় হলো যে ঘুমিয়ে পড়লে ফজরের নামাজ মিস হয়ে যাবে। এরপর কান্নার আওয়াজ ক্রমে বাড়তে থাকে। আপনি জানালার দিকে মুখ করে শোয়ায়, পর্দা ছাড়া খোলা জানালা দিয়ে আওয়াজ আসছিল। আওয়াজ বাড়লে আপনি উঠে আশপাশে দেখলেন—কেউ নেই। আপনার আম্মুও কিছুটা জাগ্রত ছিলেন, কিন্তু তিনি কিছু শোনেননি। ফজরের আযান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই কান্নার আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। আপনি জানতে চান—এর অর্থ কী?
উত্তর
প্রথম কথা: এটি ফিকহের মাসআলা নয়, বরং একটি অনুভূতি/অভিজ্ঞতা
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এটি কোনো শরীয়তের বিধান-সংক্রান্ত মাসআলা নয়; বরং এটি একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা। তাই এর ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে এটি জিনের কান্না, শয়তানের কুমন্ত্রণা, নাকি স্বপ্ন, নাকি মনোবৈজ্ঞানিক কারণ (যেমন—অর্ধ-নিদ্রা অবস্থায় মস্তিষ্কের বিভ্রম, hypnagogic hallucination)। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে কয়েকটি দিক বিবেচনা করা যায়।
১. ঘুমের ভেতর বা অর্ধ-নিদ্রায় শব্দ শোনা ও স্বপ্ন দেখা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (ভয়ংকর) দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
আরও ইরশাদ হয়েছে—
«إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يَكْرَهُهَا فَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهَا وَلْيَتْفُلْ عَنْ يَسَارِهِ وَلْيَتَحَوَّلْ عَنْ جَنْبِهِ الَّذِي كَانَ عَلَيْهِ»
"যখন তোমাদের কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, সে যেন তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলে এবং যে কাত হয়ে ছিল তা পরিবর্তন করে।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২
তবে আপনার ক্ষেত্রে এটি স্বপ্ন ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়; কারণ আপনি অর্ধ-জাগ্রত অবস্থায় শব্দ শুনেছেন বলে মনে করছেন।
২. জিন বা অদৃশ্য সৃষ্টির আওয়াজ—এ বিষয়ে সতর্কতা
জিনের অস্তিত্ব কুরআন-হাদীসে প্রমাণিত (সূরা আল-জিন)। তবে কোনো নির্দিষ্ট শব্দ শুনলেই সেটাকে জিনের কান্না বলে চিহ্নিত করা যায় না। এ ধরনের ধারণা করা ঠিক নয়, কারণ এটি ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও অহেতুক ভয়ের জন্ম দিতে পারে। ইসলামে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার নিষিদ্ধ।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, অদৃশ্য বিষয় নিয়ে নিশ্চিত দাবি করা উচিত নয়; বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা ও কুরআন-হাদীসের আমল করা কর্তব্য।
৩. ফজরের আযানের সাথে আওয়াজ বন্ধ হওয়া
এটি হয়তো একটি সুসংবাদ হিসেবে নেওয়া যায়—কারণ ফজরের আযান শুনে আপনি নামাজের প্রস্তুতি নিয়েছেন, আর আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আপনার ভেতরে নামাজের প্রতি যে ভয় ও اهتمام ছিল, আল্লাহ তা কবুল করেছেন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করেছেন। শয়তান মানুষকে নামাজ থেকে গাফেল করতে চায়; কিন্তু আপনি জাগ্রত থেকেছেন—এটি ঈমানের আলামত।
৪. করণীয় আমল
এ ধরনের অভিজ্ঞতার পর নিম্নলিখিত আমলগুলো করা সুন্নত ও উপকারী:
- আয়াতুল কুরসি পড়া (সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৫)।
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া।
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া।
- ঘুমানোর আগে বিসমিল্লাহ ও ঘুমের দুআ পড়া:
«بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا» "হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মরি ও জীবিত হই।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩২৪
- অপছন্দনীয় কিছু অনুভব করলে বলুন:
«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ» "আল্লাহর পূর্ণ কালেমাসমূহের মাধ্যমে আমি তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৮
- আয়াতুল কুরসি ও সূরা বাকারার শেষ আয়াত নিয়মিত পড়া।
- ঘরে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা—বিশেষত সূরা বাকারা; কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন:
«لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ» "তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিও না; নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৮০
৫. চিকিৎসা-বিজ্ঞানের দিক
চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পরিভাষায় ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী অবস্থায় (hypnagogic state) মস্তিষ্কে নানা ধরনের শব্দ বা দৃশ্যের বিভ্রম হতে পারে। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে যদি এ ধরনের অভিজ্ঞতা বারবার হয় বা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৬. সারসংক্ষেপ ও উপদেশ
- এটি কোনো শরীয়তের বিধান-সংক্রান্ত মাসআলা নয়; বরং একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি।
- জিন বা অদৃশ্য কিছু বলে নিশ্চিত দাবি করা ঠিক নয়; কুসংস্কারে জড়ানো উচিত নয়।
- ফজরের আযানের সাথে আওয়াজ বন্ধ হওয়া—এটি আল্লাহর রহমত ও নামাজের প্রতি আপনার اهتمامের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যায়।
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস ও ঘুমের দুআ পড়ুন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন; ভয় পেলে আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমান।
- যদি বারবার এমন হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
«وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ» "আর অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে; তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।" — সূরা আল-আনআম, আয়াত ৫৯
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অহেতুক ভয় থেকে হেফাজত করুন। আমীন।