"ভার্সিটিতে পড়া অবিবাহিত মেয়ের ইসলামী জীবনযাপন, বিবাহ না হলে করণীয়, মাহরাম না থাকলে করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.ভার্সিটিতে পড়া একজন মেয়ে যার বিয়ে হচ্ছে না(চেষ্টা করেও হচ্ছে না)।সে তার দৈনন্দিন জীবনকে ইসলাম অনুযায়ী কীভাবে সাজাবে?
২।তার কখনো বিয়ে না হলে কীভাবে তার সারাজীবনকে ইসলাম অনু্যায়ী সাজাবে?তার বাবা ছাড়া দায়িত্বশীল মাহরাম নেই।আল্লাহ চায়নি বলে হয়নি।এ অবস্থায় কীভাবে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকবে?সে চাকরি করতে চায় না।রিযিক এর জন্য কীভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখবে?
Answer
মেয়েদের করণীয়: বিবাহ না হলে ইসলামী জীবনযাপন
উত্তর (সংক্ষিপ্ত):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ইসলামে বিবাহ একটি সুন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তবে তা প্রতিটি মানুষের জন্য ফরজ নয়। কেউ যদি চেষ্টা করার পরও বিবাহ না হয়, তবে তা আল্লাহর হুকুম ও ফায়সালা। এ অবস্থায় হতাশ না হয়ে ইসলামী জীবনযাপন করা সম্ভব এবং তা-ই কাম্য।
১. ভার্সিটিতে পড়া অবিবাহিত মেয়ের দৈনন্দিন ইসলামী জীবনযাপন
ক. ইবাদত ও আত্মশুদ্ধি
-
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা — এটি জীবনের মূল ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا "নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা নিসা: ১০৩)
-
কুরআন তিলাওয়াত প্রতিদিন অন্তত কিছু অংশ — অর্থসহ বুঝে পড়া উত্তম। (মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শাফি রহ.)
-
তাহাজ্জুদ, দুহা, তাসবিহ-তাহলিল, দরুদ শরিফ — নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।
-
ইস্তিগফার ও দুআ — বিশেষত বিবাহের জন্য দুআ:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ "হে আমার রব! আমি আপনার নিকট থেকে যে কল্যাণ আসে তার মুখাপেক্ষী।" (সূরা কাসাস: ২৪)
খ. শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন
-
ভার্সিটির পড়াশোনা নিয়ত সহকারে করা — যেন দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞান অন্বেষণ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)
-
শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা — ফরজ ইলম (নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম) শেখা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। (বাহিশতী জেওর, হাকিমুল উম্মত থানভী রহ.)
গ. পর্দা ও সামাজিক জীবন
-
হিজাব-পর্দা কঠোরভাবে পালন করা — চোখের পর্দা, চলাফেরার পর্দা, কথাবার্তার পর্দা। আল্লাহ বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ "মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করবে।" (সূরা নূর: ৩১)
-
পুরুষদের সাথে মেলামেশা পরিমিত ও শরীয়তসম্মত রাখা — পড়াশোনার প্রয়োজনে কথা বলা জায়েজ, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে বিরত থাকা।
-
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সতর্কতা — অপ্রয়োজনীয় ছবি, ভিডিও, চ্যাট পরিহার করা।
ঘ. চরিত্র ও আত্মগঠন
-
সতীত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা করা — আল্লাহ বলেন:
وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ "যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে, যতক্ষণ আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করেন।" (সূরা নূর: ৩৩)
-
রোজা রাখা — রাসূল ﷺ বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ... وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ "হে যুবকগণ! যার সামর্থ্য আছে সে বিবাহ করুক... আর যার সামর্থ্য নেই সে রোজা রাখুক।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)
-
ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা — আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
২. সারাজীবন অবিবাহিত থাকলে ইসলামী জীবনযাপন
ক. আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা (রিদা বিল-কাদা)
-
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো কোনো বিষয় ভালোবাস, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)
-
রাসূল ﷺ-এর হাদিস:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ "মুমিনের সব অবস্থাই বিস্ময়কর, তার সব কাজই কল্যাণকর।" (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)
-
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন: বান্দার উপর বিপদ আসলে ধৈর্য ও শোকর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬)
খ. মাহরাম না থাকা অবস্থায় জীবনযাপন
-
বাবা ছাড়া অন্য মাহরাম না থাকলে — ভাই, চাচা, মামা, খালু ইত্যাদি মাহরাম থাকলে তাদের সহায়তা নেওয়া। না থাকলে:
- মহিলাদের সাথে থাকা — নিরাপদ আবাসন, যেমন মহিলা হোস্টেল, আত্মীয়ার বাড়ি।
- প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মহিলা সঙ্গী সাথে রাখা — সফর বা বাইরে যাওয়ার সময়।
- ফিকহি বিধান: মাহরাম ছাড়া সফর করা নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। (সহিহ বুখারি: ১০৮৮; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৫)
-
বিবাহ না হলে — ইসলামে সন্ন্যাসবাদ (রাহবানিয়্যাত) নেই। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَا رَهْبَانِيَّةَ فِي الْإِسْلَامِ "ইসলামে সন্ন্যাসবাদ নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২৯০৮)
-
তবে ইফফাত ও সংযম অবলম্বন করা — এটি ইবাদত।
গ. রিযিকের ব্যবস্থা ও তাওয়াক্কুল
-
চাকরি না করতে চাইলে — ইসলামে নারীর জন্য চাকরি ফরজ নয়। তবে উপার্জনের বৈধ পথ থাকা প্রয়োজন:
- উত্তরাধিকার — পিতার সম্পত্তিতে শরীয়ত অনুযায়ী অংশ।
- মোহর — বিবাহ না হলে প্রযোজ্য নয়।
- আত্মীয়দের সহায়তা — ভাই, চাচা, মামা ইত্যাদির দায়িত্ব।
- সরকারি/সমাজসেবা — যাকাত, ফিতরা, দান।
- হালাল ব্যবসা — ঘরে বসে হালাল উপার্জন (যেমন: সেলাই, হস্তশিল্প, অনলাইন হালাল ব্যবসা)।
-
তাওয়াক্কুলের মূল কথা: আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)
-
রাসূল ﷺ-এর হাদিস:
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ "যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন।" (সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪)
-
তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ত্যাগ নয় — বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে আল্লাহর উপর ভরসা করা। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৩)
ঘ. সমাজে ভূমিকা ও দায়িত্ব
- দাওয়াত ও শিক্ষা — নারীদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, কুরআন শিক্ষা, হাদিস শিক্ষা।
- সমাজসেবা — এতিম, বিধবা, অসহায়দের সহায়তা।
- পরিবারের দায়িত্ব — বাবা-মায়ের সেবা, ভাই-বোনের যত্ন।
- ইবাদতের মাধ্যমে জীবন সাজানো — নামাজ, রোজা, দান, জিকির।
ঙ. মানসিক ও আত্মিক সুস্থতা
-
হতাশা নয়, ধৈর্য — আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
-
দুআ ও জিকির — দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।" (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)
-
পরামর্শ: নিয়মিত দ্বীনি পরিবেশে থাকা, দ্বীনি বই পড়া, দ্বীনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | ইবাদত | ৫ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত | | পর্দা | হিজাব, দৃষ্টি সংযত, মেলামেশা পরিমিত | | শিক্ষা | দ্বীনি ও দুনিয়াবি ইলম অর্জন | | রিযিক | হালাল উপার্জন, তাওয়াক্কুল, আত্মীয়দের সহায়তা | | মানসিক | ধৈর্য, দুআ, আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্টি | | সমাজ | দাওয়াত, সমাজসেবা, পরিবারের যত্ন |
মূল কথা: বিবাহ না হওয়া আল্লাহর ফায়সালা। এতে হতাশ না হয়ে ইবাদত, ইলম, পর্দা ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে জীবন সাজানোই মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যকারীদের সাথে আছেন।
وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)
রেফারেন্স:
- আল-কুরআনুল কারিম (সূরা নিসা: ১০৩; নূর: ৩১, ৩৩; বাকারা: ২১৬; তালাক: ৩; কাসাস: ২৪; আলে ইমরান: ১৭৩)
- সহিহ বুখারি: ৫০৬৫, ১০৮৮
- সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯
- সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৪
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪
- মুসনাদ আহমাদ: ২২৯০৮
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃ. ৫৬
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২, পৃ. ৪৬৫; খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৩
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি রহ.)
والله أعلم بالصواب