নবী (সা.)-এর শানে গজল বারবার শোনা ও বিরক্ত লাগা সম্পর্কে ইসলামি বিধান, খাটে বসা অবস্থায় কুরআন পড়া এবং ওজু ছাড়া কুরআন দেখে-দেখে পড়া সম্পর্কে জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6441
Questioner: No name
Question Asked: 05 Oct 2026, 09:14 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 09:52 PM
Views: 13
Tokens: 4,393
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
উস্তাজ আমার বাসার বাচ্চারা একটা গজল শুনে যেটা নবি (সাঃ) কে নিয়ে গাওয়া। কিন্তু দিনের মধ্যে অনেক বার শুনে। আজকে আমি ওদেরকে বলেছিলাম যে বাবা একটা গজল এত শুনতে তো বিরক্ত লাগে। এটাতে কি গুনাহ হবে উস্তাজ?

উস্তাজ কেউ যদি খাটে বসে থাকে আর আমি নিচে বসে ফোনের মধ্যে কুরআন পড়ি তাহলে কি বেয়াদবী হবে?

ওজু না থাকা অবস্থায় কি কোথাও লেখা কুরআনের আয়াত পড়া যাবে দেখে দেখে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্ন তিনটি। প্রতিটির উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হচ্ছে।


প্রথম প্রশ্ন: নবী (সা.)-এর শানে গাওয়া গজল বারবার শোনা এবং "বিরক্ত লাগে" বলা

বিশ্লেষণ

১. নবী (সা.)-এর শানে গজল/না'ত শোনা: এতে মূলত কোনো গুনাহ নেই, বরং নবী (সা.)-এর প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এটি জায়েয। তবে শর্ত হলো—এতে কোনো শিরকি কথা, নবী (সা.)-কে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা, কিংবা শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকা।

২. "বিরক্ত লাগে" বলা: এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

  • যদি বিরক্তি গজলের বিষয়বস্তু বা নবী (সা.)-এর প্রশংসার প্রতি হয় — তাহলে এটি কুফরি ও ঈমান বিধ্বংসী। (নাউযুবিল্লাহ)
  • যদি বিরক্তি শুধু বারবার একই জিনিস শোনার কষ্ট বা একঘেয়েমির কারণে হয় — যেমন কেউ একই গান বারবার শুনলে বিরক্ত লাগে — তাহলে এটি গুনাহ নয়। কারণ এটি নবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননা নয়, বরং পুনরাবৃত্তির একঘেয়েমি।

৩. তবে সতর্কতা: মুমিনের উচিত নবী (সা.)-এর শানে গজল/না'ত শোনার সময় আদব রক্ষা করা। বাচ্চাদের শেখানো উচিত যেন তারা ভালোবাসা ও আদবের সাথে শোনে, শুধু বিনোদনের বস্তু হিসেবে না শোনে।

ফাতওয়া

আপনার প্রশ্নে আপনি বলেছেন "একটা গজল এত শুনতে তো বিরক্ত লাগে" — যদি আপনি শুধু বারবার শোনার একঘেয়েমির কারণে বিরক্ত হয়েছেন, তাহলে গুনাহ হবে না। কিন্তু যদি বিরক্তি নবী (সা.)-এর প্রশংসা বা গজলের বিষয়বস্তুর প্রতি হয়, তাহলে সেটি মারাত্মক গুনাহ ও ঈমানের জন্য বিপদ।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৭৫৪ (কুফরি ও ঈমান বিধ্বংসী বিষয়)
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৮-১৮০
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৮৭

দ্বিতীয় প্রশ্ন: কেউ খাটে বসে, আমি নিচে বসে ফোনে কুরআন পড়ি — এতে কি বেয়াদবী হবে?

বিশ্লেষণ

১. কুরআন তিলাওয়াতের আদব: কুরআন তিলাওয়াতের সময় আদব রক্ষা করা মুস্তাহাব। তবে নিচে বসে কুরআন পড়া নিজে কোনো বেয়াদবী নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো উঁচু স্থানে, কখনো নিচু স্থানে বসে কুরআন পড়েছেন।

২. প্রশ্ন হলো — কুরআনের বেয়াদবী কার প্রতি? কুরআনের বেয়াদবী হলো কুরআনের প্রতি, মানুষের প্রতি নয়। কেউ খাটে বসে আছে — এতে কুরআনের কোনো অবমাননা হয় না। আপনি নিচে বসে পড়ছেন — এতেও কুরআনের অবমাননা হয় না।

৩. তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের উপর বসে, কুরআনকে পায়ের নিচে রাখে, অথবা কুরআন পড়ার সময় অসম্মানজনক ভঙ্গিতে থাকে — তাহলে সেটি বেয়াদবী।

ফাতওয়া

কেউ খাটে বসে থাকা এবং আপনি নিচে বসে ফোনে কুরআন পড়া — এতে বেয়াদবী হবে না। এটি জায়েয। তবে উত্তম হলো কুরআন তিলাওয়াতের সময় সম্ভব হলে কিবলামুখী হয়ে, সুন্দর ভঙ্গিতে বসা এবং আদব রক্ষা করা।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৪৬ (কুরআন তিলাওয়াতের আদব)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩১৫
  • মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩ (সূরা মুযযাম্মিলের তাফসীর)

তৃতীয় প্রশ্ন: ওজু না থাকা অবস্থায় লেখা কুরআনের আয়াত দেখা-দেখা পড়া যাবে কি?

বিশ্লেষণ

হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:

১. কুরআন স্পর্শ করা: ওজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম। দলিল:

«لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ» "পবিত্রগণ ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করবে না।" (সূরা ওয়াকিয়া: ৭৯)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

«لَا تَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا وَأَنْتَ طَاهِرٌ» "তুমি পবিত্র না হয়ে কুরআন স্পর্শ করো না।" (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস ৪৬৮; সুনানে দারেমি, হাদিস ২২৬৬)

২. দেখা-দেখা পড়া : ওজু ছাড়া লেখা কুরআন দেখা-দেখা পড়া — অর্থাৎ শুধু চোখ দিয়ে দেখে পড়া, স্পর্শ না করা — হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী জায়েয। কারণ নিষেধাজ্ঞা হলো স্পর্শের উপর, দর্শনের উপর নয়।

৩. তবে উত্তম: ওজু করে পড়া উত্তম ও সওয়াবের দিক থেকে বেশি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ওজু ছাড়া কুরআন দেখা-দেখা পড়া মাকরূহ নয়, তবে ওজু থাকা উত্তম।

৪. ফোন/ডিজিটাল স্ক্রিন: ফোনের স্ক্রিনে কুরআন দেখা-দেখা পড়া — এতে কুরআন স্পর্শ হয় না (স্ক্রিন স্পর্শ করলেও তা কুরআনের লেখা নয়, বরং ডিভাইস)। তাই ওজু ছাড়া ফোনে কুরআন দেখা-দেখা পড়া জায়েয।

ফাতওয়া

ওজু না থাকা অবস্থায় লেখা কুরআনের আয়াত দেখা-দেখা পড়া যাবে — শর্ত হলো কুরআনের লেখা বা কুরআন শরিফ স্পর্শ করা যাবে না। ফোন বা ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখা-দেখা পড়াও জায়েয।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৪
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩
  • আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৩
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৫

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. গজল বারবার শুনে বিরক্ত লাগা | যদি শুধু একঘেয়েমির কারণে হয় — গুনাহ নেই। নবী (সা.)-এর প্রশংসার প্রতি বিরক্তি হলে — কুফরি | | ২. খাটে বসা অবস্থায় নিচে বসে কুরআন পড়া | বেয়াদবী নয়, জায়েয | | ৩. ওজু ছাড়া লেখা কুরআন দেখা-দেখা পড়া | জায়েয, তবে স্পর্শ করা যাবে না |


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.