বিসমিল্লাহ বা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নাম লিখা চিরকুট কি খুজে খুজে বের করতে হবে? ও বিবিধ মাসআলা ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।আমার বিদেশে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো। এখন আমি যদি মনে বা ভিতরে বলি মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে বলি নাই আল্লাহ পাক রাসুল সাঃ উনাদের বা ইসলামিক কিছু রাস্তায়, বাজারে পরে থাকলে আর উঠাতে হবে না ভালো হবে । এরকম মনে বা ভিতরে বলার কারনে বিদেশে গেলে গোনা হবে কি ইমানে সমস্যা হবে কি
Answer
প্রশ্ন ১: রাস্তায় আল্লাহ, বিসমিল্লাহ বা নবীজীর নাম লেখা কাগজ পড়ে থাকলে করণীয়
উত্তর:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত বা নবীজীর নাম সম্বলিত যেকোনো বস্তু (কাগজ, কাপড় ইত্যাদি) অপমানিত হওয়া থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব (আবশ্যক) এবং এগুলোকে যথাস্থানে তুলে কোনো পবিত্র স্থানে রাখা বা পুড়িয়ে/কাপড়ে মুড়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়া উচিত। তবে সকল জায়গায় খুঁজে খুঁজে বের করা আবশ্যক নয়। বরং দৃষ্টিগোচর হলে সেটি উঠানো ওয়াজিব হয়ে যায়। যদি দৃষ্টিগোচর না হয়, তবে দায়িত্ব নেই।
➡ হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إن لله حرمات، فمن انتهك شيئًا منها انتقم الله منه"
(আল্লাহর কিছু সম্মানীয় বিষয় রয়েছে, যে সেগুলো লঙ্ঘন করবে আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ নেবেন) – (শরহু মা‘আনিল আসার, ইমাম তাহাবী)
➡ হানাফি কিতাবসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) এ বলা হয়েছে:
"এমন কাগজ বা লেখা দেখা মাত্র উঠানো ওয়াজিব, যাতে আল্লাহ বা নবীজীর নাম থাকে। তবে খুঁজে বেড়ানো জরুরি নয়।" - ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি শফি উসমানি) তে উল্লেখ আছে:
"পথে পড়ে থাকা ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ’ লেখা কাগজ দেখতে পেলে অবশ্যই উঠানো দরকার। উঠানো সম্ভব না হলে কোনো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু সেগুলো খুঁজে বেড়ানো ফরজ নয়।" - বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) বলেছেন:
"আল্লাহর নাম পড়ে থাকলে তা উঠানো জরুরি। তবে যদি অনেক কষ্ট হয়, তবে যতটুকু সামর্থ্য ততটুকু করলেই চলবে।"
সারসংক্ষেপ: আপনার চোখে পড়লেই তুলে ফেলবেন, খুঁজতে হবে না। তবে যদি পড়ে থাকতে দেখেন এবং না তোলেন, তবে গুনাহ হবে। যেহেতু দেখেই উঠানো ওয়াজিব।
প্রশ্ন ২: বিদেশে টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে মনে মনে ‘আল্লাহর নাম লেখা কাগজ আর না তোলাই ভালো’ বললে গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা?
উত্তর:
মনে মনে বা অন্তরে কোনো কথা বলা ও মুখে উচ্চারণ না করা — সাধারণত তা ‘অন্তরের ইচ্ছা’ বা ‘নিয়ত’ হিসেবে গণ্য হয় এবং আমল না করলে শুধু এই নিয়তের জন্য গুনাহ হবে না, যদি না তা দৃঢ় সংকল্প (আজম) হয়ে যায়। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আল্লাহর নামের সম্মানের সাথে সম্পর্কিত।
১. অন্তরের কথা ও গুনাহের হুকুম:
হাদিসে এসেছে:
"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ"
(আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা কাজে পরিণত করে বা মুখে বলে) – (সহিহ বুখারি, মুসলিম)
সুতরাং মনে মনে বললে (মুখে উচ্চারণ না করলে) সরাসরি গুনাহ হবে না, তবে এটি যদি দৃঢ় সংকল্প (আজমে মু‘আক্কাদা) হয়ে যায় যে, “আমি আর কখনো উঠাব না” – তাহলে এটি একটি গুনাহর নিয়ত যা ত্যাগ করার কারণে গুনাহ হতে পারে।
২. ঈমানের উপর প্রভাব:
- এ ধরনের চিন্তা কুফরি বা ঈমান নষ্টকারী নয়, যতক্ষণ না আপনি মনে করেন যে আল্লাহর নাম অপমানিত হওয়া ঠিক বা উচিত।
- তবে এটি ঈমানের দুর্বলতা ও গুনাহের প্রতি উদাসীনতা নির্দেশ করে। এ অবস্থা থেকে তওবা করা ও সংশোধন করা জরুরি।
৩. হানাফি ফিকহের দলিল:
- ফাতাওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া) তে আছে:
"কোনো ওয়াজিব কাজ (যেমন: আল্লাহর নাম অপমান থেকে রক্ষা করা) ত্যাগের সংকল্প গুনাহ, কিন্তু ঈমান ভঙ্গ হয় না।" - ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে:
"অন্তরে যদি কোনো গুনাহের কাজের প্রতি রুচি বা ইচ্ছা থাকে, তবে তা গুনাহ নয়; তবে যখন দৃঢ় সংকল্প হয়, তখন তা নিন্দনীয়।" - রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) থেকে:
"শুধু মনের কথা আমলে পরিণত না হলে বিচার হবে না।"
আপনার করণীয়:
- তওবা করুন: অন্তরে যে চিন্তা এসেছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। মনে মনে বললেও তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
- ভবিষ্যতে সংকল্প করুন: যখনই আল্লাহর নাম লেখা দেখবেন, উঠাতে প্রস্তুত থাকুন। এটি ঈমানের দাবি।
- বিদেশে যাওয়ার নিয়ত: টাকা কামানো বৈধ, তবে সাথে দ্বীনি আমল ও সম্মান রক্ষার চেষ্টা করতে হবে। নিজেকে বোঝান: আল্লাহর নাম রক্ষা করা ছোট কাজ নয় এবং এর বরকত রিজিকেও আসে।
অতএব: আপনার এই মনে মনে বলার কারণে ঈমান নষ্ট হবে না, তবে গুনাহ হতে পারে (যদি দৃঢ় সংকল্প থাকে)। সুতরাং তা ত্যাগ করা ও ভালো সংকল্প করা জরুরি। আল্লাহ তওবা কবুল করুন। (আমীন)