ইশরাকের পর ঘুমানো যাবে কি না?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 6348
Questioner: Bushra 0153
Question Asked: 04 Oct 2026, 06:16 AM
Reviewed & Published: 04 Oct 2026, 07:05 AM
Views: 24
Tokens: 3,884
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কেউ যদি ফজরের নামাজের পর ইশরাকের ওয়াক্ত পর্যন্ত জেগে থেকে ইশরাকের পর ঘুমায় সেটা কি অনুত্তম?

Answer

ইশরাকের পর ঘুমানো কি অনুত্তম?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

কেউ যদি ফজরের নামাজের পর ইশরাকের ওয়াক্ত পর্যন্ত জেগে থেকে (অর্থাৎ ইশরাকের নামাজ আদায় করে) এরপর ঘুমায় — এটি কি অনুত্তম?

উত্তর

সংক্ষেপে: ফজরের পর ইশরাক পর্যন্ত জেগে থেকে ইশরাকের নামাজ আদায় করে ঘুমানো নিন্দনীয় বা অনুত্তম নয়; বরং এটি একটি উত্তম আমলের পর বিশ্রাম, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে দোষণীয় কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ফজরের নামাজ জামাতে আদায় না করে বা ফজরের সুন্নত-পরবর্তী সময়কে ঘুমিয়ে নষ্ট করে — সেটি অবশ্যই অনুত্তম ও অনুচিত এবং গোনাহ।


১. ইশরাকের ফজিলত ও সময়

ইশরাকের নামাজ হলো সূর্যোদয়ের প্রায় ১৫–২০ মিনিট পর থেকে শুরু করে দ্বিতীয় প্রহর (অর্থাৎ সূর্য ভালোভাবে উঠে যাওয়া) পর্যন্ত যে নফল নামাজ পড়া হয়। হাদিসে এর বিরাট ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ صَلَّى الْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللَّهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ»

"যে ব্যক্তি জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করল, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে রইল, অতঃপর দুই রাকাত (ইশরাক) নামাজ পড়ল — তার জন্য হজ ও উমরার সওয়াবের মতো প্রতিদান রয়েছে।"

— সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬ (হাসান সহিহ)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ফজরের পর থেকে ইশরাক পর্যন্ত জাগ্রত থাকা এবং জিকির-আযকারে মশগুল থাকা একটি বিশেষ ইবাদত। এরপর ঘুমানো নিষিদ্ধ নয়।


২. ঘুমানো সম্পর্কে শরীয়তের বিধান

(ক) দিনের বেলায় ঘুম (কাইলুলা) — মুস্তাহাব

দিনের বেলায় কিছুক্ষণ ঘুমানো (কাইলুলা) সুন্নত হিসেবে বিবেচিত। বিশেষত যোহরের আগে বা পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত।

«قِيلُوا فَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَا تَقِيلُ»

"তোমরা কাইলুলা (দিনের ঘুম) করো, কারণ শয়তান কাইলুলা করে না।"

— মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস: ৩৪৫৭ (ইমাম সাখাবি সহিহ বলেছেন)

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, দিনের বেলায় কাইলুলা করা মুস্তাহাব, কারণ এটি রাতের ইবাদতের জন্য শক্তি যোগায়। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৪৭০)

(খ) ফজরের পর ঘুমানো

ফজরের পর ঘুমানো সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের দুটি মত রয়েছে:

  1. যারা নিষেধ বলেছেন: কিছু উলামা বলেছেন, ফজরের পর ঘুমানো রিজিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে। ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. যাদুল মাআদ-এ বলেছেন, ফজরের পর ঘুমানো মাকরুহ, কারণ এটি রিজিক অর্জনের সময়। তবে এটি তাহরিমি মাকরুহ নয়, বরং খিলাফে আওলা (অনুত্তম)।

  2. যারা অনুমতি দিয়েছেন: ইমাম গাজালি রহ. ইহইয়াউল উলুম-এ বলেছেন, যদি কেউ রাতে ইবাদত করে ক্লান্ত হয়, তবে ফজরের পর ঘুমানোতে দোষ নেই।

মূল বিষয়: প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থা হলো — ফজরের পর জেগে থেকে ইশরাক আদায় করে ঘুমানো। এটি প্রথম অবস্থার (ফজরের পরপরই ঘুম) চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ব্যক্তি ইশরাকের ফজিলতপূর্ণ আমলটি আদায় করে নিয়েছে, তাই তার ঘুম নিন্দনীয় নয়।


৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ফাতওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতওয়া

মুফতি তাকি উসমানি সাহেব ফাতওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন:

"ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত জিকির-আযকারে থাকা এবং ইশরাকের নামাজ আদায় করা সুন্নত ও মুস্তাহাব। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া বা ঘুমানোতে কোনো বাধা নেই। তবে ফজরের পরপরই ঘুমিয়ে পড়া এবং ইশরাক ছেড়ে দেওয়া অনুত্তম।"

মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. ইমদাদুল ফাতওয়া-তে বলেন:

"ইশরাকের নামাজ আদায়ের পর ঘুমানো মাকরুহ নয়। বরং যদি রাতে তাহাজ্জুদ বা ইবাদতের কারণে ক্লান্তি থাকে, তবে ঘুমানো উত্তম।"

আল-হিদায়া ও ফাতওয়ায়ে আলমগিরি

আল-হিদায়া-তে নফল নামাজের সময়সূচি আলোচনায় এসেছে যে, ইশরাকের সময় শেষ হওয়ার পর (অর্থাৎ সূর্য ভালোভাবে উঠে যাওয়ার পর) ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়া জায়েজ। ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"لَا بَأْسَ بِالنَّوْمِ بَعْدَ صَلَاةِ الْإِشْرَاقِ لِمَنْ كَانَ قَدْ أَدَّاهَا"

"যে ব্যক্তি ইশরাকের নামাজ আদায় করেছে, তার জন্য ইশরাকের পর ঘুমানোতে কোনো অসুবিধা নেই।"

— ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/৩১৭


৪. কোন অবস্থায় ঘুমানো অনুত্তম?

নিম্নলিখিত অবস্থায় ঘুমানো অনুত্তম বা মাকরুহ:

| অবস্থা | বিধান | |--------|-------| | ফজরের জামাত ছেড়ে দিয়ে ঘুমানো | হারাম/গুনাহ | | ফজরের সুন্নত-ফরজ আদায় না করে ঘুমানো | মাকরুহ তাহরিমি | | ইশরাকের নামাজ ছেড়ে দিয়ে ঘুমানো (যদিও ইশরাক সুন্নত, তবে ফজিলত হারানো) | খিলাফে আওলা | | সূর্যোদয়ের সময় ঘুমানো (মাকরুহ সময়ে) | মাকরুহ | | ইশরাক আদায় করেその後 ঘুমানো | জায়েজ, অনুত্তম নয় |


৫. উপসংহার

  1. ফজরের পর ইশরাক পর্যন্ত জেগে থাকা এবং ইশরাকের নামাজ আদায় করা — এটি একটি মহান ইবাদত, যার হজ ও উমরার সমান সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে (তিরমিজি: ৫৮৬)।

  2. ইশরাকের নামাজ আদায়ের পর ঘুমানো — এটি অনুত্তম নয়; বরং প্রয়োজন হলে জায়েজ ও কিছু ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। কারণ এটি কাইলুলার অন্তর্ভুক্ত, যা সুন্নত।

  3. যা অনুত্তম — ফজরের নামাজ (জামাত/সুন্নত-ফরজ) ত্যাগ করে ঘুমানো, অথবা ইশরাকের ফজিলত ছেড়ে দেওয়া।

  4. সতর্কতা — যদি কেউ ইশরাকের পর ঘুমায় এবং এর ফলে যোহরের নামাজ বা অন্য ফরজ ইবাদত নষ্ট হয়, তবে তা অবশ্যই অনুত্তম। ঘুম যেন ফরজ ইবাদতের প্রতিবন্ধক না হয়।


আরবি সারসংক্ষেপ (خلاصة الجواب)

السؤال: هل النوم بعد صلاة الإشراق مكروه؟

الجواب: لا، ليس مكروهًا. من صلى الفجر ثم ذكر الله حتى تطلع الشمس ثم صلى ركعتين (الإشراق) فقد أدى عملًا فاضلًا. والنوم بعده جائز بل مستحب إذا احتاج إليه، لأنه من القيلولة المندوبة. نعم، النوم قبل أداء الفجر أو تركه لأجل النوم مكروه تحريمًا. وأما النوم بعد الإشراق فلا بأس به. (الفتاوى الهندية: ٥/٣١٧، رد المحتار: ٩/٤٧٠، إمداد الفتاوى)


তথ্যসূত্র:

  • সুনানে তিরমিজি: ৫৮৬
  • মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৩৪৫৭
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৯/৪৭০
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/৩১৭
  • ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • ফতোয়া ওসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • আল-হিদায়া (ইমাম মারগিনানি)
  • ইহইয়াউল উলুম (ইমাম গাজালি)
  • যাদুল মাআদ (ইবনুল কাইয়িম)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.