আল্লাহ তায়ালা কি সর্বত্র বিরাজমান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আল্লাহ তায়ালা কি সর্বত্র বিরাজমান? — আকীদা বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা
উত্তর (সংক্ষেপে):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত তথা হানাফি মাজহাবের আকীদা হলো—আল্লাহ তায়ালা তাঁর যাত (সত্তা) দিয়ে আরশের উপর সমুন্নত ও প্রতিষ্ঠিত, আর তাঁর ইলম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা), রহমত ও তত্ত্বাবধান দ্বারা সর্বত্র বিরাজমান। অর্থাৎ "সর্বত্র বিরাজমান" কথাটি যদি ইলম ও কুদরত অর্থে বলা হয়, তবে তা সঠিক; আর যদি যাত (সত্তা) অর্থে বলা হয় যে আল্লাহর সত্তা প্রত্যেক জায়গায় মিশে আছে বা পরিব্যাপ্ত, তবে তা কুফরি ও ভ্রান্ত আকীদা।
১. কুরআনুল কারীমের দলিল
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ "দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।" — (সূরা ত্বহা: ৫)
ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ "অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।" — (সূরা আরাফ: ৫৪, সূরা ইউনুস: ৩, সূরা রা'দ: ২)
يَخَافُونَ رَبَّهُم مِّن فَوْقِهِمْ "তারা তাদের উপরে অবস্থিত তাদের রবকে ভয় করে।" — (সূরা নাহল: ৫০)
وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ "তিনি সুউচ্চ ও মহান।" — (সূরা বাকারা: ২৫৫)
إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ "পবিত্র বাক্য তাঁরই দিকে উঠে যায়।" — (সূরা ফাতির: ১০)
এই আয়াতগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে আল্লাহর যাত আরশের উপর, সর্বত্র পরিব্যাপ্ত নয়।
২. হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَتَأْمَنُونِي وَأَنَا أَمِينُ مَنْ فِي السَّمَاءِ "তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করো না, অথচ আমি আসমানের উপর অবস্থিত সত্তার বিশ্বস্ত প্রতিনিধি?" — (সহীহ বুখারী: ৪৩৫১, সহীহ মুসলিম: ১০৬৪)
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا "আমাদের রব তাবারাকা ওয়া তাআলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন।" — (সহীহ বুখারী: ১১৪৫, সহীহ মুসলিম: ৭৫৮)
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ الْخَلْقَ: إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي، فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ — (সহীহ বুখারী: ৭৪২২, সহীহ মুসলিম: ২৭৫১)
জাহমিয়া ও মু'তাযিলারা এই হাদীসগুলোকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু আহলুস সুন্নাহর আকীদা হলো—আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) যেমন আছে তেমনিভাবে বিশ্বাস করা, তাশবীহ (সাদৃশ্য দেওয়া) ও তা'তীল (অস্বীকার) ছাড়া।
৩. হানাফি ইমামগণের আকীদা
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বক্তব্য:
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন:
"وَنُقِرُّ بِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، وَلَا يَكُونُ قَرِيبًا مِنْ خَلْقِهِ وَلَا بَعِيدًا مِنْهُمْ" "আমরা স্বীকার করি যে, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর সমুন্নত; তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে (সত্তাগতভাবে) নিকটবর্তীও নন, দূরবর্তীও নন।" — (আল-ফিকহুল আবসাত, ইমাম আবু হানিফা; আল-আকীদা আত-তাহাবিয়া)
ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন:
"تَعَالَى عَنِ الْحُدُودِ وَالْغَايَاتِ وَالْأَرْكَانِ وَالْأَعْضَاءِ وَالْأَدَوَاتِ، لَا تَحْوِيهِ الْجِهَاتُ السِّتُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ" "তিনি সীমা, প্রান্ত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে পবিত্র। ছয় দিক তাঁকে পরিবেষ্টন করে না, যেমনটি নব-আবিষ্কৃত ভ্রান্ত দলগুলো বলে।" — (আল-আকীদা আত-তাহাবিয়া)
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) বলেন:
"وَالْحَاصِلُ أَنَّ مَذْهَبَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى مُتَكَلِّمٌ، وَأَنَّهُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، وَلَا يُشْبِهُ شَيْئًا مِنْ خَلْقِهِ" — (রাদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, আকীদা অধ্যায়)
ইমাম আত-তাহাবি আরও বলেন:
"وَمَنْ لَمْ يَتَوَقَّ عَنْ قَوْلِهِ: هُوَ فِي كُلِّ مَكَانٍ، فَهُوَ كَافِرٌ" "যে ব্যক্তি 'আল্লাহ সর্বত্র আছেন' বলতে সংকোচ করে না (অর্থাৎ যাতগতভাবে সর্বত্র আছে বলে বিশ্বাস করে), সে কাফির।" — (আল-আকীদা আত-তাহাবিয়া, ব্যাখ্যা: ইবনে আবিল ইয)
৪. "সর্বত্র বিরাজমান" বলার সঠিক ও ভুল অর্থ
| অর্থ | হুকুম | |------|-------| | আল্লাহর ইলম, কুদরত, রহমত, শ্রবণ, দর্শন দ্বারা সর্বত্র | ✅ সঠিক | | আল্লাহর যাত (সত্তা) প্রত্যেক জায়গায় মিশে আছে/পরিব্যাপ্ত | ❌ কুফরি ও ভ্রান্ত | | আল্লাহ আরশের উপর যাতগতভাবে সমুন্নত | ✅ সঠিক আকীদা |
মূল কথা: আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) সর্বত্র, কিন্তু যাত (সত্তা) আরশের উপর।
৫. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর বক্তব্য
মুফতি তাকি উসমানি সাহেব বলেন:
"আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর সমুন্নত—এটি আহলুস সুন্নাহর আকীদা। 'সর্বত্র বিরাজমান' কথাটি যদি আল্লাহর ইলম ও কুদরতের দিক থেকে বলা হয়, তবে ঠিক; কিন্তু যাতের দিক থেকে বললে তা ভ্রান্ত।" — (ইসলাম ও আধুনিকতা, আকীদা অধ্যায়)
৬. উপমা দিয়ে বোঝা
সূর্যের আলো পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে পৌঁছায়, কিন্তু সূর্য নিজে আকাশে থাকে। তেমনি আল্লাহর ইলম, কুদরত ও রহমত সর্বত্র, কিন্তু তাঁর যাত আরশের উপর। (এটি শুধু বোঝার জন্য উপমা, আল্লাহর সাথে তুলনা নয়।)
৭. সতর্কতা
- আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) নিয়ে তাশবীহ (সাদৃশ্য দেওয়া) বা তা'তীল (অস্বীকার করা) উভয়ই ভ্রান্ত।
- "আল্লাহ সর্বত্র আছেন" — এই কথাটি মুতলাক (সর্বসাধারণভাবে) বলা উচিত নয়; বরং বলতে হবে: "আল্লাহর ইলম ও কুদরত সর্বত্র, আর তাঁর যাত আরশের উপর।"
- সাধারণ মুসলিমদের উচিত এই মাসআলায় বিতর্ক না করা, বরং আহলুস সুন্নাহর আকীদা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|----------| | আল্লাহর যাত | আরশের উপর সমুন্নত | | আল্লাহর ইলম, কুদরত, রহমত | সর্বত্র | | "সর্বত্র বিরাজমান" (যাত অর্থে) | কুফরি আকীদা | | "সর্বত্র বিরাজমান" (ইলম অর্থে) | সঠিক | | আহলুস সুন্নাহর আকীদা | আল্লাহ আরশের উপর, সিফাত দ্বারা সর্বত্র |
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সঠিক আকীদা বিশ্বাস করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- কুরআনুল কারীম (সূরা ত্বহা: ৫, আরাফ: ৫৪, নাহল: ৫০, বাকারা: ২৫৫)
- সহীহ বুখারী (৪৩৫১, ১১৪৫, ৭৪২২)
- সহীহ মুসলিম (১০৬৪, ৭৫৮, ২৭৫১)
- আল-আকীদা আত-তাহাবিয়া (ইমাম তাহাবি)
- আল-ফিকহুল আবসাত (ইমাম আবু হানিফা)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন শামি)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি)
والله أعلم بالصواب