নন-মাহরামকে দেখলে ওজু ভঙ্গ হয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. নন-মাহরামের সাথে দেখা দিলে কি ওজু ভেঙ্গে যাবে?
২. বিয়ের আমলের ক্ষেত্রে বুজুর্গের একটি আমল প্রসিদ্ধ। সূরা ইয়াসীন ৪০ দিনে ৪১ বার পড়া। অনেকেই নাকি এই আমল করতে করতেই ফল পেয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই আমল টা কি করা যাবে? কি নিয়তে করবো?
৩. বিয়ের কার্যকরী আমল হিসেবে কোন আমল টা করলে তুলনামূলক দ্রুত ফল লাভ করা যাবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. নন-মাহরামের দিকে দেখা বা তার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলে ওজু ভঙ্গ হয় না। তবে কামভাব বা কুপ্রবৃত্তি নিয়ে দেখা হারাম এবং গুনাহ। হাদিসে এসেছে, কামনার সাথে নন-মাহরামের দিকে তাকানো চোখের যিনা। ওজু ভঙ্গের কারণগুলো নির্দিষ্ট—যেমন পেশাব-পায়খানা, বায়ু নির্গত হওয়া, শরীর থেকে রক্ত/পুঁজ ইত্যাদি প্রবাহিত হওয়া, মুখভরে বমি, চিত হয়ে বা কাত হয়ে ঘুমানো ইত্যাদি। নন-মাহরামকে দেখা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
২. সূরা ইয়াসীন ৪০ দিনে ৪১ বার পড়ার যে আমলটি প্রচলিত, এটি হাদিস বা ফিকহের কিতাবে বর্ণিত কোনো প্রমাণিত আমল নয়। এটি সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত একটি আমল। তবে কুরআন তিলাওয়াত নিজে ইবাদত; নিয়ত শুদ্ধ থাকলে সওয়াব হবে। কিন্তু নির্দিষ্ট ৪০ দিন, ৪১ বার—এই সংখ্যা ও পদ্ধতিকে শরিয়তের নির্দেশ বা ওয়াজিব/সুন্নত মনে করা যাবে না। বরং এটিকে সাধারণ দোয়া ও তিলাওয়াত হিসেবে করা যাবে, তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে ফলদাতা একমাত্র আল্লাহ; এই সংখ্যা বা পদ্ধতি নিজে থেকে ফল দেয় না।
৩. বিয়ে সহ যেকোনো বৈধ প্রয়োজন পূরণের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও শরিয়তসম্মত আমল হলো:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার করা।
- দরুদ শরিফ পড়া।
- তাহাজ্জুদে দোয়া করা।
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইয়াসীন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক ইত্যাদি তিলাওয়াত করা—কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা দিনের বাধ্যবাধকতা ছাড়া।
- "رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ" (সূরা কাসাস: ২৪) এবং "رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ" (সূরা বাকারা: ২০১) বেশি পড়া।
- হালাল উপায়ে চেষ্টা করা, হারাম বা কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা।
বিস্তারিত:
১. নন-মাহরামকে দেখা ও ওজু:
ওজু ভঙ্গের কারণগুলো ফিকহের কিতাবে সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে ওজু ভঙ্গের কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে:
- পেশাব, পায়খানা, বায়ু নির্গত হওয়া।
- শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত, পুঁজ বা পানি প্রবাহিত হয়ে এমন স্থানে পৌঁছানো যা ধোয়া ফরজ।
- মুখভরে বমি হওয়া।
- চিত হয়ে, কাত হয়ে বা ভর দিয়ে ঘুমানো।
- নামাজে শব্দসহ হাসা।
- মাতাল বা বেহুঁশ হওয়া।
নন-মাহরাম নারী/পুরুষকে দেখা বা তাদের সাথে কথা বলা, স্পর্শ করা (যদি কামভাব না থাকে) ওজু ভঙ্গের কারণ নয়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে ওজু ভঙ্গের কারণ আলোচনায় দেখাকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। তবে কামভাব নিয়ে দেখা হারাম; এটি ওজু ভঙ্গ করে না, কিন্তু গুনাহ হয় এবং নামাজের একাগ্রতা নষ্ট করে।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "العينان تزنيان وزناهما النظر" — "চোখও যিনা করে, তার যিনা হলো দেখা।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৭)
সুতরাং দেখা ওজু ভঙ্গ করে না, কিন্তু কামনার সাথে দেখা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
২. সূরা ইয়াসীন ৪০ দিনে ৪১ বার পড়ার আমল:
এই আমলটি হাদিস, সাহাবাদের আমল বা ফিকহের কিতাবে প্রমাণিত নয়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ এবং মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা ও দিনের কোনো আমল বর্ণিত নেই। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা ইয়াসীনের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত কিছু হাদিস উল্লেখ করেছেন, তবে সেগুলোতে ৪০ দিনে ৪১ বার পড়ার কোনো নির্দেশ নেই।
তবে কুরআন তিলাওয়াত নিজে ইবাদত। আল্লাহ বলেন: "وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا" — "আর কুরআন তিলাওয়াত কর সুস্পষ্টভাবে।" (সূরা মুজাম্মিল: ৪)
সুতরাং কেউ যদি নিয়ত করে যে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করব এবং দোয়া করব, তবে তা জায়েজ। কিন্তু এই সংখ্যা ও দিনকে শরিয়তের নির্দিষ্ট আমল মনে করা বা এর উপর ভরসা করা ঠিক নয়। ফলদাতা একমাত্র আল্লাহ।
৩. বিয়ের জন্য কার্যকর আমল:
বিয়ে সহ যেকোনো বৈধ প্রয়োজন পূরণের জন্য শরিয়তসম্মত পথ হলো:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আবশ্যক করে নেয়, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন, সব সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৮; মুসনাদে আহমাদ)
- দরুদ শরিফ বেশি পড়া।
- তাহাজ্জুদে দোয়া করা।
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইয়াসীন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক তিলাওয়াত করা—কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা দিনের বাধ্যবাধকতা ছাড়া।
- সূরা কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াতের দোয়া: "رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ" — "হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।"
- সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতের দোয়া: "رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ" — "হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।"
- হালাল উপায়ে চেষ্টা করা, হারাম বা কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা।
والله أعلم بالصواب