"দুর্ঘটনায় মৃত ছাত্রীর জন্য সংগৃহীত ফান্ডের অবশিষ্ট টাকা সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে দান করা জায়েজ কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6288
Questioner: shagor Khan Sagor
Question Asked: 02 Oct 2026, 11:10 PM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 11:36 PM
Views: 11
Tokens: 6,511
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ উস্তাদ।
আমাদের ভার্সিটিতে আমার ডিপার্টমেন্টের একজন ছোট বোন গত ১০ দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় এক্সিডেন্ট করেছিলেন। অপারেশনের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিলো তাই মুলত আমরা যতোটুকু পারি সবার কাছ থেকে অর্থাৎ ভার্সিটি, স্কুল, কলেজ থেকে ফান্ড কালেক্ট করি কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা অনুযায়ী গতে ২ দিন আগে মেয়েটি মারা যায় যার দরুন কালেক্টকৃত ফান্ডের বেশ কিছু টাকা আমাদের কাছে রয়ে গেছে। আমরা চাচ্ছি যে সেই টাকা সদকায় জারিয়ার নিয়তে দান করতে। টাকাটা দান করা কি জায়েজ হবে.? নাকি তার পরিবারকে টাকাটা দিয়ে দিতে হবে.? উনার বাবা মা মোটামুটি সামর্থ্যবান, টাকাটা নিতে চাচ্ছে না তাই আরকি দান করে দিতে চাচ্ছিলাম। যদি দান করা জায়েজ হয় তাহলে কোথায় দান করলে সবচেয়ে বেশি ফায়দা হবে, একটু যদি পরামর্শ দিতেন তাহলে খুবই ভালো হবে ইনশাআল্লাহ।

আমরা চাচ্ছিলাম নতুন তৈরীকৃত মসজিদের প্রয়োজনে বা এতিমখানায় দান করা বিষয়ে। কোনটাতে দান করলে সবচেয়ে বেশি ফায়দা হবে বা এর থেকেও অন্য কোথাও দান করলে বেশি ফায়দা হবে এই বিষয় মেহেরবানি করে পরামর্শ দিলে খুবই মুনাসিব হতো উস্তাদ ইনশাআল্লাহ

Answer

উত্তর: দুর্ঘটনাকবলিত ছাত্রীর জন্য সংগৃহীত ফান্ডের অবশিষ্ট টাকা কোথায় ব্যয় হবে?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রথমেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত ছাত্রীর জন্য দুআ করছি — আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তার পরিবারকে সবর ও সান্ত্বনা দান করুন। আমিন।


১. মূল নীতি: দানের টাকা আমানত (Amanah)

আপনারা যখন "অপারেশনের জন্য" বা "চিকিৎসার জন্য" বলে ফান্ড সংগ্রহ করেছেন, তখন সেই টাকা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে (specific purpose) দানের আমানত হিসেবে গণ্য। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো:

الْأَمَانَةُ تُصْرَفُ فِي الْجِهَةِ الَّتِي عُيِّنَتْ لَهَا "আমানত সেই খাতেই ব্যয় করতে হবে, যে খাতের জন্য তা নির্ধারিত হয়েছে।"

যেহেতু চিকিৎসার উদ্দেশ্য আল্লাহর ফায়সালায় শেষ হয়ে গেছে, তাই এখন এই টাকা সাধারণ সদকার হুকুমে চলে আসবে — অর্থাৎ যেখানে সদকার টাকা লাগে, সেখানেই ব্যয় করা যাবে।


২. টাকা কি দান করা জায়েজ হবে?

হ্যাঁ, জায়েজ হবে — তবে শর্তসহ:

(ক) যদি দাতারা "শুধু এই মেয়ের চিকিৎসার জন্য" বলে দিয়ে থাকেন

তাহলে সেই টাকা তার পরিবারকে ফেরত দেওয়া বা তার নামে সদকায়ে জারিয়া করা — উভয়টিই জায়েজ। তবে ফিকহের দৃষ্টিতে সদকায়ে জারিয়া করা উত্তম, কারণ এতে মৃত ব্যক্তির জন্য সাওয়াবের ধারা অব্যাহত থাকে।

(খ) যদি দাতারা "যেকোনো অসহায় মুসলিমের সাহায্যের জন্য" বলে দিয়ে থাকেন

তাহলে টাকা সাধারণ সদকা হিসেবে যেকোনো নেক খাতে ব্যয় করা জায়েজ।

(গ) যদি দাতারা টাকা ফেরত চান

তাহলে তাদের ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। এমতাবস্থায় দান করা জায়েজ হবে না।

ইসলামী মূলনীতি: "শর্ত অনুযায়ী আমানত আদায় করা" — এটি কুরআন-হাদিসের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দেন আমানতসমূহ তার প্রাপ্য অধিকারীর কাছে পৌঁছে দিতে।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)


৩. পরিবারকে টাকা দেওয়া না দান করা — কোনটি উত্তম?

যেহেতু মৃত ছাত্রীর বাবা-মা সামর্থ্যবান এবং টাকা নিতে চাচ্ছেন না, সেহেতু তাদের জোর করে টাকা দেওয়া আবশ্যক নয়। বরং সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে দান করা উত্তম, কারণ:

  1. মৃত ব্যক্তির জন্য উপকার: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —

    إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ "মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা থেকে উপকার হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)

  2. পরিবারের সম্মান রক্ষা: তারা টাকা নিতে চাচ্ছেন না — এতে তাদের সম্মান ও ইজ্জত রক্ষা হয়।

  3. দাতাদের উদ্দেশ্য পূরণ: দাতারা অসহায় মুসলিমকে সাহায্য করার জন্যই দিয়েছিলেন — সদকায়ে জারিয়ায় সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়।


৪. কোথায় দান করলে সবচেয়ে বেশি ফায়দা হবে?

ফিকহের দৃষ্টিতে সদকার সর্বোত্তম খাত নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য:

(ক) সর্বোত্তম: দ্বীনি ইলম ও দাওয়াহ

فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ عَلَى سَائِرِ النُّجُومِ "আবেদ (ইবাদতকারী) এর উপর আলেমের ফজিলত চাঁদের উপর সমস্ত তারকার ফজিলতের মতো।" (তিরমিজি: ২৬৮৫)

ইলমের প্রচার-প্রসারে দান করলে মৃত ব্যক্তির জন্য আজীবন সাওয়াব প্রবাহিত হতে থাকে।

(খ) এতিমখানা / ইয়াতিমের ভরণপোষণ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —

أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا "আমি এবং এতিমের প্রতিপালক জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকব।" (সহীহ বুখারি: ৬০০৫)

(গ) মসজিদ নির্মাণ

মসজিদ নির্মাণও সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তবে এতিমখানা ও দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাধারণত মসজিদের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায়, কারণ এতে ইলম ও এতিম — উভয়ের সেবা হয়।

(ঘ) অসহায় মুসলিমের চিকিৎসা

যেহেতু মৃত ছাত্রী নিজে চিকিৎসার জন্য কষ্ট পেয়েছেন, তাই অসহায় রোগীর চিকিৎসায় দান তার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে।


৫. ফিকহি অগ্রাধিকার ক্রম (আপনার ক্ষেত্রে)

| ক্রম | খাত | কারণ | |------|------|------| | ১ | দ্বীনি ইলম / মাদরাসা / এতিমখানা | সদকায়ে জারিয়ার সর্বোত্তম রূপ, আজীবন সাওয়াব | | ২ | অসহায় রোগীর চিকিৎসা | মৃত ছাত্রীর অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ | | ৩ | মসজিদ নির্মাণ | সদকায়ে জারিয়া, তবে ইলমের চেয়ে কম | | ৪ | সাধারণ গরিব-দুঃখী | সদকা হিসেবে গ্রহণযোগ্য |


৬. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. দাতাদের জানিয়ে দিন — যারা শুধু এই মেয়ের জন্য দিয়েছিলেন, তাদের অবহিত করুন যে টাকা সদকায়ে জারিয়ায় ব্যয় হবে। কেউ ফেরত চাইলে ফেরত দিন।

  2. মৃত ছাত্রীর নামে সদকায়ে জারিয়া করুন — যেমন: একটি এতিমের মাসিক খরচ, একটি মাদরাসার ছাত্রের ফি, বা একটি কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রে দান।

  3. স্থানীয় বিশ্বস্ত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান বেছে নিন — যেখানে টাকা সঠিক খাতে ব্যয় হয় এবং হিসাব স্বচ্ছ।

  4. তার জন্য দুআ করতে ভুলবেন না — প্রতিটি সদকার সাথে তার জন্য দুআ করুন।


সারসংক্ষেপ

  • ✅ টাকা সদকায়ে জারিয়ার নিয়তে দান করা জায়েজ — যদি দাতারা ফেরত না চান।
  • ✅ এতিমখানা বা দ্বীনি ইলমের প্রতিষ্ঠানে দান সবচেয়ে বেশি ফায়দা হবে।
  • ✅ মৃত ছাত্রীর নামে সদকা করলে তার জন্য আজীবন সাওয়াব প্রবাহিত হবে।
  • ⚠️ কোনো দাতা ফেরত চাইলে ফেরত দেওয়া ওয়াজিব।
  • ⚠️ পরিবারকে জোর করে টাকা দেওয়া আবশ্যক নয়, যেহেতু তারা সামর্থ্যবান ও নিতে চাচ্ছেন না।

আল্লাহ তাআলা আপনার এই নেক উদ্যোগ কবুল করুন এবং মৃত ছাত্রীকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.