কুরআনের ক্যালিগ্রাফির উপরে কাপড় রাখা যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি থেকে অধিক উচ্চতায় কোনো কিছু রাখা আমার জানামতে মাকরুহে তাহরীমি। কিন্তু দেয়ালে থাকা পেরেক যদি ক্যালিগ্ৰাফির উপরে থাকে এবং অন্য জায়গায় কাপড় শুকাতে দিলে বাবা-মা ঝামেলা করে তবে প্রয়োজনের কারণে কাপড় রাখা কি জায়েয?
২. যদি বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার সময় তারা নিজেদের মধ্যে শরীয়া বিরোধী বিষয়ে (সিনেমা, কার্টুন ইত্যাদি) কথাবার্তা বলে বা কারো নামে গীবত করে আর আমি যদি একটু দূরে সড়ে যাই এবং এগুলো অবহেলা করি তবে তা কি, গুণাহ থেকে বাঁচতে পারবো?
৩.যদি ওয়ার্ডদ্রবের ভিতর টুপি পায়জামা থাকে এবং অন্য বাসার বাচ্চারা ওয়ার্ডদ্রবের উপর পা রাখে এবং তাদের নিষেধ করলেও যদি তারা না শোনে এতে কি আমার গুণাহ হবে?
৪.নামাজের জন্য ব্যাবহৃত পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবি ঝুলানোর ব্যাবহৃত হ্যাঙ্গার এর কি তাযিম করতে হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নগুলোর উত্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে প্রদান করা হলো:
১. কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফির উপরে পেরেক/কাপড় রাখা
উত্তর:
কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম সংবলিত ক্যালিগ্রাফির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। তবে দেয়ালে থাকা পেরেক যদি ক্যালিগ্রাফির উপরে পূর্ব থেকেই থাকে এবং তা সরানো সম্ভব না হয়, অথবা সরালে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হয় — সেক্ষেত্রে প্রয়োজনের কারণে সেই পেরেকে কাপড় ঝুলানো বা রাখা জায়েয হবে, তবে মাকরুহে তানযীহী ( অপছন্দনীয়) হবে।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ" — "যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, নিশ্চয়ই তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।" (সূরা হজ: ৩২)
- ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে: কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নামের উপরে কোনো বস্তু রাখা বা পা বাড়ানো আদবের খেলাফ। তবে প্রয়োজন ও অসুবিধার কারণে তা করা হলে গুনাহ হবে না, শর্ত হলো — ক্যালিগ্রাফির প্রতি অবমাননার নিয়ত না থাকা।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৮০) ও ফাতাওয়া উসমানী (৩/৫৬২) এ উল্লেখ আছে: কুরআনের আয়াতের প্রতি সম্মান রক্ষা করা ওয়াজিব, তবে প্রয়োজনে সামান্য অসুবিধা হলে তা ক্ষমার যোগ্য।
সারসংক্ষেপ: বাবা-মায়ের ঝামেলা এড়াতে এবং প্রয়োজনের কারণে ক্যালিগ্রাফির উপরে থাকা পেরেকে কাপড় রাখা জায়েয, তবে সম্ভব হলে অন্য জায়গা খুঁজে নেওয়া উত্তম।
২. বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়ে শরীয়া-বিরোধী কথাবার্তা ও গীবত
উত্তর:
আপনি যদি বন্ধুদের শরীয়া-বিরোধী কথাবার্তা (সিনেমা, কার্টুন ইত্যাদি) বা গীবত থেকে দূরে সরে যান এবং অবহেলা করেন (অর্থাৎ তাতে অংশগ্রহণ না করেন, সমর্থন না করেন), তাহলে আপনি গুনাহ থেকে বাঁচবেন — ইনশাআল্লাহ।
তবে শর্ত হলো:
- আপনি নিজে সেই গীবত বা খারাপ কথায় অংশ নেবেন না।
- সমর্থন করবেন না (যেমন: হাসি, উৎসাহ দেওয়া, সমর্থনসূচক মন্তব্য)।
- সম্ভব হলে নিষেধ করবেন বা বিষয় পরিবর্তন করবেন।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ" — "যখন তারা অনর্থক কথা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।" (সূরা কাসাস: ৫৫)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ" — "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮, সহীহ মুসলিম: ৪৭)
- গীবত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: "وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا" — "তোমরা একে অপরের গীবত করো না।" (সূরা হুজুরাত: ১২)
সতর্কতা: যদি আপনি মজলিসে উপস্থিত থেকে চুপ থাকেন এবং গীবত শোনেন, তবে গীবত শোনাও গুনাহ। তাই দূরে সরে যাওয়া বা মজলিস ত্যাগ করা উত্তম। রাদ্দুল মুহতার (৬/৪০১) এ উল্লেখ আছে: গীবত শোনা ও গীবতকারীর সাথে বসা — উভয়ই গুনাহ, যদি নিষেধ করার ক্ষমতা না থাকে তবে মজলিস ত্যাগ করা উচিত।
সারসংক্ষেপ: আপনি যদি দূরে সরে যান, অংশগ্রহণ না করেন এবং অবহেলা করেন — তবে আপনি গুনাহ থেকে বাঁচবেন। তবে সম্ভব হলে মজলিস ত্যাগ করাই সর্বোত্তম।
৩. ওয়ার্ডরোবের ভিতরে টুপি-পায়জামা থাকলে অন্য বাচ্চারা পা রাখলে
উত্তর:
যদি আপনার ওয়ার্ডরোবের ভিতরে টুপি-পায়জামা (নামাজের পোশাক) সংরক্ষিত থাকে এবং অন্য বাসার বাচ্চারা ওয়ার্ডরোবের উপরে পা রাখে বা তাতে উঠে পড়ে — এবং আপনি নিষেধ করলেও তারা না শোনে — তাহলে আপনার কোনো গুনাহ হবে না।
কারণ:
- আপনি নিষেধ করেছেন — অর্থাৎ আপনার পক্ষ থেকে কর্তব্য পালন করেছেন।
- বাচ্চারা অপ্রাপ্তবয়স্ক — তাদের আমল আপনার উপর বর্তাবে না।
- আপনি বাধ্য নন অন্যের বাচ্চাকে শাসন করার, বিশেষ করে যদি তারা আপনার অধীনস্থ না হয়।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا" — "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ" — "যখন আমি তোমাদের কোনো أمر দিই, তখন তোমরা সামর্থ্য অনুযায়ী তা পালন করো।" (সহীহ বুখারী: ৭২৮৮)
তবে করণীয়:
- সম্ভব হলে নামাজের পোশাক আলাদা নিরাপদ স্থানে বা উঁচু তাকে সংরক্ষণ করুন।
- ওয়ার্ডরোবের দরজা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করুন।
- বাচ্চাদের নরমভাবে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
সারসংক্ষেপ: আপনি নিষেধ করেছেন এবং আপনার সামর্থ্যের বাইরে — তাই আপনার গুনাহ হবে না। তবে পোশাক নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা উত্তম।
৪. নামাজের পাঞ্জাবি ও হ্যাঙ্গারের তাযিম
উত্তর:
প্রশ্নে "তাযিম" শব্দটি সম্ভবত "তাহারাত" (পবিত্রতা) বা "তাযীন" (সাজানো) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যদি উদ্দেশ্য পবিত্রতা (তাহারাত) হয়, তবে:
- নামাজের পাঞ্জাবি: যদি তাতে নাজাসাত (অপবিত্রতা) লেগে থাকে, তবে তা ধুয়ে পবিত্র করা ওয়াজিব। আর যদি পবিত্র থাকে, তবে তাহারাতের প্রয়োজন নেই।
- হ্যাঙ্গার: হ্যাঙ্গার সাধারণত ধাতু বা প্লাস্টিকের হয়, যা নিজে থেকেই পবিত্র। তবে যদি তাতে নাজাসাত লেগে থাকে, তবে ধুয়ে নেওয়া উচিত।
যদি উদ্দেশ্য "তাযীন" (সাজানো/গোছানো) হয়:
- নামাজের পাঞ্জাবি ভাঁজ করে পরিষ্কার স্থানে রাখা সুন্নতের আদব।
- হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা জায়েয, তবে ভাঁজ করে রাখা উত্তম।
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ" — "নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ৯১)
- রাদ্দুল মুহতার (১/৩০০) এ উল্লেখ আছে: পবিত্র কাপড় পবিত্র স্থানে রাখা উচিত।
সারসংক্ষেপ:
- তাহারাত উদ্দেশ্য হলে: নাজাসাত থাকলে ধুয়ে নিন, না থাকলে প্রয়োজন নেই।
- তাযীন উদ্দেশ্য হলে: পাঞ্জাবি ভাঁজ করে পরিষ্কার স্থানে রাখা উত্তম, হ্যাঙ্গারে ঝুলানোও জায়েয।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. ক্যালিগ্রাফির উপরে পেরেকে কাপড় | প্রয়োজনে জায়েয, তবে মাকরুহে তানযীহী | | ২. বন্ধুদের গীবত/খারাপ কথা | দূরে সরে গেলে ও অংশ না নিলে গুনাহ নেই | | ৩. বাচ্চারা পা রাখলে | নিষেধ করলে আপনার গুনাহ নেই | | ৪. পাঞ্জাবি ও হ্যাঙ্গার | নাজাসাত থাকলে ধুয়ে নিন, নাহলে প্রয়োজন নেই |
দুআ
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝার তাওফিক দান করুন এবং গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب