হোটেলে গ্লাস ভাঙলে জরিমানা দিতে হবে কি ? দোকানের মেঝেতে কাদা লাগালে মাফ চাওয়া লাগবে কি? এশার পর পড়াশোনা করা যাবে কি ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. একবার একটি হোটেলে আমি টেবিলে আমার ব্যাগ রেখেছিলাম কিন্তু তখনই হঠাৎ করে টেবিলে থাকা একটি গ্লাস মেঝেতে পরে ভেঙ্গে যায়। আমার প্রবল ধারণা যে গ্লাসটি আমার কারণে ভাঙ্গেনি আর গ্লাস ভাঙ্গার কারণে ঐখানে থাকা স্টাফরা আমাকে তেমন কিছু বলেনি এবং জরিমানা দাবিও করেনি। এক্ষেত্রে আমার উপর কি ঐ গ্লাসের দাম পরিশোধ করা কি আবশ্যক?
২.একবার বৃষ্টির মধ্যে আমি একটি দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলাম এবং দোকানদার একটি সাইডে দাঁড়াতে বলেছিল কিন্তু আমি বাহিরের অবস্থা দেখার জন্য একটু সামনে গিয়েছিলাম ফলে ঐ দোকানের মেঝেতে ভুল করে আমার জুতা থেকে কাদা লেগে গিয়েছিল এজন্য দোকানদার হালকা কিছু কথা শুনিয়েছিল। আমার প্রবল ধারণা সে হয়ত ঐ কাদা পরিষ্কার করে ফেলেছিল।এখন এই কারণে ঐ দোকানদার এর কাছে মাফ চেতে হবে কি?
৩.এশার পর কোন কোন কাজ করা অনর্থক ও মাকরুহ?
৪.কোনো দ্বীনি বা দুনিয়াবি গুরুত্বপূর্ণ কাজ (যেমন পড়াশোনা, অনলাইন ব্যাবসা, কোর্স ইত্যাদি) যদি গাফিলতির কারণে এশার আগে আদায় করা সম্ভব না হয় তবে কি ঐ কাজগুলো এশার পর আদায় করা যাবে? এবং এই গাফলতির কারণে কি গুণাহ হবে?
Answer
উত্তর (ফতোয়া)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
প্রশ্ন ১: হোটেলের গ্লাস ভেঙে যাওয়া প্রসঙ্গে
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী গ্লাসটি আপনার সরাসরি فعل (কাজ) বা আঘাতের কারণে ভাঙেনি; বরং হঠাৎ করে মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেছে। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো:
«لَا ضَمَانَ إِلَّا بِالتَّعَدِّي أَوِ التَّقْصِير» (ক্ষতিপূরণ কেবল তখনই আবশ্যক হয় যখন সরাসরি অন্যায় হস্তক্ষেপ বা অবহেলা থাকে।)
যেহেতু আপনার পক্ষ থেকে কোনো تعدّی (সীমালঙ্ঘন) বা تقصير (অবহেলা) প্রমাণিত নয়, এবং হোটেল কর্তৃপক্ষও কোনো জরিমানা দাবি করেনি, সেহেতু আপনার উপর ঐ গ্লাসের দাম পরিশোধ করা আবশ্যক নয়। তবে যদি আপনার প্রবল ধারণা হয় যে আপনার ব্যাগ রাখার কারণেই গ্লাসটি পড়ে ভেঙেছে (যেমন ব্যাগের আঘাতে), তাহলে সতর্কতা হিসেবে দাম পরিশোধ করা বা মালিককে জানানো উত্তম হবে। কিন্তু বর্তমান বর্ণনায় তা আবশ্যক নয়।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৪৫-১৪৬ (কিতাবুল গাসব)
- আল-হিদায়া, কিতাবুল গাসব
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২৭-৪২৮
প্রশ্ন ২: দোকানের মেঝেতে কাদা লাগানো প্রসঙ্গে
আপনি দোকানদারের অনুমতি ছাড়া সামনে এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে কাদা লাগিয়েছেন। এটি একটি সামান্য অবহেলা (تقصير) ছিল। তবে দোকানদার হালকা কথা বলে বিষয়টি শেষ করেছেন এবং সম্ভবত তিনি নিজেই পরিষ্কার করে ফেলেছেন। যদি আপনি তার সাথে দেখা করেন এবং হাসিমুখে ক্ষমা চেয়ে নেন, তবে তা উত্তম আখলাকের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে যেহেতু পরবর্তীতে তেমন আর কিছু বলেননি, তাই ওয়াজিব নয়।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৪৫
- বেহেশতি জেওর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২৭ (মুআমালাত অধ্যায়)
প্রশ্ন ৩: এশার পর কোন কাজগুলো অনর্থক ও মাকরুহ?
হাদীস শরীফে এশার পর তিন ধরনের কাজ নিষিদ্ধ বা মাকরুহ বলা হয়েছে:
১. অনর্থক গল্প-গুজব, আড্ডা, সময় নষ্ট করা — রাসূলুল্লাহ ﷺ এশার পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা অপছন্দ করতেন।
২. দ্বীনি ইলম ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেরি করে ঘুমানো — যেমন টিভি, সিনেমা, গেমস ইত্যাদি।
৩. এশার সুন্নত-নফল ও ঘুমের আগের আমল ছাড়া অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা — যেমন ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হবে এমন কাজ।
তবে দ্বীনি ইলম অর্জন, ইবাদত, জরুরি সফর, অতিথি সেবা, বা জরুরি পারিবারিক কাজ এশার পর করা জায়েজ ও মাকরুহ নয়।
হাদীস:
«كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا»
(রাসূলুল্লাহ ﷺ এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পর (অনর্থক) কথাবার্তা অপছন্দ করতেন।)
— সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৪৭
রেফারেন্স:
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা নূরের ব্যাখ্যা
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৩৪
প্রশ্ন ৪: এশার পর দ্বীনি বা দুনিয়াবি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আদায় করা
নীতি:
এশার পর দ্বীনি বা দুনিয়াবি গুরুত্বপূর্ণ কাজ (যেমন পড়াশোনা, অনলাইন ব্যবসা, কোর্স) করা জায়েজ, যদি তা নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ করে:
১. ফজরের নামাজ সময়মতো আদায়ে বাধা না হয় — অর্থাৎ ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন।
২. এশার নামাজ ও সুন্নত-নফল আগে আদায় করা হয়।
৩. অনর্থক আড্ডা বা সময় নষ্ট না হয় — বরং তা দ্বীনি বা দুনিয়াবি উপকারী কাজ হয়।
৪. রাত জাগরণের কারণে শরীর বা ইবাদতে ক্ষতি না হয়।
গাফিলতির কারণে এশার আগে কাজ না করতে পারলে:
যদি গাফিলতির কারণে (যেমন সময় ব্যবস্থাপনার অবহেলা) এশার আগে কাজ শেষ না হয়, তবে এশার পর তা আদায় করা যাবে, তবে গাফিলতির জন্য তাওবা করা উচিত। কারণ সময় ব্যবস্থাপনা করা মুমিনের দায়িত্ব। তবে যদি কাজটি জরুরি হয় এবং এশার পর করা ছাড়া উপায় না থাকে, তবে গুনাহ হবে না, বরং তা জায়েজ।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৫ (মাকরুহাতের আলোচনা)
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪৬
- আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়াত
উপসংহার:
১. গ্লাসের দাম আবশ্যক নয় (যদি সরাসরি আপনার আঘাত না থাকে)।
২. দোকানদারের কাছে মাফ চাওয়া মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।
৩. এশার পর অনর্থক আড্ডা, গেমস, টিভি মাকরুহ; দ্বীনি ইলম ও জরুরি কাজ জায়েজ।
৪. গাফিলতির কারণে এশার পর কাজ করা যাবে, তবে তাওবা করা উত্তম।
والله أعلم بالصواب